সিতের ডাইনিং হলে একদিন একটি মেয়ে এসে আমার নাম করে জানতে চাইলো, আমিই সেই ব্যক্তি কি না। তার অনুমান ঠিক, একথা জানাবার পরে সে নিজের পরিচয় দিলো। নাম হাসনাত জাহান। তার বড় বোন ফিরোজ জাহান ঢাকায় সরকারি কলেজে বাংলার শিক্ষক–আমার বিলক্ষণ পরিচিত। বস্তুত আমার ছোটোবুর সঙ্গে তাদের পরিবারের খুবই অন্তরঙ্গতা। হাসনাতের অধীত বিষয় ভিন্ন হলেও ফ্রাঁস ভট্টাচার্যের সঙ্গে সে গবেষণা শুরু করেছে অঁদ্রে জিদকৃত গীতাঞ্জলির অনুবাদ সম্পর্কে। সিতের বিশাল এলাকার মধ্যে অনেকগুলি মেজো বা ভবন আছে–কয়েকটি কোনো না কোনো দেশের নামে–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত প্রভৃতি, কয়েকটি অন্য নামে। এমনি একটি মেজোতে হাসনাত থাকে, খণ্ডকালীন কাজও করে।
সেদিন থেকে হাসনাত আমার পথপ্রদর্শক ও পরামর্শদাতা হয়ে গেল। সে আলাপ করিয়ে দিলো নাসিমা জামানের সঙ্গে। নাসিমা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রিলাভের জন্যে গবেষণা করছে। সে-ও আমার এক সহায় হয়ে দাঁড়ালো। ওরাই আমাকে নিয়ে গেল পপিদু সঁৎরে। তার অত্যাধুনিক স্থাপত্যরীতি বাইরে থেকে আমার ভালো লাগেনি, তবে ভেতরটা খুবই সুন্দর। দোকানপাট থেকে শুরু করে সিনেমা হল পর্যন্ত কী নেই সেখানে! সেখানকার সিনেমা হলে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি ছবি দেখেছিলাম।
হাসনাত আমার কাপড় ধোওয়ার সমস্যার সমাধান করে দিলো। ওদের মেজেতে লড্রেট আছে। সে নিজেই চাইলো সেখানে আমার কাপড়চোপড় ধুয়ে দিতে। আমি বললাম, মেশিনে কাপড় দেওয়া-নেওয়ার সময়ে সে উপস্থিত থাকলে যথেষ্ট সাহায্য হবে।
সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে হাসনাত, নাসিমা ও আমি দুপুরে একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন বাইরে থেকে আসা এক বা একাধিক বাংলাদেশি। তার মধ্যে ডা. ওয়াহিদ নামে এক তরুণ প্রায়ই আসেন। তিনি খুব নামজাদা এক ডাক্তারের অধীনে কাজ করেন। সেই প্রবীণের নানারকম খামখেয়ালির গল্প বলে মাতিয়ে রাখেন। ডা. ওয়াহিদ পরে হৃদ্রোগ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে খুব খ্যাতি অর্জন করেন এবং কিছুকাল আগে বারডেমের নতুন কার্ডিয়াক সেন্টারে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করে আবার ফ্রান্সে ফিরে যান।
হাসনাতই খবর দিলো যে, যুক্তরাষ্ট্র-ভবনে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা আছে এবং অন্য ভবনের অতিথিরাও সেখানে গিয়ে খেতে পারে। সেই থেকে আমার প্রাতরাশের জায়গা বদলে গেল এবং তৃপ্তির সঙ্গে দিন শুরু করতে সমর্থ হলাম।
রোববারে আমার ঘরের জানলা দিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেতাম। খোলা জায়গায় দু দল ইরানি ছাত্র সমবেত হয়েছে। একদল বয়ে এনেছে আয়াতোল্লাহ খোমেনির ছবি, আরেক দলের হাতে শাপুর বখতিয়ারের প্রতিকৃতি। দুদল আলাদা সভা করছে। খানিক পরই একদল চড়াও হচ্ছে অপর দলের ওপরে। অনতিবিলম্বে গাড়িভর্তি পুলিশের আবির্ভাব হাতের মোটা ব্যাটন দিয়ে তারা নির্বিচারে ইরানিদের মারছে, অনেককে ধরে গাড়িতে তুলছে। বাদ-প্রতিবাদ এভাবে মুলতবি হচ্ছে পরের রোববার পর্যন্ত।
প্যারিসে আসার পরপরই ফোন করলাম আমাদের ভিয়েতনামি বন্ধু লে থান খোয়কে। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিয়োটো সিম্পোজিয়ামে। সে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিষয়ের অধ্যাপক, অতি চমৎকার মানুষ। আমার ফোন পেয়েই যথেষ্ট উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো এবং পরের শনিবারই লাঞ্চ খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো তার বাড়িতে। এখন ভাবতে লজ্জা করে, পয়সাকড়ির হিসেব করে আমি খুব শস্তা একটা হোয়াইট ওয়াইন কিনে নিয়ে গেলাম তার জন্যে। লে থান খোয় এমনই ভদ্রলোক, সঙ্গে সঙ্গে সেটা ফ্রিজে রেখে দিয়ে খাওয়ার সময়ে পরিবেশন করলো। অবশ্য তার বিকল্পও ছিল। সেই দুপুরে তার আরেকজন অতিথি ছিলেন ইউনেসকোর এক আফ্রিকান কর্মকর্তা–বেশ উচ্চ পদাধিকারী। ভদ্রলোক আমাকে উৎসাহ দিতে বললেন, ফরাসি ভাষা ইংরেজির চেয়ে অনেক সহজ, তোমার শিখতে সময় লাগবে না। ইংরেজরা লেখে এক রকম, বলে আরেক রকম, বুঝতেই প্রাণান্ত। আমি বললাম, ফরাসিরা যা লেখে, তার অর্ধেক যে উচ্চারণ করে না, সেটাই তো আমার কাছে সমস্যা মনে হয়। ভাষা ছেড়ে উঠলো খাবারের প্রসঙ্গ। লে থান খোয় বললো, প্যারিসে ভিয়েতনামি রেস্টুরেন্ট আছে অনেক। একটু ভালো জায়গার ভিয়েতনামি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ওয়েটারের সাহায্য নিয়ে ফরমাশ দিলে তুমি ঠকবে না। সে কয়েকটা খাবারের নামও বলে দিয়েছিল।
সেসব নাম মনে রাখতে পারিনি। তবে তার পরামর্শমতো গোটা দুই ভিয়েতনামি রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবারের ফরমাশ দিয়েছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। আমার ফরাসি ভাষাশিক্ষা মোটেই এগোয় নি। ক্রিস্তিন। বলেছিলেন রোজ সন্ধ্যায় টেলিভিশনের খবর শুনতে। আমাদের রেজিসের টিভিরুমে গিয়ে সে-চেষ্টা করেছিলাম। সবসময়ে খবর দেখতেও পেতাম না, কেননা অন্য চ্যানেলের কোনো প্রোগ্রাম হয়তো অন্য কেউ দেখছেন। ভাষাশিক্ষার জন্যে যে-সময় দিতে হয়, তাও আমার হাতে ছিল না। সুতরাং আমার ফরাসিজ্ঞান সৌজন্যবিনিময় এবং সামান্য কিছু কেনাকাটার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি হলো না।
৬.
আমার আলজিয়ার্স যাওয়ার আগেই আমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ক্লিনটন বুথ সিলি, সে কথাটা এখানে উল্লেখ করার মতো। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে গবেষণা করে এবং তাঁর কবিতার অনুবাদ করে ক্লিন্ট বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। জীবনানন্দ সম্পর্কে তাঁর বই A Poet Apart উচ্চপ্রশংসিত হয় এবং বাংলা সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকার জন্যে ক্লিন্ট পরে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন–সে পুরস্কারের অর্থও তিনি জীবনানন্দের কবিতার প্রচার ও প্রসারের জন্যে ব্যয় করতে কবি-পরিবারের হাতে তুলে দেন।
