গবেষণার উপকরণ সংগ্রহের লক্ষ্যে ছ মাস বাংলাদেশে কাটাবার জন্যে ১৯৮১ সালে ক্লিন্ট ফুলব্রাইট বৃত্তি লাভ করেন। তিনি স্থির করেন, তিন মাস ঢাকায় ও তিন মাস চট্টগ্রামে থাকবেন। আমাকে তিনি লেখেন চট্টগ্রামে তার থাকার ব্যবস্থা করতে। স্বগৃহে আমি তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ জানাই, তিনি তা গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তৃতা দেন, চট্টগ্রাম শহরে সভা সমিতিতেও যোগ দেন এবং আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েন। ছেলেমেয়েরা ক্লিন্ট চাচার সান্নিধ্য খুব উপভোগ করে।
পরে ক্লিন্ট বাংলা শেখার যে-বইটি লেখেন, তাতে তাঁকে লেখা রুচির একটি চিঠি নামধাম বদলে গ্রহণ করেন–চিঠি লেখার আদর্শ নমুনারূপে। আদর্শ মানে এখানে স্বাভাবিক, অকৃত্রিম।
ক্লিন্ট ঘরে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে থাকেন, খাবার দেওয়া হয়েছে বললেই হাতের কাজ ফেলে তৎক্ষণাৎ টেবিলে চলে আসেন। কাজে ও বিনা কাজে যারা আমার কাছে আসেন, অনেক সময়ে তিনি তাঁদের সঙ্গে আলাপ করেন। কামরু ভাই একবার ঢাকা থেকে গাড়ি চালিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে আসেন। তখন বেবী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমি শহরে চলে গিয়েছিলাম। ক্লিন্টই তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। কামরু ভাই পরে বলেছিলেন, ‘লুঙ্গি-পরা সাহেবের সঙ্গে বাংলায় কথা বলব না ইংরেজিতে, সেটাই স্থির করতে পারছিলাম না।
আমার এবার প্রবাসযাত্রার আগে চট্টগ্রাম শহরে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে আমাদের তরুণ সহকর্মী গোলাম মুস্তাফা আমার Factory Correspondence সম্পর্কে একটি আলোচনা পাঠ করে। ক্লিন্ট এ-সভায় উপস্থিত থাকেন এবং সবটা বেশ উপভোগ করেন বলে জানান।
আমি প্যারিসে পৌঁছোবার কিছুদিন পরে শিকাগো থেকে ক্লিন্টের বান্ধবী গোয়েনের একটি চিঠি পাই। সঙ্গে ৩০০ মার্কিন ডলারের একটি চেক। গোয়েন লিখেছেন, ক্লিন্টের কথামতো তিনি চেকটা পাঠাচ্ছেন। এটা ক্লিন্টের আতিথ্যগ্রহণের প্রতিদান বলে যেন আমি মনে না করি। বিদেশ-বিভুঁইয়ে টাকা পয়সার দরকার হতে পারে, অন্তত পরিবারের জন্যে কিছু কেনাকাটা করতেও। বন্ধুকৃত্য হিসেবে আমি যেন চেকটা গ্রহণ করি।
৭.
ইউনেসকোতে তখন আমার চেনাজানা দুজন কাজ করতেন : ড. আবদুল মুয়ীদ ও মাহফুজ আনাম। তার আগে মুয়ীদ ছিলেন কুমিল্লার পল্লী-উন্নয়ন একাডেমিতে। তাঁর মৃত্যুর পরে সেখানে একটি কক্ষ তাঁর স্মৃতিতে চিহ্নিত হয়েছে। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা হলেন ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বোন এবং বেবীর সহপাঠী। মুয়ীদের আমন্ত্রণে মাঝে মাঝে তার অফিসে যেতাম। সেখান থেকে তাঁর গাড়িতে করে তার বাড়ি। সেখানে আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে তিনি মেট্রোতে তুলে দিতেন আমাকে। নিজের মতো ফিরে আসতাম।
দেশের অবস্থা নিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই খুব উদৃবিগ্ন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উভয়েরই ছিল প্রবল আস্থা। সামরিক শাসন ও বিএনপির রাজনীতি তাঁদের অনুমোদন লাভ করেনি। বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার পুনরাবির্ভাব তাদের শঙ্কিত এবং অনেক পরিমাণে হতাশ করেছিল। আমার সঙ্গে তাঁরা প্রধানত এসব বিষয়েই কথা বলতেন।
মাহফুজ আনাম আমাকে তার বাড়ি নিয়ে গেল সপ্তাহান্ত কাটাতে। মেট্রো থেকে বেরিয়ে একটা সুন্দর বনাঞ্চল পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে। শাহীনের আতিথেয়তা পরম উপভোগ্য। রোজ তখন নিতান্তই শিশু–খুবই আদরণীয়। দেশের বিষয়ে উদ্বেগ থাকলেও মাহফুজের মধ্যে একটা আশাবাদ কাজ করে। হতাশ্বাস না হয়ে বরঞ্চ কী করণীয় আছে, সে তা খোঁজ করার পক্ষপাতী।
হাসনাতের মাধ্যমে পরিচয় হয় প্রলয় দত্তের সঙ্গে। সে এখানে আছে বেশ কিছুকাল, চেষ্টা করছে কৃতবিদ্য দোভাষী হতে। তার জন্যে একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা দরকার। ফরাসি ও স্প্যানিশ নিয়েছে সে, হয়তো জার্মানও সেইসঙ্গে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা ফরাসিতে অনুবাদও করছে। প্রলয়ের প্রাণশক্তি অসাধারণ। গল্প করে, হই-হুঁল্লোড় করে, সময় কাটাতে তার জুড়ি নেই। তার ফরাসি বান্ধবী অপেক্ষাকৃত চুপচাপ-ভাষার বাধাও তার একটা কারণ হতে পারে। আমি দেশে ফিরে আসার পরে একবার প্রলয় তার বান্ধবীকে নিয়ে চট্টগ্রামে নিজের বাড়িতে এসেছিল–তখন তারা দুজনেই চট্টগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে।
হাসনাতের দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু কুমার স্বল্পভাষী, খুবই সৌজন্যপরায়ণ। কী যেন একটা চাকরি করে। আর হাসনাতের স্প্যানিশ বান্ধবী অ্যালিস শিক্ষাবিষয়ে পড়াশোনা করছে। অ্যালিসের ইতালীয় স্বামী জিওভানি পেশায় ডাক্তার–চর্মরোগে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। দুজনই চমৎকার মানুষ। অ্যালিস তার বাবার গল্প করে–তিনি খ্যাতিমান স্থপতি। কোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-সংস্থা তাঁকে আহ্বান জানিয়েছিল আফ্রিকার একটি দরিদ্র দেশে বাঁধ নির্মাণের নকশা তৈরি করে দিতে। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে তার মনে হয়, বাঁধ তৈরি করে দিলেও তা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করার সামর্থ্য সেদেশের নেই। ফলে তা কাল হয়ে উঠতে পারে তাদের জন্যে। সুতরাং তিনি সেই কাজটি করতে অস্বীকার করেন। জিওভানি বলে, তার শ্বশুর খুব ভালো দাবাড়। তাকে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন কম্পিউটারে দাবা খেলতে। খেলতে গিয়ে জিওভানি দেখে, কম্পিউটারে প্রতিপক্ষ খালি খেলে না, তার খেলা নিয়ে কটাক্ষও করে। সত্যি সত্যি অপমান বোধ হয় তার, খেলা বন্ধ করে দেয়। জিওভানি পানভোজন রসিক। সেসব সম্পর্কেও তার গল্প করার এবং পরামর্শ দেওয়ার আছে। এই দম্পতির সঙ্গে পরেও আমার প্যারিসে দেখা হয়েছে, তারা স্থায়ীভাবে ইতালিতে চলে যাওয়ার পরেও কিছুকাল যোগাযোগ থেকেছে।
৮.
আমার লেখা কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরে আনোয়ার আবদেল-মালেক বলেন, ব্যস, আমি আর দেখতে চাই না। তুমি সব শেষ করে আমাকে দিও। আমার যদি কিছু যোগ করার থাকে, তখন আমি তা করবো।
