ফলে আমি স্বাধীনভাবে লিখতে থাকি। ফরাসিতে লেখা প্রবন্ধ মুখে মুখে তরজমা করেন ক্রিস্তিন। আমি শুনে শুনে টুকে নিই। পর্তুগিজ-জানা এক সেক্রেটারিকে ধরে একটা প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ লিখিয়ে আনেন ক্রিস্তিন। আমি সেটা ব্যবহার করি। আমার লেখা খানিকটা অগ্রসর হলে টাইপ করতে দিই তাঁকে। টাইপ করা হলে পড়ে আবার শুদ্ধ করতে দিই। আমার লেখায় কোনো অপরিচিত ইংরেজি শব্দ পেলে একটা কাগজে তা টুকে রাখেন ক্রিস্তিন। পরে অভিধান দেখে তার অর্থ ও ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করেন। আমার কাছে একসময়ে জানতে চান, আমার ব্যবহৃত তাঁর অজানা ইংরেজি শব্দের বেশির ভাগ ল্যাটিন থেকে এসেছে–তার কী কোনো কারণ আছে? আমি বলি, আমি তো ল্যাটিন জেনে সেসব ব্যবহার করিনি–সুতরাং কারণ বের করা যাবে না।
ক্রিস্তিন একদিন হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন, আচ্ছা আপনার মেয়ে যদি অবিবাহিত অবস্থায় মা হতে চলে, তখন আপনি কী করবেন?
আমি একটু থতমত খাই। বলি, এমন অবস্থা তো কল্পনা করিনি। সুতরাং সে-ভাবনা মাথায় আসেনি।
সানিয়া বলে, যদির কথা হচ্ছে।
আমি বলি, সম্ভবত সে-অবস্থায় আমার মেয়ে যা চাইবে, আমি তাই চাইবো। সে যদি ভ্রূণ নষ্ট করতে চায়, তাকে সাহায্য করবো। সে যদি সন্তান জন্ম দিতে চায়, তাহলেও সাহায্য করবে।
ক্রিস্তিন বলেন, এখন বলতে পারি, আপনি সত্যি উদার। অনেক উদার মানুষই এসব ক্ষেত্রে ঔদার্য হারিয়ে ফেলে।
ক্রিস্তিনের পরামর্শে আমি প্রতি সপ্তাহে বিনোদনের বিবরণ-সংবলিত পত্রিকা। কিনি। তা দেখে সিনেমা দেখতে যাই। এভাবে চার্লি চ্যাপলিনের কিছু চলচ্চিত্র দেখা হয়, আবার জেমস বন্ডও দেখি। ইংরেজি সাব-টাইটল আছে, অন্য ভাষায় তৈরি এমন ছবিও দেখা হয়। প্যারিসের দর্শনীয় বস্তু দেখতে যাই। পুরোনো বাড়ি কিংবা রাস্তা। বাস্তিল। নানা জাদুঘর। স্যুভে কতবার গেলাম। অল্প অল্প করে দেখি। মোমার্তের দিকে যাই–শিল্পীরা ছবি আঁকছেন, তা দেখি। খাবারের বৈচিত্র্য খুঁজি। এক সন্ধ্যায় মুলা রুজে যাই।
জিওভানি একটা ইংরেজি বইয়ের দোকানের খোঁজ দিয়েছিল–সেখানে মাঝে মাঝে যাই। তার পরামর্শমতো পি ডি জেমসের গোয়েন্দাকাহিনি কিনি। অতটা মুগ্ধ হই না।
এক সপ্তাহান্তে ভের্সাই গেলাম। প্রাসাদ এবং সংগ্রহ দেখে দিন কেটে গেল। দুঃখের বিষয়, তখন সন্ধ্যায় আতসবাজির কর্মসূচি ছিল না। সেটা না-দেখার। অতৃপ্তি নিয়ে ফিরলাম।
৯.
প্যারিসের জাদুঘরে ছবি দেখতে দেখতে, এক সময়ে মনে হলো, অ্যামস্টারডাম এত কাছে–সেখানে গিয়ে তো আরো ছবি দেখে আসা যায়। একটা নতুন দেশেও যাওয়া হবে।
ভিসা পেতে অসুরিধে হলো না। কোচে করে সন্ধ্যায় রওনা হলাম। কোচে। বসেই কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ। সকালে অ্যামস্টারডাম। একটি হোটেলে পৌঁছে সকালের নাশতা। তারপর যে-যার মতন ঘুরে বেড়ানো।
অ্যামস্টারডামে একা-একা ঘুরতে অসুবিধে হয় না। এখানে বেশির ভাগ মানুষ ত্রিভাষী–ওলন্দাজ ছাড়া ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মানের মধ্যে দুটি জানে–অন্তত কাজ চালাবার মতো। বেশির ভাগই ইংরেজি জানে এবং অপরকে সাহায্য করতে ইচ্ছুক। সুতরাং পথ জিজ্ঞেস করে ট্রামে করেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়।
এখানে ডাচ মাস্টারদের এত ছবি রাখা আছে! দেখে সত্যি সুখ হয়। তবু মনে হয়, আরেকবার আসতে হবে।
প্রান্তরের পর প্রান্তর নানা রঙের টিউলিপ ফুটে আছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।
উইন্ডমিল দেখি, পনির বানাবার কারখানা দেখি। ভিতরে যাই না।
অ্যামস্টারডামের খালে নৌকাভ্রমণ পর্যটকদের অবশ্য করণীয়। বস্তুত ভ্রমণটা আনন্দের। নৌকা থেকে এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো বাড়ি দেখা যায়। তাও চমকপ্রদ।
সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার পথে দেখি একদিকে নারী-পুরুষনির্বিশেষে জনস্রোত যাচ্ছে। আমি তাদের সঙ্গ নিই। দেখি, এক এলাকায় পরপর কয়েকটি বাড়িতে বিরাট কাঁচ-লাগানো ছোটো ঘরে একেকজন স্বল্পবসনা রঞ্জিতবর্ণা মহিলা ভঙ্গিসহকারে আসীন। অনেকটা অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছের মতো–তফাৎ এই যে, অ্যাকুরিয়ামে মাছ নড়াচড়া করে, আর এই নারীরা গতিহীন। হঠাৎ স্ট্যাচু বলে ভুল হতে পারে! দু-একজন তোক একটু এগিয়ে গিয়ে পাশের দরজা ঠেলে তাদের সঙ্গে বোধহয় দরদস্তুর করছে–তখনই কেবল তাদের মাথা হেলে, ঠোঁট নড়ে, অন্যথায় তারা নিশ্চল। রাস্তাটি খুব লম্বা নয়, তবে পুরো সড়কজুড়ে একই দৃশ্য।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বাবা দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায় যে তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, তাদের কালে বিজয়ার রাতে লোকজন দেবীপ্রতিমা দেখার মতো বারাঙ্গনাদর্শন করে বেড়াত, এ যেন সে রকম।
হোটেলে ফিরে আসি। দ্রুত কিছু খেয়ে নিই। তারপর কোচে চাপি। ভোরবেলা ফিরে আসি প্যারিসে।
১০.
প্যারিসের কাজ শেষ করে মার্চের ৬ তারিখে রাতের কোচে লন্ডনে রওনা হলাম। ফেরিতে ইংলিশ চ্যানেল পার হতে যে একটু রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম, সেকথা কবুল করা ভালো। সাতারু ব্ৰজেন দাশের কথা বারবার মনে পড়ছিল।
লন্ডনে আমার মাসখানেক থাকার পরিকল্পনা। উঠলাম আবদুল মোমেনের বাড়িতে। প্রথমে গেলাম ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে আগের বছরে আমার Factory Correspondence প্রকাশিত হওয়ায় আমার খাতির কিছু বেড়েছে। আরো একটা ব্যাপার। ১৯৭৯ সালে সেখানে কাজ করার সময়ে আমি ঢাকা কুঠির চিঠির খাতা পাই তেইশটা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, আরো চিঠির একটা খাতা লাইব্রেরিতে কোথাও অগোচরে আছে। অ্যাসিস্ট্যান্ট কিপার মাইকেল ও’কিফকে সেকথা বলেছিলাম, ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান আর জি সি ডেসমন্ডকেও বলেছিলাম। ওঁরা আমার কথাকে গুরুত্ব দেননি, তা নয়, তবে কিছু খুঁজে পাননি। এবার লাইব্রেরিতে যেতেই মাইকেল বললো, তোমার অনুমান যথার্থ। চিঠির আরেকটা খাতা এতদিনে পাওয়া গেছে। আমি হতাশ গলায় বললাম, তাতে আর কী লাভ? বই তো বেরিয়ে গেছে। মাইকেল বললো, চিঠির খাতা পাওয়ার পরই ডেসমন্ডের সঙ্গে এ-বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উনি ব্লুমফিল্ডের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তুমি যদি এটা তালিকাভুক্ত করতে রাজি হও, তাহলে আমরা ছোটো আকারে একটা সাপ্লিমেন্ট বের করবো এবং তোমার বইয়ের সঙ্গে এটা ক্রেতাদের এমনি দেওয়া হবে। এমনকী, যদি কেউ দাবি করে যে, তোমার বই কিনেছে, তাহলে সেও বিনা পয়সায় এর একটা কপি পাবে। অবশ্য তুমি যদি কাজটা করতে সম্মত হও, তবে এটা হবে। ভালোবাসার খাটুনি। আমরা কোনো পারিশ্রমিক তোমাকে দিতে পারবো না–লাইব্রেরির তেমন পয়সা নেই, এবং ব্রিটিশ অ্যাকাডেমির কাছে দুবার আমরা এর জন্যে মনজুরি চেয়েছি, এই একটা খাতার বিবরণ লেখার জন্যে আবার মনজুরি চাওয়া যাবে না। আমি বললাম, মাইকেল, তুমি জানো, তোমরা যে-পয়সা আমাকে দিয়েছ, তাতে আমার লন্ডনে থাকা-খাওয়ার খরচ কুলাতো না। ভাগ্যিস আমার বন্ধুবান্ধব ছিল এবং বিবিসির বাংলা বিভাগ ছিল। আমি এই কাজটা করবো, তাহলে এই পর্বের কাজ সমাধা হয়। তোমাদেরকে পয়সা দিতে হবে না। আমার বন্ধুবান্ধব এবং বিবিসি দীর্ঘজীবী হোক। আমার খরচ আমিই জোগাবো।
