পরদিন থেকে ওই খাতার চিঠির বিবরণ লিখতে লেগে গেলাম।
লন্ডনে এতজনের কাছে আমি ঋণী, তাদেরকে অন্তত এক কপি করে বই উপহার দিতে হয়। মোমেন, জ্যান, বুলু, শফিউল্লাহ–এদেরকে বই না দিয়ে পারি কী করে! দেশেও তো কাউকে কাউকে দিতে হবে–বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল করিম–এঁদেরকে। আমাকে মাত্র এক কপি বই পাঠিয়েছিল ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি। আরো এক কপি বই পেলাম সৌজন্যস্বরূপ। আর ছয় না আট কপি বই কিনলাম। বই ছিল মিসেস পি ওয়ার্ডের দায়িত্বে। তাঁরও নাম প্রতিভাতার বাবা সুকুমার রায় একদা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব। তাঁকে নামে জানতাম। মিসেস ওয়ার্ড আগে ছিলেন ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে–সেখানে আমার বন্ধু শামসুল মোরশেদের (পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-উপদেষ্টা) তিনি ছিলেন সহকর্মী ও বন্ধু। মিসেস ওয়ার্ড আমার প্রত্যাশার অধিক ছাড়ে বইগুলি আমাকে বিক্রি করলেন এবং একদিন লাঞ্চের সময়ে ওল্ড ভিকের পাশে একটা ওয়াইন বারে আমাকে নিয়ে গেলেন। সেখানে খাওয়াটা গৌণ, পানটা মুখ্য এবং তা যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি শিক্ষাপ্রদ।
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে একদিন সেই ইরানি মেয়েটি এসে উপস্থিত। গতবারে আমি যখন এখানে কাজ করছিলাম, তখন সেও এখানে লেখাপড়া করছিল। আমার সঙ্গে সৌজন্য-বিনিময়ের বেশি আলাপ হয়নি তার, তবে প্রায় রোজই তার সঙ্গে দেখা হতো। সে আসততা পাশ্চাত্য পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে, দেখে মনে হতো সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে। এবারে তার চোখে-মুখে বেশে-বাসে মলিনতার আভাস। পাঠকক্ষের দরজা পেরোতেই সে আমার সঙ্গে যোগ দিলো। কেমন আছো, জিজ্ঞেস করায় সে বললো, বেশ খারাপ। ইরানের বিপ্লবে যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে তাদেরটা একটা। তারা যে শাহর সমর্থক, তা নয়, বরঞ্চ শাহর সময়ে সাভাকেরা যে-অত্যাচার করেছে, তারা তার ঘোর বিরোধী। তবে তাদের পরিবার সংগতিসম্পন্ন এবং পাশ্চাত্যভাবাপন্ন। কেবল সেজন্যেই তাদের দুর্গতি হয়েছে। তার বড়ো ভাই বিমানচালক। কদিন আগে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন ভাগ্যান্বেষণে। সেও অনেক কষ্টে তেহরান থেকে বেরিয়েছে–জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে তার নেই। তার ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে।
মেয়েটি নিম্নস্বরে কথা বলছিল এবং মাঝে মাঝে পেছন দিকে তাকাচ্ছিল–কেউ তার কথা শুনছে কি না, সেটা দেখতে। বোঝা গেল, যে আতঙ্কের মধ্যে সে এতকাল কাটিয়েছে, তার রেশ এখনো যায়নি।
আমার মনে পড়ল, ইরানি বিপ্লবের সাফল্যের আশায় কত রাত বেতারযন্ত্রের সামনে বসে কাটিয়েছি। প্যারিস থেকে স্বদেশে ফিরে আসছেন জনগণের মুক্তিদাতা–আয়তোল্লাহ খোমিনির এই রূপই চোখে ভেসে উঠেছিল। কিন্তু তার শাসনকালে যে নতুন করে নিপীড়ন ও রক্তপাতের সূচনা হবে, তা তখন বোঝা যায়নি।
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সেবারে যতদিন ছিলাম, মেয়েটি অনিয়মিতভাবে আসততা। সে এলে এবারে স্বতোপ্রণোদিত হয়ে আমিই তার খোঁজখবর নিতাম। সে আগ্রহ করে কথাবার্তা বলতো বটে, কিন্তু আমি আর তার হাসিমুখ দেখিনি।
১১.
লাইব্রেরিতে প্রথম দিন হাজিরা দিয়ে আমার গন্তব্য ছিল বুশ হাউজে বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাংলা বিভাগ। সিরাজুর রহমান এখন তার প্রধান–বরাবরের মতো তিনি অভ্যর্থনা করলেন। কিন্তু এবার সেখানে এক বড়ো শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল শ্যামল লোধের তিরোধানে। শ্যামল সপরিবারে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন সমুদ্র-সৈকতে। তিনি যখন সাঁতার দিতে নেমেছেন সমুদ্রে, তখনই স্ত্রীকন্যার চোখের সামনেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। ১৯৭৯ সালে। শ্যামলের বাড়িতে গিয়েছিলাম নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে–তখন তার ইংরেজ স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় এবং সদ্য শৈশবোত্তীর্ণ কন্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তারপর শ্যামল এসেছিলেন বাংলাদেশে–চট্টগ্রামে আমার বাড়িতে দু দিন দুরাত কাটিয়েছিলেন, বিবিসির শ্রোতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে। সেই দিনগুলির এবং শ্যামলের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের স্মৃতি পীড়া দিচ্ছিল বারবার–কিন্তু ততদিনে জেনে গেছি, জীবন এমনই, কারো জন্যে অপেক্ষা করে না, কারো জন্যে থেমে থাকে না।
বিবিসি বাংলা বিভাগে গিয়ে দেশের কিছু খবর পাওয়া গেল। রাষ্ট্রপতি সাত্তার নিজে যে-মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে তাকে দুর্নীতিপরায়ণ বলে বরখাস্ত করেছেন তিনি নিজেই। তার অব্যবহিত পূর্বে মন্ত্রী আবুল কাসেমের সরকারি বাসভবন থেকে সাত হত্যার আসামি ইমদুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এমন এক ভয়ানক সন্ত্রাসীকে আশ্রয়দান ও তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশকে বাধাদানের অভিযোগে মন্ত্রীবর গ্রেপ্তার হয়েছেন। কয়েকজন নতুন মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। পরবর্তী কয়েক দিনে বিবিসিতে কাজ করার সূত্রে জানা গেল, দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী–আমার আত্মীয় জামালউদ্দীন আহমদ এবং অগ্রজপ্রতিম এস এ বারী এ টিসহ বেশ কয়েকজন প্রাক্তন মন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আরো আছেন আমার বন্ধু হাবীবুল্লাহ খান, পরিচিত নূরুল হক ও কে এম ওবায়দুর রহমান এবং আমার ছাত্র তানবীর আহমদ সিদ্দিকী। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের হয়েছে। ড. এম এন হুদা উপরাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করেছেন এবং মোহাম্মদউল্লাহ-যাকে বঙ্গবন্ধু
