অতএব এক সকালে পাশের বাড়ি গিয়ে হানা দিলাম এবং সুসানা ব্রুনার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললাম। মুশকিল হলো এই যে, তার ইংরেজিজ্ঞান কিছুটা সীমাবদ্ধ, ফলে নিজের প্রবন্ধের যে-ইংরেজি ভাষ্য সে মুখে-মুখে প্রণয়ন করছিল, তা স্প্যানিশ বাক্যরীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারছিল না। আমি তার কথামৃত টুকে রাখছিলাম বটে, তবে সর্বত্র মর্মভেদ করতে সমর্থ হচ্ছিলাম না।
এর মধ্যে তার গৃহকত্রী একাধিকবার দেখা দিলেন এবং কফি ও খাবার পরিবেশন করলেন। ভদ্রমহিলাও, মনে হলো, মেক্সিকান এবং সন্দেহাতীতভাবে অপূর্ব সুন্দরী। বিদায় নেওয়ার সময়ে তিনি বললেন, যেহেতু আমি তার নিকটতম প্রতিবেশী, সেহেতু তিনি আশা করবেন, সুসানা চলে যাওয়ার পরও আমি তার খোঁজ নেবো। আমি বার দুই ফোন করেছিলাম, কিন্তু পরিচারিকার সঙ্গে ফরাসিতে কিছু বলতে অপারগ হওয়ায় গৃহকত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারিনি। আমি নীরব থাকলেও ভদ্রমহিলা যেচে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, তা বোধহয় সভ্য সমাজের দস্তুর নয়।
৪.
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিষ্ঠান আছে–আঁস্তিত্যু নাসিওনাল দ্যে লংগ এ সিভিলিজাসিওঁ ওরিয়তাল বা প্রাচ্যের ভাষা ও সভ্যতা সম্পর্কিত জাতীয় ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে ইনালকো। সেখানে বাংলা ভাষার শিক্ষক তখন দুজন–ফ্রাঁস ভট্টাচার্য ও সিরাজুল ইসলাম। মঙ্গলকাব্য সম্পর্কে গবেষণা করে ফ্রাঁস ডক্টরেট অর্জন করেছেন, বাংলা থেকে ফরাসিতে অনুবাদ করেছেন প্রচুর–যেমন, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি, সত্যজিৎ রায়ের অনেক ছবির ফরাসি সাব-টাইটুল তার করে দেওয়া। সিরাজুল ইসলাম মূলত পরিসংখ্যানবিদ, তবে ওই ইনস্টিটিউটে বাংলা পড়াচ্ছেন অনেককাল ধরে। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় লন্ডনে, ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে–সেখানে তিনি বঙ্গদেশে মরত্ব বা নশ্বরতা নিয়ে দুঃসাধ্য ও চমকপ্রদ গবেষণার উপকরণ আহরণ করছিলেন। এই বাংলা শিক্ষকদ্বয়ের সম্পর্ক আদর্শস্থানীয় নয়। সুতরাং তাদের সঙ্গে আলাদা করে সাক্ষাৎ করতে হলো।
ফ্রাঁস খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে গ্রহণ করলেন। আমার একটা বক্তৃতার আয়োজন করলেন তিনি ইনালকোতে। তাছাড়া যে জন পনেরো ছাত্রছাত্রী বাংলা পড়ে, তাদের তার বাড়িতে চায়ের নিমন্ত্রণ করলেন আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যে। আমি তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তারা বাংলা শিখতে চায় কেন। কেউ বললো, সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখে সে আগ্রহী হয়েছে; কেউ বললো, রবীন্দ্রনাথের কোনো লেখার অনুবাদ পড়ে মূল ভাষাটা জানতে উৎসাহী হয়েছে। একটি মেয়ে বললো, তার ছেলে-বন্ধু বাংলাভাষী, তাই সে বাংলা শিখতে চায়।
আমার অনুরোধে ফ্রাঁস আমাকে নিয়ে গেলেন বিবলিওথেক নাসিওনালে এবং সেখানকার সদস্য হতে সাহায্য করলেন। সময় ও সুযোগমতো আমি সেখানে বসে আঠারো শতকের বাংলা পাণ্ডুলিপিগুলো দেখি। এর মধ্যে ইন্দ্রাণীর সংগৃহীত সেক্রেতেয়ার বেঙ্গলের পাণ্ডুলিপি ছিল–তার সবটাই আমি হাতে নকল করে নিই। তাছাড়া অগুস্তে অসার শব্দমালাগুলো দেখি এবং বাংলা আদর্শলিপির মতো একটা পাণ্ডুলিপিও পরীক্ষা করি। ফ্রাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্থির করলাম, যদি কখনো সময় ও সুযোগ হয়, তিনি ও আমি মিলে অন্তত অসার বাংলা-ফরাসি শব্দমালা সম্পাদনা করবো। বহুকাল পরে সত্যিই কাজটি করতে পেরেছিলাম।
ফ্রাঁসের স্বামী লোকনাথ ভট্টাচার্য তখন ভারতে–বোধহয় সাহিত্য একাডেমির সচিবের দায়িত্বস্বীকার করে দিল্লিতে কর্মরত। তাঁদের একমাত্র সন্তান-কন্যা–ইসা অত্যন্ত সদালাপী। প্রাণরসায়ন পড়ে ফার্মেসিস্ট হবে বলে তখন সে ভাবছিল।
সিরাজুল ইসলাম সিতে য়ুনিভার্সিতেয়ারে চলে এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর মনে হয়েছে, ইনালকো তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। তাই তিনি কর্তব্যের অধিক কোনো কাজেই সেখানে জড়াতে চান না। এই কারণে আমার বক্তৃতায় উপস্থিত থাকেননি, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের সময়েও নয়। এমন অভিমান করে হয়তো তিনি ছাত্রছাত্রীদের থেকেও দূরে চলে যাচ্ছিলেন, যা শিক্ষকের জন্যে অভিপ্রেত নয়। তিনি কিছু একটা করতে চাইছিলেন, কিন্তু ঠিক কী যে করবেন, তা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
৫.
আমি সকালে উঠে মুখ হাত ধুয়ে রাস্তাটা পার হয়ে সিতে য়ুনিভার্সিতেয়ার স্টেশনে আসি। সেখানে কফির দোকানে দাঁড়িয়ে ক্রোয়াসে আর কফি খাই। দুপুরে হয় সিতের মূল ডাইনিং হলে এসে ছাত্রদের সঙ্গে লাঞ্চ খাই তুমুল হইচইয়ের মধ্যে, নয়তো সিএনআরএসে এসে ক্রিস্তিনের সঙ্গে–অথবা তিনি ব্যস্ত থাকলে একাই–খাওয়াটা সারি। লেখালিখির কাজটা ঘরে বসেই করি বেশির ভাগ। খানিকদূর লেখা হলে ক্রিস্তিনকে দিয়ে যাই টাইপ করার জন্যে। সন্ধ্যায় স মিশেল এলাকায় যাই। সেখানে নানা দেশীয় খাবারের রেস্টুরেন্টের সারি। কোনো একটায় রাতের খাবার খাই। কখনো কখনো ফাস্ট ফুড খেয়ে নিই। কদাচিৎ ভালো রেস্টুরেন্টে যাই। জাঁ পল সার্ত যেখানে আড্ডা দিতেন, সেখানে যেমন গেলাম এক সন্ধ্যায়।
ঘরে বসে কাজ করার সময়ে কফি বানিয়ে খাই। একদিন লক্ষ করলাম অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাসটা গরম হওয়ায় কাঠের মেঝেতে কালো দাগ পড়ছে। ওটার ব্যবহার বন্ধ করে দেবো ভাবলাম। সেদিন মেইডের চোখেও দাগটা ধরা পড়ল। সে কীসব বললো। ভাবলাম, তিরস্কার করছে বা সাবধান করে দিচ্ছে। খানিক পরে দেখি, সে আবার এসেছে, এবারে হাতে একটা সেরামিক ইট। ঘরের একধারে ইটটা রেখে তার ওপরে অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাসটা বসিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, এবার আর দাগ পড়ার আশঙ্কা নেই। এক গাল হেসে মাথা। দুলিয়ে সে যা বললো, তার মর্মার্থ হয়তো ঠিক আছে? কিংবা খুশি তো? আমি তাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালাম।
