হিতৈষীরা বললেন, তাতেও হবে না। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসনের দপ্তরে তদবির করতে হবে। কাকে ধরবো! বেবীর বান্ধবী ও আমার ছাত্রী আবেদার স্বামী জেনারেল মোজাম্মেল ওই দপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা। আবেদার ফোন নম্বর জোগাড় করে তাকে বললাম, জেনারেল মোজাম্মেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে। তিনি বললেন, জেনারেল সামনেই আছেন, আমি টেলিফোনেই কথা বলতে পারি। খুব বেশি বলতে হলো না। তিনি বললেন, আমি দেখবো। দিন দুই পরে জানা গেল, ফাইলে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সই হয়ে গেছে।
১৬.
ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক মূল্যবোধ-সম্পর্কিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সময় ঘনিয়ে এলো। অথচ আমার যে-প্রবন্ধ সেখানে পড়ার কথা, তা এগোচ্ছে না। শেষে স্থির করলাম, দুদিন আগে বেরিয়ে পড়ব-ব্যাংককে। হোটেলে বসে প্রবন্ধ তৈরি করে তবে যাব ৎসুকুবায়।
১৯৮৩ সালের ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ছাড়লাম। ঢাকা থেকে ব্যাংককে গেলাম পরদিন। ১৭ ও ১৮ এই দুদিনে নিজের খরচে হোটেলে থেকে লেখা শেষ করলাম। ১৯ তারিখে পৌঁছোলাম নারিতায়। বিমানবন্দরে দেখা হয়ে গেল ডা. তাহমিনা হোসেনের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে তিনি একটি সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন।
উদ্যাক্তারা গাড়ি পাঠিয়েছেন বিমানবন্দরে। তাতেই যাওয়া গেল। ৎসুকুবায়। একটা বড় হোটেলে থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। রিসেপশনেই যথেষ্ট ভিড়। কোনোমতে চাবি নিয়ে কক্ষে ঢোকা। জাপানে যেমন হয় সাধারণত, ঘরটা অপরিসর, বাথরুম আরো সংকীর্ণ–তবে কোনো কিছুর অভাব নেই, সবই সুসজ্জিত। স্নান সেরে তৈরি হয়ে বের হবো ঘর থেকে–টের পেলাম, চাবি নেই সঙ্গে। ওটা দরজায় রেখেই ঢুকে পড়েছি ঘরে, এখন তালাবদ্ধ অবস্থা। দরজা খুলতে না পেরে টেলিফোনের ডায়াল ঘোরাতে থাকলাম। যিনি টেলিফোন ধরলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম রিসেপশন? উত্তর এলো, জি হ্যাঁ, কী করতে পারি? বললাম, ঘরে আটকা পড়ে গেছি–সাহায্য চাই। বললেন, এক্ষুনি। খানিক পরে সাহায্য এলো।
নিচে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসেছি। এক অনতিতরুণ ইংরেজ এগিয়ে এসে বলল, আশা করি, তোমাকে উদ্ধার করতে সময় নেয়নি এরা–এবারে রিসেপশনের নম্বরটা জেনে নিও। বুঝলাম, আন্দাজে ফোন করতে গিয়ে এরই ঘরে ডাকটা গেছে এবং আমার দুর্বিপাকের কথা সে-ই জানিয়েছে। রিসেপশনকে। তখন মনে পড়ল, চেক-ইন করার সময়ে আমার সামনে দুই নরনারী দাঁড়িয়ে ছিল। পুরুষটি ইনিই। একটু তাকাতে অদূরে মেয়েটিকেও দেখতে পেলাম মিটিমিটি হাসছে। লোকটি এবারে আমাকে আহ্বান জানাল তাদের সঙ্গে যোগ দিতে। পরিচয় দিলো নিজেদের। তারা লন্ডনে গ্যালাপে সহকর্মী, মানবিক মূল্যবোধ সম্মেলনেই যোগ দিতে এসেছে। ভদ্রলোকের নাম বোধহয় গর্ডন, মেয়েটির নাম এখন ভুলে গেছি। দুজনে সদালাপী তো বটেই, বেশ হাসিখুশি, লোকটি তো ফুর্তিবাজ।
পরদিন রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে মনে হলো, সম্মেলন তো নয়, মেলা। সাদা, পীত, কালো, তরুণ, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ নরনারীতে জায়গাটা গিজ গিজ করছে। কেউ আমার প্রবন্ধ চাইল না, সুতরাং নিজের মূল্যবান (হোটেল খরচের হিসেবে) লেখাটা কারো ওপর চাপাবার চেষ্টা করলাম না–ওটা জ্যাকেটের পকেটেই রয়ে গেল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা বেশ জমকালো হলো। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে দেখা হয়ে গেল হাসান হানাফির সঙ্গে। এই মিশরীয় ভদ্রলোক মরক্কোর কিং হাসান ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপকতার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কুয়েতে। দেখামাত্র জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, হে আমার প্রিয় ভ্রাতা, তুমি যে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলে, মুসলমানদের মধ্যে আরবরা সংখ্যালঘু, সেকথা আমার একটা লেখায় উল্লেখ করেছি। এবারে তুমি কী বার্তা বহন করে নিয়ে এসেছ?
বললাম, কোনো বার্তা নয়, অনেক কষ্ট করে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, তাও কেউ চাইলো না। সেটা আমার সঙ্গেই ফেরত যাবে।
হানাফি বললেন, তাহলে কি আমরা তোমার গভীর চিন্তার ফসল থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছি?
বললাম, গভীর চিন্তা না ছাই। আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নেওয়া আমার পোষায় না। লোভে পড়ে এসব সম্মেলনে আসি। কোনোমতে আত্মরক্ষা করতে পারলে হয়।
হানাফি বললেন, তুমি কি ভাবো, আমি অন্য উদ্দেশ্যে এসব জায়গায় আসি? তবে এখানে এসে মনে হচ্ছে, এরা লোক জড়ো করতে যত আগ্রহী, কথা শুনতে তত নয়।
বললাম, আমার পক্ষে সেটাই ভালো।
মধ্যাহ্ন-বিরতির পর অনেকগুলো অধিবেশন সমান্তরালভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আমার জন্যে যেটা বরাদ্দ, সেখানে গিয়ে দেখি, গর্ডনও তাতে উপস্থিত। চেনামুখ দেখে আমরা উভয়েই খুশি, বসলাম পাশাপাশি। এক মার্কিন অধ্যাপক মডারেটর, এক বিদ্বান জাপানি প্রবন্ধ-পাঠক। লেখাটি পড়া হলো জাপানি ভাষায়, দীর্ঘক্ষণ ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদও শুনলাম দোভাষীর কণ্ঠে, তবে অনেক কিছু অস্পষ্ট রয়ে গেল। চা-বিরতিতে সঞ্চালক বললেন, ইংরেজি অনুবাদটি ভালো হয়নি। মেয়েটি সম্ভবত বাণিজ্যিক সভা সমিতিতে দোভাষীর কাজ করে, সংস্কৃতিবিষয়ক অনেক পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত নয়।
বিরতির পরে আলোচনা শুরু। প্রবন্ধ-পাঠককে আমি একটা প্রশ্ন করলাম–তাতে symbiosis কথাটা ব্যবহার করেছিলাম। গর্ডন আমাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমি synthesis বলতে চাইছি কি না। সঞ্চালক আমার হয়ে জবাব দিলেন, না উনি সিমবায়োসিস বলেছেন, ঠিকই বলেছেন।
