আলজিয়ার্স থেকে আনোয়ার, মাদাম কলপ ও ফাদার রাইবস একসঙ্গে ফিরে গেলেন প্যারিসে। অন্য একটি ফ্লাইটে পার্থ ও আমিও সেখানে যাত্রা করলাম। পার্থ কয়েকদিন থাকবেন প্যারিসে। আমার প্রায় মাসতিনেক থাকার পরিকল্পনা। সিতে য়ুনিভার্সিতেয়ারে রেজিস রোবের গারিক বলে একটি অংশ আছে–সফরকারী বিদেশি শিক্ষকদের থাকতে দেওয়া হয় সেখানে। ওই রেজিসে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।
৩.
প্যারিসে পৌঁছানোমাত্র আনোয়ার আবদেল-মালেকের সেক্রেটারি ক্রিস্তিন কলপা আমাকে তার পক্ষপুটে টেনে নিলেন। ঠিকমতো পৌঁছোলাম কি না এবং রজিস রোবের গারিকে আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি না, তা জানতে টেলিফোন করলেন প্রথমে। পরদিন সকালে আনোয়ারের অফিসে কীভাবে পৌঁছোবো, তার হদিস দিলেন।
আনোয়ার আবদেল-মালেকের অফিস সঁত্র নাসিওনাল র্যশেৰ্শ সিয়ান্তিফিক বা সংক্ষেপে সিএনআরএসে। সেখানে তাঁর কক্ষে বসেন ক্রিস্তিন এবং কনিষ্ঠ সচিব সানিয়া আরুসি। সানিয়া আরব ও তরুণী, ফরাসি তার মাতৃভাষার মতো, ইংরেজিও আয়ত্তে, তবে দ্রুত কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। সেই ঘরেই জানলার পাশে আমার জন্য চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। ক্রিস্তিন আমাকে সঙ্গে করে অফিস থেকে বেরিয়ে প্রথমে গেলেন ব্যাংকে–আমার হিসাব খুলতে। তারপর বড় একটা দোকানে গিয়ে–আমার কী কী লাগবে, জেনে নিয়ে এবং কী কী লাগতে পারে, ভেবে নিয়ে–একে একে সব সংগ্রহ করে দিলেন। তার মধ্যে একটি অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাস ছিল–তাতে বৈদ্যুতিক তার লাগিয়ে ইমারশন হিটারের মতো চা-কফির জন্যে পানি গরম করা যেতো–ভারি সুবিধের। জিনিসপত্র কিনে-কেটে সিএনআরএসে ফেরা। সেখানে আমার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা, ওই বিশাল ভবনের যেসব অংশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অপরিহার্য–যেমন, লাইব্রেরি, ডাইনিং রুম, ক্যাফেটারিয়া–সেগুলো চেনানো এবং ভর্তুকি-দেওয়া হারে খাবার কুপন কেনা। তারপর দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া। তিনি বাড়ির টেলিফোন নম্বর আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। এখন খুব জোর দিয়েই বললেন, প্রয়োজন হলেই যেন যে-কোনো সময়ে তাঁকে নিঃসঙ্কোচে ফোন করি বাসায়। ক্রিস্তিনকে আমি মাদাম কলপা বলে ডাকতাম, তিনিও আমাকে প্রফেসর আনিস বলে সম্বোধন করতেন। এই আনুষ্ঠানিকতা সত্ত্বেও আমাদের গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। অফিসের বাইরেও আমরা একসঙ্গে খেয়েছি, একসঙ্গে সিনেমায় গেছি, তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছি, তাঁর স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, যে-কোনো সময়ে তাঁর সাহায্য চেয়েছি এবং পেয়েছি।
আলজিয়ার্স থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় আর আমি একসঙ্গে প্যারিসে এসেছিলাম। পার্থর স্ত্রী সেখানে আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমাদের তিনজনকে এক সন্ধ্যায় আনোয়ার আবদেল-মালেক তাঁর বাড়িতে নৈশভোজে ডাকলেন। তার সঙ্গে তাঁর মিশরীয় ডাক্তার স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে অনেক দিন। মহিলা বোধহয় জেনেভায় থাকেন। তাদের কন্যা–একমাত্র সন্তান–ডাক্তারি পড়ে ভিয়েনায়। আমরা গিয়ে দেখলাম, অতি সুন্দরী এক ফরাসিনী রান্নাবান্না করছেন, যথাসময়ে তিনিই পরিবেশন করে খাওয়ালেন। পরেও দেখেছি, আনোয়ার কাউকে বাড়িতে খেতে ডাকলে কোনো না কোনো মহিলা এসে সবকিছু সামাল দেন। একইসঙ্গে গুণবান ও রূপবান হওয়ার এই সুবিধাটা তিনি পুরোপুরি লাভ করেছেন এবং ভোগ করেছেন।
সেই প্রথম সন্ধ্যায় আনোয়ারের ফ্ল্যাটে ঢুকে তাঁর সুন্দরী বান্ধবীকে লক্ষ করার আগে যা চোখে পড়েছিল, তা ড্রয়িংরুমের টেবিলে রাখা জামাল আবদেল নাসেরের আবক্ষ প্রতিকৃতি। জীবনের শেষদিকে নাসের যখন মিশরে বামপন্থীদের দমন করতে অগ্রসর হন, তখন গ্রেপ্তার এড়াতে এক গভীর রাতে আনোয়ার আবদেল-মালেক স্বদেশ ত্যাগ করে ফ্রান্সে চলে আসেন। সেই থেকে প্যারিসই তার স্থায়ী আবাস, যদিও পরে তিনি নিজের মায়ের কাছে এবং দেশমাতৃকার কাছে ফিরে গেছেন। এসব কথা ভেবেই আমি মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি না নাসেরের দ্বারা নির্যাতিত ও বিতাড়িত, তাহলে তাঁর ছবি কেন আপনার ঘরে শোভা পাচ্ছে? আনোয়ার দ্বিধাহীনভাবে বলেছিলেন, নাসের আমার প্রতি সুবিচার করেননি, কিন্তু মিশরের জন্য তিনি যা করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। হয়তো আর কয়েক বছর বাঁচলে তার নীতির পরিবর্তন হতো এবং আমি দেশে ফিরে যেতে পারতাম। আনোয়ার সাদাতকে আনোয়ার আবদেল মালেক যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়নক ভাবতেন। আমরা যখন সেই সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে বসে আলাপ করছি, তখন সাদাত নিহত এবং হোসনি মুবারক সদ্য রাষ্ট্রপতি হয়েছেন মিশরের। তাঁর প্রতিও আনোয়ারের আস্থা ছিল না। আনোয়ার ছিলেন ইসরাইলের চরম বিরোধী। নাসের ছাড়া আর কেউ সত্যিকারভাবে ইসরাইলের বিরোধিতা করেছেন বলে তিনি মনে করতেন না। তার সন্দেহ ছিল, ইসরাইলি গোয়েন্দারা তাঁকে চোখে-চোখে রাখছে। তিনি বলতেন, হে আমার প্রিয় ভ্রাতা, রমণীর সান্নিধ্যলাভের বিষয়েও খুব সতর্ক থাকতে হয়, কারণ ইসরাইলিদের কৌশলের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
প্যারিসে আমার কাজটা ছিল আলজিয়ার্সে সদ্যসমাপ্ত সেমিনারের কার্যবিবরণী তৈরি করা। অধিবেশন-অনুযায়ী পঠিত প্রবন্ধগুলো সাজিয়ে তার একটা ভূমিকা লিখে আমি দায়িত্ব শেষ করতে পারতাম। কিন্তু আমি তার বদলে চেয়েছিলাম, ভাব-অনুযায়ী একটা কার্যবিবরণী তৈরি করতে। একই প্রবন্ধে যদি একাধিক ভাবের প্রসঙ্গ এসে থাকে, তবে সেই প্রবন্ধকে ভাব-অনুযায়ী ভাগ করে একাধিক জায়গায় সন্নিবিষ্ট করতে। ফরাসি, স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষায় লিখিত প্রবন্ধ নিয়ে কী করবো, তা ছিল আমার শিরঃপীড়ার বিষয়। আনোয়ার। বলেছিলেন ফরাসি প্রবন্ধগুলো ক্রিস্তিন ও সানিয়া মিলেমিশে ব্যাখ্যা করে দেবেন। আমার কাছে। ওই সন্ধ্যায় তিনি বললেন, তোমার জন্যে সুসংবাদ, সুসানা ব্রুনাও আলজিয়ার্স থেকে প্যারিসে এসেছে এবং থাকছে তার এক বান্ধবীর সঙ্গে–তুমি যেখানে আছ, তারই পাশের বাড়িতে। সুন্দরী মহিলার সঙ্গে কাঁধ ঘষাঘষি করতে তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে আমি সুসানাকে বলে দিচ্ছি, তুমি তার ওখানে যাবে এবং যতক্ষণ লাগে, সে তার স্প্যানিশ প্রবন্ধ তোমাকে ইংরেজি করে শোনাবে। আমি বললাম, আপনার মতো আকর্ষণীয়তা আমার নেই, তবে আপনার জানা উচিত, মহিলাদের অনুবর্তী হতে আমার কোনো দ্বিধাও নেই।
