এয়ার ইন্ডিয়ার ফোন আসে না। উলটো নিজেই ফোন করি। কোনো লাভ হয় না।
এপ্রিলের ১০ তারিখে রওনা হই। বোম্বে আসতে আসতে বিলম্ব হয়ে যায়। ঢাকার ফ্লাইট পাবো কি না সন্দেহ হয়। ক্যাপ্টেনকে চিরকুট পাঠাই–আমার বোন মারা গেছে। যত দ্রুত সম্ভব ঢাকায় ফিরতে চাই। আপনি কি কন্ট্রোল টাওয়ারে খবর দিয়ে কানেকটিং ফ্লাইট ধরাবার ব্যবস্থা করতে পারবেন?
এয়ার হোস্টেস এসে বলে, উনি চেষ্টা করবেন।
পরে বুঝতে পারি, আমার ওই অনুরোধের কোনো অর্থ ছিল না। আর ক্যাপ্টেন যা বলে পাঠিয়েছিলেন, তা কেবল আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে।
তবে ঢাকাগামী ফ্লাইট ধরতে ব্যর্থ হইনি।
১৩.
ঢাকায় ফিরে প্রথমে গেলাম বনানীতে–ছোটোবুর কবরে।
ছোটোবুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। তার অনেক সুখ দুঃখের সাথী ছিলাম আমি। অল্প সম্বল নিয়ে বড়ো সংসার চালাতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হতো। তার মধ্যেও সে মুখের হাসি ম্লান হতে দেয়নি। নিপুণ হাতে ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখতো সে। শেষকালে কিছুই আর তাকে ধরে রাখতে পারলো না। কাউকেই ধরে রাখা যায় না।
ছোটোদুলাভাইকে দেখতে গেলাম হাসপাতালে। তখনো তিনি জানেন না, ছোটোবু নেই। আমাকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ছোটোবুকে দেখে এসেছ? কেমন আছে?’
কী উত্তর দেবো! বললাম, ‘দেখে এসেছি।’
১৪.
১৯৮২ সালে কুমিল্লা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, মানবিক বিভাগে রুচি বিংশ স্থান অধিকার করেছে। আমাদের বাড়িতে তো বটেই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এবং আমাদের পাড়ায়ও এ-নিয়ে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। এখলাসউদ্দীন তার আগের মন্তব্যের পুনরুক্তি করলেন আমার সম্পর্কে : সারা বছর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কোনো খবর রাখি না, কেবল পরীক্ষায় তারা ভালো ফল করলে গৌরবের ভাগী হই।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা দেখি না, বেবীর এমন অনুযোগের কারণে একদিন ওদের তিন ভাইবোৰুকে বলেছিলাম, বইপত্র নিয়ে এসো। স্কুলে বাড়ির কাজ কী দিয়েছে, শুনি। আনন্দ বললো, ‘চার লাইন কবিতা মুখস্থ করতে দিয়েছে।
জানতে চাইলাম, ‘মুখস্থ করেছ?’
সে বললো, ‘দু লাইন করেছি।’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চার লাইন মুখস্থ করতে দিয়েছে–তুমি দু লাইন মুখস্থ করেছ কেন?’
তার জবাব, ‘এক লাইন শুনেই তো সার বলেন, বোসো।’
বুঝতে পারি, শ্রেণিকক্ষের সব ছেলেমেয়ের পড়া ধরার মতো সময়ের সংকুলান হয় না এক পিরিয়ডে। এও বুঝতে পারি যে, ছোটো ছেলেমেয়েরাও এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার পথ খুঁজে নিয়েছে।
ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার তত্ত্বাবধানে আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব হয়নি।
১৫.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল আজিজ খানের সততা সম্পর্কে আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়সংকোচেও তিনি নানারকম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিস্তর বৃক্ষরোপণ তাঁর অক্ষয় কীর্তি। বিদ্যমান নিয়মকানুন তিনি সব সময়ে অনুসরণ করতে চাইতেন না-এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার বিরোধ হতো। তিনি ধার্মিক ছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজেকর্মেও তার প্রকাশ ঘটিয়ে ফেলতেন–এ-নিয়েও আমাদের মতান্তর ঘটতো। একবার জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি মাদ্রাসার পত্তন হয়েছে, নিজের দায়িত্বে উপাচার্য তার অনুমোদন দিয়েছেন এবং আর্থিক দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় নেবে বলে সিদ্ধান্ত করে ফেলেছেন। আমি তাকে বলি, এ-বিষয়ে এককভাবে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে স্কুল-কলেজের ব্যয়নির্বাহের দায়িত্ব নিয়েছে, সেখানে মাদ্রাসার দায়িত্ব না নেওয়ার কোনো হেতু নেই। তর্কের মধ্যে আমি বলেছিলাম, মাদ্রাসা-শিক্ষার পক্ষে কথা বলেন, এমন অনেককেই দেখেছি, নিজের ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসায় পাঠান না। কয়েকদিন পরে শুনলাম, উপাচার্য তার ছেলেকে ওই মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। এ-ঘটনাটি তাঁর আমলের পরের দিকের, কিন্তু প্রায় প্রথম থেকেই পদ্ধতিগত প্রশ্ন নিয়ে আমার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কখনো কখনো এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আমাদের অগোচরে রাখতেন এবং তা প্রকাশ হয়ে পড়লে এক ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এ রকম কোনো একটি ঘটনার পরে অ্যাকাডেমিক কাউনসিলের সভায় আমি বলেছিলাম যে, উপাচার্যের কথায় আমি আস্থা রাখতে পারছি না। আমি তখন কলা অনুষদের ডিন। আমার এই রূঢ় উক্তিতে সভায় বেশ হইচই হয়েছিল।
বিদেশ থেকে আমার চট্টগ্রামে ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যে কাগজে দেখলাম, রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী চট্টগ্রাম সফরে আসছেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চানসেলরও। আমি ভাবলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করে উপাচার্যের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আপত্তি জানাবো। হাসনাত আবদুল হাই তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। তাকে অনুরোধ করলাম, চানসেলরের সঙ্গে সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থা করে দিতে। তিনি বললেন, এখন সামরিক শাসনের কাল, তাই রাষ্ট্রপতির সফর-সম্পর্কিত সকল ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছেন আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক। আমি চাইলে তাকে অনুরোধ করতে পারি। তাতে কোনো কাজ হবে কি না, সে-সম্পর্কে আমার সন্দেহ ছিল। তবু হাসনাত আবদুল হাইকে বললাম, আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসককে আমার কথাটা বলতে। হাই জিওসিকে ফোন করে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিলেন–আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু বললেন না। অনতিবিলম্বে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে গিয়ে সাক্ষাৎ করলাম মেজর জেনারেল এম এ মান্নাফের সঙ্গে। বললাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনদের মধ্যে আমি জ্যেষ্ঠ-সেই দায়িত্ববোধ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে চানসেলরের সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। তিনি খুব সৌজন্যের সঙ্গে বললেন, আপনাকে আসতে হবে ভাইস-চানসেলরের মাধ্যমে। বললাম, ভাইস-চানসেলরের সম্পর্কেই আমি অভিযোগ করতে চাই। তিনি বোধহয় একটু বিস্মিত হলেন, তবে সেটা প্রকাশ না করেই বললেন, প্রোটোকল অনুযায়ী ভাইস চানসেলরের মাধ্যমেই আমাকে চানসেলরের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করতে হবে, সাক্ষাতের কারণ বর্ণনা করে। আমি বুঝতে পারলাম, কোনো কাজ হলো না, বরঞ্চ এমন ধারণার সৃষ্টি হলো যে, আমি উপাচার্যের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছি। এটা আমার পক্ষে ভালো হয়নি।
