সেমিনারের উদ্বোধনীতে নিডহাম বললেন তাঁদের সময়কার কোনো গ্রন্থাগারের কথা। সে-গ্রন্থাগারে পৃথিবীর ইতিহাস ও ইউরোপের ইতিহাস স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত থাকতো–তারপর থাকতো অন্যান্য দেশের ইতিহাস বলে একটা অংশ। ইউরোপ ছাড়া পৃথিবীর বাকি অংশকে এইভাবে এক করে রাখার মধ্যে যে ইউরোপকেন্দ্রিক মনোভাব আছে, তার সমালোচনা করলেন তিনি।
সেমিনারে বরুণ দে শুধু ভালো বক্তৃতা করেন নি, বিভিন্ন সময়ে তাঁর মন্তব্যও খুব মনোগ্রাহী হয়েছিল। নিডহাম তো বললেন, বরুণ দে কোন বিষয়ে জানেন না, তা আমি ঠাহর করতে পারছি না। আনোয়ারের বক্তৃতায় সমাজবিজ্ঞানের দুরূহ পারিবারিক শব্দের প্রচুর ব্যবহার ছিল। নিডহাম চোখ বন্ধ করে তা শুনছিলেন। বক্তৃতা শেষ হলে চোখ খুলে বললেন, এটা কেউ ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেবে আমার জন্যে? আনোয়ার খুব অপ্রতিভ হলেন–যদিও নিডহাম ব্যক্তিগতভাবে তাকে অপ্রতিভ করতে চাননি।
নিডহামের প্রধানতম সহকারী ছিলেন এক বয়স্ক চেক বিজ্ঞানী–এখন ব্রিটিশ নাগরিক। সেমিনারের অধিবেশনগুলির মধ্যবর্তী এক সময়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাগোরে কি তোমাদের দেশে এখনো জনপ্রিয়?
তাগোরে কে, তা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল, তবে বেশি নয়। বললাম, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির প্রধানতম গর্বের পাত্র; তাঁকে নিয়ে আমরা রীতিমতো যুদ্ধ করেছি; তাঁর গানকে আমরা জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছি।
তিনি সন্তুষ্ট হলেন। আমি জানতে চাইলাম, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর জানবার বা কৌতূহলের সূত্র কী?
তিনি হেসে বললেন, সে এক মজার ঘটনা। আমার বড়ো ভাই আর আমি দেশে একই স্কুলে পড়েছি একটু আগে-পরে। সে একবার অ্যাসাইনমেন্ট নিলো, তাগোরে সম্পর্কে লিখবে। তখন তিনি সদ্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তা সত্ত্বেও আমাদের শহরে ও ভাষায় তাগোরে সম্পর্কে বইপত্র খুঁজে পাওয়া দুরূহ। কিন্তু সে দমবার পাত্র নয়। তার অ্যাসাইনমেন্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত সারাদিন ধরে সে তাগোরের কথা বলতে থাকতো। কোন সুদূর ভারতবর্ষের কবিতার সম্পর্কে অগ্রজের এই মুগ্ধতা আমার মনে দাগ কেটেছিল। আমি তো বিজ্ঞানী–কবিতার সমঝদার নই। কিন্তু ভাইয়ের কাছে শুনে কবিকে খানিকটা জেনেছিলাম। পরে তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি আর তার শতবার্ষিকীর সময়ে তাকে আরেকটু জেনেছি। মানুষের ওপর তার প্রভাব, শিল্পী হিসেবে তাঁর মহত্ত্ব দূর থেকে অনুধাবন করতে পারি।
একদিন রাতে খাওয়ার সময়ে দেখি, চীনা বিদ্বানেরা তাঁদের নৈশভোজের কুপন দিয়ে গেছেন দুই চীনা ছাত্রকে। তারা খুব জড়োসড়ো হয়ে খাচ্ছে। অন্যেরা অনেকে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে বটে, কিন্তু কেউ এ-বিষয়ে উচ্চবাচ্য করছে না।
লাঞ্চের বিরতিতে একদিন দেখি ডোনাল্ড লাক বাইরে থেকে ফিরছেন। এমনি ফরসা মানুষ, ভারিক্কি চেহারা–এখন যথেষ্ট রক্তিম দেখাচ্ছে। আমার টেবিলে বসে পড়ে বললেন, এমন একটা অসম্ভব ব্যাপার ঘটেছে যে, আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না।
জানতে চাইলাম, কী ঘটেছে?
লাক বললেন, ট্রাভেলার্স চেক ভাঙাতে গিয়েছিলাম। মানি এক্সচেঞ্জে যে মহিলা বসেন, তিনি প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, আমি আর্জেন্টাইন কি না। বললাম, না, কিন্তু কেন? মহিলা জবাব দিলেন, তাহলে আপনার টি সি আমি ভাঙাতাম না।
তখন ফকল্যান্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ব্রিটিশ রণতরি ঝাঁক বেঁধে রওনা হয়ে গেছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে। ব্রিটেনের জয়ধ্বনি এবং আর্জেন্টিনার নিপাত-কামনা শোনা যাচ্ছে ইংল্যান্ডে।
অধ্যাপক লাক বেদনার্ত কণ্ঠে বললেন, বিশ শতকের শেষে এমন যুদ্ধবাদ, এমন বর্ণবাদ, ভাবা যায়?
বললাম, মার্গারেট থ্যাচারের বক্তৃতা শুনলে আপনি তার যথেষ্ট প্রমাণ। পাবেন।
সেমিনারের মধ্যে একদিন জানলাম, মোমেনের বাড়ি থেকে টেলিফোন এসেছিল আমার খোঁজে। এটা প্রত্যাশিত নয়। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম তার বাড়িতে–মোমেন ও রোজী কেউই বাড়ি নেই, রঙ্গন টেলিফোন ধরলো। আমাকে কেন খোঁজ করেছিল, জানতে চাওয়ায় সে বললো, এ টেলিফোন কল কেম ফ্রম বাংলাদেশ। ইয়োর লিটল সিসটার হ্যাজ ডায়েড অফ অ্যাকসিডেন্ট।
আমি বিমূঢ়। লিটল সিসটার কে? রীনা-বীণাদের কেউ?
রোজী কখন বাসায় থাকবে জেনে নিয়েছিলাম। আবার ফোন করলাম সে সময়ে। রোজী বললো, যশোর থেকে ছোটোবু-দুলাভাই বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। সাভারের কাছে আরেক বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে ছোটোবু আসনে বসেই মারা গেছে, ছোটোদুলাভাই গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে আছেন।
আমার পৃথিবীটা এক নিমিষে কেমন জানি হয়ে গেল।
আনোয়ারকে বললাম, আমার বোন মারা গেছে, আমি এখনই দেশে ফিরে যাবো। সেমিনারের বাকি সময় থাকতে পারব না।
তিনি বললেন, তুমি যেতে চাইলে বাধা দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ভেবে দেখো, তুমি কি ফিরে গিয়ে দাফন-কাফনে উপস্থিত থাকতে পারবে?
আমি তার কথার উত্তর দিলাম না। একটা ট্যাকসি নিয়ে রেলস্টেশনে চলে এলাম। পরের ট্রেনে লন্ডনে পৌঁছে সোজা এয়ার ইন্ডিয়া অফিসে। তারা আগের কোনো ফ্লাইট ধরাবার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারল না। বললো, সম্ভব হলে ফোনে জানাবে। মোমেনদের বাসার ফোন নম্বর দিয়ে রাখলাম।
ফিরে এলাম কেমব্রিজে। বরুণ সঙ্গ দিলেন। সেমিনারেও বসলাম। কিন্তু মন দিতে পারলাম না।
