অল্পকালের মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আবদুল মজিদ খান চট্টগ্রাম সফরে এলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হলেন। তাঁর সঙ্গে আমার অনেককালের পরিচয়, তবে তিনি নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পরে এই প্রথম দেখা। আলোচনা করতে করতে বেশ তর্কই হয়ে গেল তাঁর সঙ্গে, কিন্তু বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেননি। সভার পরে আমরা কয়েকজন আবার উপাচার্যের অফিসকক্ষে তাঁর সঙ্গে বসলাম। তখন একদল ছাত্র এসে ড. মজিদ খানের সঙ্গে দেখা করতে চাইলো–তারা বেশ সংঘবদ্ধ হয়ে এসেছে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্লোগানও দিচ্ছে। যেহেতু ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করার কোনো কর্মসূচি শিক্ষা-উপদেষ্টার ছিল না, তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন না, অথবা বলা যেতে পারে, সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা না করার পরামর্শ দেওয়া হলো। ছাত্ররা দেখা করার জন্যে চাপ দিতে লাগলো। তখন জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ছাত্রদের যেন আমি চলে যেতে বলি। তার ধারণা, আমি ঠিকমতো বললে ছাত্ররা চলে যাবে। বুঝতে পারলাম যে, তাঁরা ধরে নিয়েছেন, ছাত্রদের সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে আমার সংশ্রব আছে। আমি ছাত্রদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলাম, তাতে কাজ হলো না। কিছুক্ষণ পর গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবার আমাকে একই অনুরোধ জানালেন, এবারে তার সঙ্গে যোগ দিলেন সাদা পোশাকপরা একজন সামরিক কর্মকর্তা–হয়তো সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কেউ। আমি ছাত্রদের সঙ্গে আবার কথা বললাম। তারা এবারে চলে যেতে সম্মত হলো। তাতে গোয়েন্দাদের ধারণা পোক্ত হলো।
এর অল্পকালের মধ্যে আমাদের পূর্বতন উপাচার্য আবদুল করিম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আফিজউদ্দিন আহমদ, প্রধান প্রকৌশলী নাসিরউদ্দীন চৌধুরী এবং সহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সামরিক আইনে মামলা দায়ের হলো। অভিযোগ যে বর্তমান উপাচার্যের উদযোগে আনীত হয়েছে, সেটা স্পষ্টতই জানাজানি হলো। দুর্নীতির তদন্ত বা দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হওয়ায় আমার কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু সামরিক আইনের অধীনে উপাচার্যের বিচারে আমার ঘোরতর আপত্তি ছিল। তার ওপর, আবদুল করিম আমার সরাসরি শিক্ষক–সেই মর্যাদা অমি সব সময়ে তাঁকে দিয়েছি, তাঁর সঙ্গে মতপার্থক্য ঘটলেও। তাঁর প্রতি আমার সহানুভূতি আমি গোপন করলাম না।
এ-সময়ে উপাচার্য আজিজ খানের ভবনে এক নৈশভোজের আমন্ত্রণ পেলাম। উপস্থিত হয়ে দেখলাম, অপর নিমন্ত্রিত অতিথি হলেন জেনারেল মান্নাফ। তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হলো, তিনি খুবই সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে গৃহকর্তার অনুপস্থিতিতে তিনি জানতে চাইলেন যে, উপাচার্য থাকার সময়ে অধ্যাপক করিমের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য ছিল বলে তিনি শুনেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হওয়ায় আমি তাঁর পক্ষসমর্থন করেছি বলেও তিনি জেনেছেন। ব্যাপারটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছে না। আমি বললাম, তিনি যা শুনেছেন, সবই সত্যি। দুর্নীতির যে-অভিযোগ অধ্যাপক করিমের বিরুদ্ধে হয়েছে, তার সত্যাসত্য সম্পর্কে আমি কিছু জানি না এবং সে বিষয়ে কিছু বলিওনি। আমার আপত্তি সামরিক আইনে তার বিচারে–দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হলে আমি কোনো কথা বলতাম না। আমি আরো বললাম, এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মযহারুল ইসলাম সামরিক আইনে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরীও অনিয়মের অভিযোগে সামরিক আইনে সাজা পেয়েছেন এবং পরে মুক্ত হয়ে অল্পকালের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। সামরিক আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষসমর্থনের যথাযথ সুযোগ পান না বলে আমার বিশ্বাস। এইভাবে সামরিক আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর হেনস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং তার শিক্ষকদের ভাবমূর্তি যেভাবে ধ্বংস করছে, আমি তার বিরুদ্ধে। জেনারেল মান্নাফ পালটা প্রশ্ন করলেন, উপাচার্যেরা যদি দুর্নীতি বা অনিয়ম করেন, তাতে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গোটা সম্প্রদায়ের (ইউনিভার্সিটি কমিউনিটির) ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় না? বললাম, নিশ্চয় হয়। তবে দুর্নীতি বা অনিয়ম সম্পর্কে প্রশাসন এত নিশ্চিত হলে প্রচলিত আইনে বিচার করলেই পারে। তিনি বললেন, আমার তো জানার কথা যে, প্রচলিত আইনে বিচার সময়সাপেক্ষ হয় এবং তার ফাঁকফোকর দিয়ে অভিযুক্তরা অনেক সময়েই বেরিয়ে যায়। আমি বললাম, জেনারেল তো নিশ্চয় জানেন যে, শুধু বিচার হলেই হয় না, তা যে সুবিচার হয়েছে, তা দৃশ্যমান হওয়া আবশ্যক হয়। জেনারেল হাসলেন। বললেন, তিনি আশা করবেন যে, অনুরাগ-বিরাগের দ্বারা নিজের ন্যায়বোধকে আমি বিচলিত হতে দেবো না। ওই প্রসঙ্গের সেখানেই পরিসমাপ্তি ঘটলো। পরে আমরা অন্যান্য বিষয়ে আলাপ করলাম। তাঁর মা-শিশু একাডেমীর পরিচালক–জোবায়দা খানমের সঙ্গে আমার পরিচয়ের কথা বললাম। বুঝতে পারলাম, তিনি সে-সম্পর্কে অবহিত।
প্রসঙ্গান্তরে কিছুকাল পরের একটি ঘটনার উল্লেখ করি। চট্টগ্রাম থাকতে প্রায়ই রাতের মেলে আমি ঢাকা আসা-যাওয়া করতাম। সাধারণত, টেলিফোন করে আসন সংরক্ষণ করতে অনুরোধ জানাতাম, তারপর ট্রেন ছাড়ার কিছু আগে স্টেশনে গিয়ে টিকিট নিতাম। একবার কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে শুনি, আমাকে ওপরের বার্থে যেতে হবে, কেননা জোবায়দা খানম চট্টগ্রাম যাবেন এবং আর কোথাও জায়গা না পেয়ে বলেছেন, আমার সঙ্গে একই কুপে যাবেন এবং সংশ্লিষ্ট রেল-কর্মচারীকে আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, তিনি যাচ্ছেন জানলে আমি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নিচের বার্থ ছেড়ে দিয়ে ওপরের বার্থে যাবো। কথাটা পুরোপুরি সত্যি। তিনি আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করলেও ছোটো ভাইয়ের মতো জানেন এবং আমিও তাকে বড়ো বোনের মতোই দেখি। তিনি কামরায় উঠে আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে অনেক দুঃখপ্রকাশ করলেন এবং তাঁকে ওই রাতেই যেতে হবে বলে অনন্যোপায় হয়ে ওই ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন বলে ব্যাখ্যা করলেন। আমি তাকে বললাম যে, তিনি আমার ওপরে সব সময়েই অমন দাবি করতে পারেন। পরদিন চট্টগ্রামে পৌঁছে দেখা গেল, ছেলের বাড়ি থেকে তাকে কেউ নিতে আসেনি-যোগাযোগের কোনো বিভ্রাট ঘটেছে। আমি বললাম, আপা, আপনাকে আমি ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে দিয়ে যাবো-আমাকে তার সামনে দিয়েই বাড়ি যেতে হবে। তাকে জিওসি-র বাড়িতে নামিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম। বাড়ি পৌঁছোতেই জেনারেল মান্নাফের ফোন পেলাম–তার মাকে সাহায্য করায় তিনি আমাকে সমূহ ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
