অকারণে রাষ্ট্রপতিপদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, তিনি–উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। পুতুলনাচের সুতো যে আর কারো হাতে বাঁধা, সেকথা বুঝতে অসুবিধে হলো না।
২৪ মার্চ সকালে বাথরুমে দাড়ি কামাচ্ছি–পাশেই রান্নাঘর থেকে মোমেনের চিৎকার : বাংলাদেশে কু্য হয়ে গেছে–জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছে।’
খবরটা যে একেবারে অপ্রত্যাশিত, তা বলা যাবে না। তবু কী এক বিষণ্ণতায় মন ভরে গেল। খাবারটাও বিস্বাদ মনে হলো।
বুশ হাউজে এসে শুনলাম, রাষ্ট্রপতি সাত্তার নিজেই সেনাপতি এরশাদকে আহ্বান করেছেন ক্ষমতা নিতে। কয়েক শতাব্দী আগে নবদ্বীপে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ ইবনে বখতিয়ার খিলজির সসৈন্য আগমনে গৌড়রাজ লক্ষ্মণ সেন নাকি খাবারের থালা ফেলে খিড়কি দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই তুলনায় বিচারপতি সাত্তার আর এমন কী করেছেন। তবে লক্ষ্মণ সেনের প্রতিপক্ষ ছিল তুর্কি সৈন্য, এরশাদ তো স্বদেশি সেনাবাহিনীর প্রধান।
ক্রমে জানতে পারলাম, বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হয়েছেন এবং বেশ কজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে প্রধান সামরিক শাসনকর্তার উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনা কর্মকর্তারা ক্ষমতা দখল করে বিচারপতিদের যে রাষ্ট্রপ্রধান করে টেনে আনেন, তা বাংলাদেশে একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিচারবিভাগের জন্যে এটা ভালো হচ্ছে বলে মনে হয় না।
উপদেষ্টাদের মধ্যে আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ ও আবুল মাল আবদুল মুহিত আছেন। এঁরা উপদেষ্টা-পরিষদে যাওয়ায় আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমার ধারণা হলো, আমাদের যেসব রাজনৈতিক বন্ধু মুহিতের ঘনিষ্ঠ, সামরিক শাসনের সমর্থক না হয়েও তারা তাঁকে এই দায়িত্বগ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। হয়তো তাঁদের চাপে সামরিক শাসনবিরোধী হয়েও মুহিতকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এর জন্যে যে তাকে একদিন মূল্য দিতে হবে, একথা ভেবে আমার খারাপ লাগলো।
১২.
প্যারিস থেকে আমি লন্ডনে আসবো জেনে আনোয়ার আবদেল-মালেক বললেন, তাহলে তুমি আর কদিন বেশি থেকে কেমব্রিজে আমি যে-সেমিনার করছি (Geo-political visions of the World), তাতে যোগ দাও। আমি হলফ করে বলতে পারি, তোমার তা ভালো লাগবে।
সেমিনারের স্থান রবিনসন কলেজ। ওটাই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনতম কলেজ–কোনো টেলিভিশন-নির্মাতার টাকায় তৈরি এবং তারই নামে কলেজের নাম। বনেদি কলেজগুলোর সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের খানিকটা অবজ্ঞা আছে এই কলেজটির প্রতি। তবে কলেজটির নির্মাণশৈলী আধুনিক, সে হিসেবে তার কিছু সুবিধা আছে যা অন্য কলেজে লভ্য নয়। সেমিনারের সময়টা কলেজ বন্ধ–সুতরাং আমাদের প্রত্যেককে আলাদা ঘর দিতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
এই সেমিনারের মধ্যমণি জোসেফ নিডহাম–বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ হিসেবে তাঁর জগৎজোড়া খ্যাতি। কয়েক খণ্ডে রচিত তাঁর Science and Civilization in China (কেমব্রিজ, ১৯৫৪ থেকে) বইটি মানব-মনীষার অসামান্য নিদর্শন বলে কীর্তিত। তাঁর গবেষণার সুবিধের জন্যে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা। একটি গ্রন্থাগার তৈরি করে দিয়েছেন–পূর্ব এশিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সম্পর্কিত বইপত্র দিয়ে। তাছাড়া কয়েকজন বিশিষ্ট সহকারীও দিয়েছেন তাঁর কাজে সাহায্য করতে।
কেমব্রিজ থেকে যারা এ-সেমিনারে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের একজন অর্থনীতিবিদ জোন রবিনসন, আরেকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন ডান। জোন রবিনসনের বয়স হয়েছে, চলতে-ফিরতে কষ্ট হয়–যদিও মুখে সেকথা বলেন না। জন ডানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আলজিয়ার্সে, এবার আবার সাক্ষাৎ হলো। কলকাতা থেকে এসেছেন বরুণ দে–তাতে আমি খুবই আনন্দিত। শিকাগো থেকে এসেছেন প্রবীণ ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড লাক–দক্ষিণপূর্ব ও পূর্ব এশীয় ইতিহাস সম্পর্কে বড়ো বিশেষজ্ঞ। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে এই প্রথম যোগ দিয়েছেন চীনের দুজন পণ্ডিত-চীনকে সঙ্গে পেয়ে আনোয়ার খুবই উল্লসিত।
সেমিনার আরম্ভ হওয়ার আগের দিন প্রায় সবাই কলেজে পৌঁছে গেছি। রাতে খাবার সময়ে আমি আর বরুণ যে-টেবিলে বসেছি, সেখানে এসে যোগ দিলেন ডোনাল্ড লাক। আমি শিকাগোতে ছিলাম শুনে খুব খুশি হলেন। ওই টেবিলে আরো জনাতিনেক এসে বসলেন। আমরা মেন্যু দেখছি, অধ্যাপক লাক জিজ্ঞাসা করলেন, কে কে ওয়াইন খেতে চাও। জিজ্ঞাসা করার কারণ, তার দামটা আমাদের দিতে হবে–সেমিনার-কর্তৃপক্ষ দেবে না। দেখা গেল, টেবিলের সবাই ওয়াইন খেতে চায়। একজন তো ওয়াইন-লিস্ট নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। লাক একটা ওয়াইনের কথা বললেন, সে বললো আরেকটা। লাক হাতের তালিকাটা টেবিলে রেখে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার যুবক বন্ধু, আমি ৪০ বছর ইতিহাস পড়াচ্ছি–হয়তো ইতিহাস সম্পর্কে আমার অনেক কিছু অজানা। তবে ওয়াইন সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল, এমন দাবি করতে পারি। তুমি আমার ওপর নির্ভর করতে পারো। লাকের কথায় সে বেচারি চুপসে গেল।
আমি খুব মজা পেলাম। একটু একটু করে প্রশ্ন করতে থাকলাম লাককে-ওয়াইন-বিষয়ে তার আগ্রহ সম্পর্কে জানতে। তিনি ওয়াইন-সম্পর্কিত একাধিক সাময়িকীর গ্রাহক, বাড়িতে জায়গা হয় না বলে শিকাগোতে স্বতন্ত্র একটি সেলার ভাড়া করেছেন, লন্ডনে ওয়াইনের নিলাম হলে শিকাগো থেকে। তিনি টেলিফোনে তাতে ডাক দেন, তারপর নিলাম জিতলে সেই ওয়াইনের সংগ্রহ জাহাজযোগে শিকাগোতে আনিয়ে নেন। তার সংগ্রহে সবচেয়ে পুরোনো ওয়াইনের বোতল কত সালের, তা জানতে চাইলে, লাক বললেন, আমার জন্মসালের এক বোতল ওয়াইন আছে, সেটা যে খুব ভালো, তা নয়, তবে স্মারক হিসেবে রেখেছি–আমার পৌত্রকে উপহার দিয়ে যাবো।
