যাহোক, ওই মামলায় জরিমানা এবং আদালত চলা পর্যন্ত আটক থাকার শাস্তি হয়েছিল অধ্যাপক আবদুল করিমের, অন্যদেরও কিছু সাজা হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত সকলের বাড়িতেই আমি সহানুভূতি জানাতে গিয়েছিলাম। সে-খবর শুনে উপাচার্য আজিজ খান আমার কাছে তার সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন। আমি যখন বলি যে, তিনি যা শুনেছেন, তা সত্যি, তখন তিনি চুপ করে গিয়েছিলেন, এ-প্রসঙ্গে আর কিছু বলেননি।
১৯৮৩ সালে ঢাকায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সামরিক আইনের নিষেধ অমান্য করে চট্টগ্রাম শহরে এসে মৌন মিছিল করি। মিছিল বের করার উদ্দেশ্যে আমরা যখন শহরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এসে সমবেত হই, তখন দুজন পুলিশ-কর্মকর্তা এসে আমাদের বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাদের মিছিলে বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে সার্বিক নিরাপত্তা ও যান-চলাচলের স্বার্থে তারা মিছিলের যাত্রাপথ সম্পর্কে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছেন। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং উভয়পক্ষের সম্মত পথ ধরে মিছিল পরিচালনা করি। পরে আমরা শুনেছিলাম যে, শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষে লিপ্ত না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন জেনারেল মান্নাফ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে একবার পুষ্পেদ্যান-রচনার বিশেষ উদযোগ নেওয়া হয়। ঘটা করে উদ্যানের উদ্বোধন হয়। হলের প্রোভোস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন-উর রশীদ সেই অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলেন এবং বাগানের ফুল না ছিঁড়তে ছাত্রদের পরামর্শ দিতে বলেছিলেন। আমার বক্তৃতার শেষ বাক্যটি ছিল এই : ‘আমরা যদি মনে রাখি যে, বন্যেরা বনে সুন্দর, সৈন্যেরা ব্যারাকে এবং পুষ্প উদ্যানে, তাহলে জীবন অনেক সুসহ হয়।’ পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে এবং তার দু একদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে পোস্টার পড়েছিল : ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, সৈন্যেরা ব্যারাকে।’ তখনো সামরিক শাসন চলছে।
পরের দিকে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমি তার প্রতিনিধিরূপে সিন্ডিকেট-সদস্য নির্বাচিত হই। তার অল্প সময়ের মধ্যেই সিন্ডিকেটে চানসেলরের প্রতিনিধিরূপে আমার মনোনয়নের সংবাদ আসে। আমি বিস্মিত হই, তবে ধরে নিই যে, সম্ভবত ড. মজিদ খানের সুপারিশে এটা ঘটেছে। মনোনয়নলাভের পরে আমি নির্বাচিত সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিই। কিছুকাল পরে চট্টগ্রাম শহরে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ শিক্ষক সমিতির এক সভায় আমি বাংলাদেশে সামরিক শাসন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে একটি বক্তৃতা করি। তার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি আসে যে, সিন্ডিকেটের সদস্যরূপে আমার মনোনয়ন চানসেলর বাতিল করেছেন। পরে জানতে পারি, আমার ওই বক্তৃতার সংবাদ চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল নূরুদ্দীন খানের কাছে পৌঁছায়। তিনি তা চানসেলর এরশাদের গোচরে আনেন। শিক্ষা সচিব কাজী জালালউদ্দীন আহমদকে ফোন করে এরশাদ জানতে জানতে চান যে, আমার মনোনয়ন আইনত বাতিল করা যায় কি না। শিক্ষা সচিব বলেন, যিনি মনোনয়ন দেন, তিনি অবশ্যই তা বাতিল করতে পারেন। অতএব, সিন্ডিকেটে আমার সদস্যপদ খারিজ হয়ে যায়।
ঘটনাক্রমে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের প্রতিনিধি পদটি তখনো শূন্য ছিল। আমি আবার নির্বাচনে প্রার্থী হই, আবার নির্বাচিত হই, আবার সিন্ডিকেটের সদস্যপদ লাভ করি।
এই সময়ে আমার হাতে অনেকগুলো কাজ জমে গেল। জাপানের ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে হবে মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। উদ্যাক্তারা কার কাছে আমার নামধাম পেয়েছেন, জানি না, সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আবার আনোয়ার আবদেল মালেক লিখেছেন, কেমব্রিজের সেমিনারের কার্যবিবরণী আমাকেই সম্পাদনা করতে হবে। যেভাবে আলজিয়ার্সের সেমিনারের কার্যবিবরণী সম্পাদনা করেছিলাম, সেভাবেই কাজটা করা কর্তব্য। তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে ফেলেছেন আমাকে জিজ্ঞাসা না করেই। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় আমার পারিশ্রমিকের অর্থ আগাম পাঠাবেন প্যারিসে। সেখানে আমি পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলতে পারবো আগেরবারের মতো সকল ব্যবস্থায়। আমি না। বললে তিনি শুনছেন না। ওদিকে ১৯৭৫ সালের পরে পুরোনো বাংলা গদ্যের কাজটা আর ধরা হয়নি। কলকাতায় গিয়ে মাসাধিককাল কাজ করা প্রয়োজন–মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগারে রক্ষিত পাণ্ডুলিপি পড়া এবং নকল করা।
একসঙ্গে তিনটি সফরের প্রস্তাব দিয়ে ছুটি চাইলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অনুমতি চাইলাম বিদেশে যাওয়ার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সুপারিশ করলেন। তারপর বেশ সময় নিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তর থেকে চিঠি এলো বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষের কাছে। জেনারেল সালজার জানতে চান, এত দীর্ঘ সময়ের জন্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অনুপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের প্রতিকূল হবে কি না সে সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত। বিশ্ববিদ্যালয় তো আগেই আমার বিষয়ে সুপারিশ করেছে, তারই পুনরাবৃত্তি হলো। আমি তদবির করতে গেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। প্রায় পুরো একটা দিন লেগে গেল। শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব অধ্যাপক শুজাউদ্দীন–যিনি আমার বিশেষ পরিচিত–তিনি আর ড. মজিদ খানকে আমার উপস্থিতির কথা বলার সুযোগ পান না। মন্ত্রী যখন বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন করিডোরে তাঁকে পাকড়াও করলাম। তিনি আমাকে দেখে অবাক হলেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের অফিসে ফিরে গেলেন। ফাইলটা খুঁজে আনালেন, তারপর লিখলেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে বিদেশে যেতে দেওয়া হবে দেশের স্বার্থের অনুকূল।
