সেমিনারে যোগ দিলাম দ্বিতীয় দিনে। দেখি, কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন দি সোশাল সায়েন্সেসের পার্থ চট্টোপাধ্যায় এসেছেন–সেন্টারের অতিথি ভবনে একাধিকবার থাকার সুযোগে তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল। নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছেন ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন–তারই আমন্ত্রণে ১৯৭৪ সালে মন্ট্রিয়লে গিয়েছিলাম এক সেমিনারে। এখন তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কে (বিংহ্যামটন) ফার্ডিনান্ড ব্রডেল সেন্টার ফর দি স্টাডিজ ইন ইকনমিক্স, হিস্টরিকাল সিসটেমস অ্যান্ড সিভিলিজেশনের পরিচালক–তাঁর সেন্টার সম্পর্কিত কাগজপত্র আমাকে নিয়মিত পাঠিয়ে থাকেন চট্টগ্রামে। প্যারিস থেকে এসেছেন ফাদার ব্রুনো রাইবস–যে-শ্রেণির যাজকেরা আফ্রিকায় ও ল্যাটিন আমেরিকায় এসটাবলিশমেন্ট-বিরোধী সংগ্রামে জড়িত, তিনি সেই শ্রেণির; বলেন, খ্রিষ্টের শিক্ষাই তাঁকে প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, কিয়োটোতে।
নতুন করে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রেক্টর হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার সমাজবিজ্ঞানী সোয়েজাতমোকো। মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুসেন আলি–বামপন্থী চিন্তাধারার জন্যে জেল খেটেছেন অনেককাল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জন ডান। মেক্সিকোর এক গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ড. সুসানা ব্রুনা। বুদাপেস্টের কার্ল মার্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ড. তামাস জানতেস। আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রধান নাজি সাফির। দার-এস-সালামের এক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এমনুয়া। আরো অনেকে। তার মধ্যে আনোয়ার আবেদল-মালেকের সচিব ক্রিস্তিন কলপার কথা পরে বলতে হবে।
আনোয়ার আবদেল-মালেক নাকি সেমিনারের মূল প্রতিবেদক করতে চেয়েছিলেন আমাকে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে ভার বর্তালো পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ওপরে। তবে চারটি অধিবেশনের একটির রিপোর্ট আমাকে তৈরি করতে হলো। বাকি তিনটি করলেন অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অয়ভিন্দ অসতেরুদ, ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা-কেন্দ্রের পরিচালক ড. হোসে অগাস্তিন সিলভা-মিশেলেনা এবং বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ব্লাদিমির স্তামবুক।
সেমিনার চললো ১৩ থেকে ১৭ ডিসেম্বর অবধি। ১৫টি প্রবন্ধ, আটটি গবেষণা-প্রতিবেদন, আরেকটি বাড়তি লেখা। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে যে-সেমিনার দুটি করেছিলাম, আমারটা ছিল তার আলোচনার সারসংক্ষেপ। পার্থের লেখাটাও এমনি প্রতিবেদন-শ্রেণিভুক্ত। সেটি পরে তাঁর Nationalist Thought and the Colonial World (লন্ডন, ১৯৮৬) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এটি পড়ার আগে তিনি ছোটো যে-ভূমিকা করেছিলেন, তাতে বলেছিলেন যে, আমার উপস্থিতিতে লেখাটি পড়তে তার সংকোচ হচ্ছে, কেননা, এতে বাংলার যেসব লেখকের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আমি অনেক বেশি জানি। পার্থের এ-কথায় অনেকেই আমাকে মস্ত পণ্ডিত বলে ভুল করেছিলেন। কলম্বো থেকে সুসান্ত গুণতিলেকে আসতে পারেননি, কিন্তু ঐতিহ্য ও আধুনিকতা সম্পর্কে অতি চমৎকার একটি প্রবন্ধ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আরো কয়েকটি ভালো প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছিল। লেখাগুলো ছিল আরবি, ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশে। ফলে তাৎক্ষণিক অনুবাদের ওপর খুব ভরসা করতে হয়েছিল।
যে-হোটেলে আমরা ছিলাম, সেমিনার হয়েছিল সেখানেই। তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাই বেশি হয়নি। যেখানে বেনবেল্লা গৃহবন্দি ছিলেন দীর্ঘকাল, তার সামনে দিয়ে বারদুই আসা-যাওয়া করতে হলো। বেনবেল্লা বোধহয় তখন দেশত্যাগের শর্তে মুক্ত হয়েছেন–প্যারিসে প্রবাসজীবন যাপন করছেন। বুমেদিন তখন আর বেঁচে নেই। তবে আলজিরিয়ার স্বাধীনতা-সংগ্রামের বেশ কিছু স্মারক এখানে-ওখানে দেখা গেল। তবে তার চেয়েও বেশি দেখা গেল নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বত্র উপস্থিতি। ইসলামপন্থীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তারও কিছু আভাস পাওয়া গেল। এফএলএনের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সেমিনারের বোর্ড অফ অনারে ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হলো।
একদিন সবাই মিলে যাওয়া হলো আলজিয়ার্সের বাইরে। রোমানরা যখন এই অঞ্চল শাসন করেছিল, তার স্মৃতিনিদর্শন দেখতে। রোমানদের তৈরি নগর দেওয়ালের ভগ্নাবশেষ তখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। সে-আমলের নগর পরিকল্পনার কিছু বিস্ময়কর প্রমাণও পাওয়া গেল।
রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহর আমন্ত্রণে এক সন্ধ্যা তাঁর বাড়িতে কাটালাম। ঢাকা থেকে তিনি খবর পেয়েছিলেন আমার আসার, পৌঁছে আমিও ফোন করেছিলাম। এই সৌজন্যপরায়ণ মানুষের সান্নিধ্যে সন্ধ্যাটা ভালো কাটলো।
হোটেলে একদিন আনোয়ার আবদেল-মালেকের সঙ্গে দেখা করতে এলো দুটি মেয়ে। তার মধ্যে একজন অপূর্ব সুন্দরী। আনোয়ার তার নাম দিয়েছিল নেফারতিতি। আলজিয়ার্সে রাষ্ট্রীয় বেতারের ঘোষিকা। আরবি ছাড়াও ভালো ইংরেজি ও ফরাসি বলে। অনেককাল পরে প্যারিসে আনোয়ারের ঘরেই আবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
