ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান ডেসমন্ড আমাকে জিজ্ঞাসা। করেছিলেন, কত কপি বই ছাপবেন। আমি বলেছিলাম, পাঁচ পাউন্ডের কম দাম হলে ৫০০, নইলে ৩০০। ডেসমন্ড হতাশ হয়ে বললেন, এত কম! আমি বলেছিলাম, এটা শোওয়ার আগে পড়ার (বেডসাইড রিডিং’) মতো বই হতে যাচ্ছে না। তারা বইয়ের দাম ধরেছিলেন ১৬ পাউন্ড। আমার ধারণা, ওই বইয়ের বড়ো ক্রেতা ছিলাম আমিই। পরের বছর লন্ডনে গিয়ে, বন্ধুবান্ধবদের উপহার দেওয়ার জন্যে, আমি পাঁচ কপি বই কিনেছিলাম।
২.
দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, যদিও যেদিন ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সেনা বিদ্রোহের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেদিনই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি-নির্বাচন। বৃহৎ মন্ত্রিসভা-গঠন। আমার খুবই শ্রদ্ধেয় মানুষ ড. এম এন হুদার উপরাষ্ট্রপতিরূপে নিয়োগলাভ।
এর মধ্যে শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে এলো। আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সে দেশে ফিরেছিল, তার পরপরই জিয়া-হত্যার ঘটনা ঘটে। সেদিন সে সফরে গিয়েছিল সিলেটে। এখন চট্টগ্রাম-সফরে এসে সে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলো ক্যাম্পাসে। তার এ সৌজন্যবোধে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এতদিন। পরে দেখা হওয়ায় প্রথমেই তার স্বজন-হারানোর দুঃখের কথাটাই মনে ভিড় করেছিল। রাজনীতির কথা যা হয়েছিল, তা সামান্য।
এদিকে সেনাপ্রধান এরশাদ হঠাৎ করে খুব সক্রিয় হয়ে উঠলেন। আজ এক সেনানিবাসে, কাল আরেক সেনানিবাসে বক্তৃতা। এ-কাগজে সাক্ষাৎকার, ও কাগজে বিবৃতি। দেশের শাসনব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর অংশ দাবি করে বসলেন তিনি। জেনারেল ওসমানী বললেন, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় এমন বিবৃতি দেওয়া সকল নিয়মবহির্ভূত। কা কস্য পরিবেদনা!
এই পরিস্থিতিতে আমি চলে গেলাম দেশের বাইরে এবং বেশ কিছু কালের জন্যে। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পের অংশস্বরূপ আনোয়ার আবদেল-মালেক ‘বিশ্বের রূপান্তর’ শিরোনামে পাঁচটি নতুন সেমিনার অনুষ্ঠানের প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে নেন। প্রথমটি বেলগ্রেডে হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে, ১৯৭৯ সালে; দ্বিতীয়টি হলো মাদ্রিদে, অর্থনীতি ও সমাজ নিয়ে, ১৯৮০ সালে। দ্বিতীয়টিতে তিনি আমাকে যোগ দিতে বলেছিলেন; মাদ্রিদে কখনো যাওয়ার সুযোগ পাইনি, তা সত্ত্বেও সেখানে আমি যাইনি, বিষয়টি আমার এলাকাভুক্ত নয় বলে। ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে তিনি আলজিয়ার্সে সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা-বিষয়ে (Culture and Thought in the Transformation of the World) তৃতীয় সেমিনার করবেন। এতে আমাকে যোগ দিতে হবে, শুধু তাই না, এই সেমিনারের বিবরণও গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্যে তাঁর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদন করতে হবে। আমি রাজি হলাম। তবে এই শর্তে যে, আলজিয়ার্সে সেমিনারে যোগ দেওয়ার পরে আমি প্যারিসে তাঁর কাছাকাছি থেকে বিবরণ সম্পাদনা করবো। বস্তুত, দেশে আমার নানাধরনের সংশ্লিষ্টতার কারণে আশঙ্কা হচ্ছিল, সম্পাদনার কাজটা সময়মতো শেষ করতে পারবো না। তার ওপর এক সম্পাদক প্যারিসে, অপরজন চট্টগ্রামে, সমন্বয়সাধনও দুরূহ। আনোয়ার আবদেল-মালেককে বললাম, আমার পারিশ্রমিকের অর্থটা প্যারিসে দিলে তা দিয়ে আমার থাকা-খাওয়া চলে যাবে। তিনি যেন তেমন ব্যবস্থা করেন। আনোয়ার খুবই খুশি হলেন, তবে তিনি নিশ্চয় আমাকে বেকুব ঠাওরালেন।
অতএব এক ‘পউষ প্রখর শীতে ঝঝর ঝিল্লিমুখর রাতি’তে (বোধহয় পৌষ আসতে তখনো দু-চারদিন বাকি ছিল) চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে, দিল্লি বোম্বাই-রোম হয়ে আলজিয়ার্স রওনা হলাম। ঢাকায়, আমার বন্ধু আবদুল আলীর জ্যেষ্ঠাগ্রজ, এ জেড এম আবদুল আলিম বললেন, ‘সে কী, তুমি আলজিরিয়া যাচ্ছো, মিসেস আলজিরিয়া তো এখন ঢাকায়। তাঁর শ্যালিকা ইলার স্বামী আবুল ফতেহ্ আলজিয়ার্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। ওই সময়টায় ইলা আবার ঢাকায়। তাই তার এই বিস্ময় বা দুঃখবোধ।
ঢাকা থেকে রোম পর্যন্ত গেলাম এয়ার ইন্ডিয়ায়। ওখান থেকে অন্য এক এয়ারলাইনসে আলজিয়ার্স। বিমানবন্দরে পৌঁছে ভিসা পেতে কোনো অসুবিধে হলো না। এক সরকারি কর্মকর্তা আমাকে নিতে এসেছিলেন সেখানে। অল্পসময়ে আনুষ্ঠানিকতা পার করে তিনি আমাকে পৌঁছে দিলেন হোটেলে। রোম-আলজিয়ার্স অংশে বিমানে নৈশভোজ করতে হয়েছিল। তাতে এমন কিছু খেয়েছিলাম, যা আমার সয়নি। রাতে বমি করতে শুরু করলাম। বেসিন ভরে গেল, আমি দুর্বল হয়ে পড়লাম। কোনোক্রমে বমি করতে যাই আর বিছানায় ফিরে আসি। ঘরের টেলিফোন কাজ করে না, সাহায্য প্রার্থনা করার উপায় নেই। সকালে যে-মেয়েটি ঘর পরিষ্কার করতে এলো, সে আরবিতে কী যে বললো, বোঝার উপায় নেই। ভাবলাম, এবার সাহায্য আসবে। এলো না। সকালে সেমিনারের উদ্ববাধনী অনুষ্ঠান। আমি হোটেলে, অথচ অনুষ্ঠানে নেই। সেই অধিবেশনের শেষে আনোয়ার আবেদল-মালেক এলেন সেমিনারের সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি ড. জামিল বেনবুজিদকে নিয়ে আমার খোঁজ করতে। ভাগ্যক্রমে তিনি একজন পেশাদার চিকিৎসক, এদেশের উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গবেষণা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক। তিনি এসে আমাকে দেখলেন, ব্যবস্থাপত্র লিখলেন, ওষুধ পাঠিয়ে দিলেন, দিনটা বিশ্রাম করে কাটাতে বললেন, টেলিফোন ঠিক করার ব্যবস্থা করলেন। তার কথা শুনেই অর্ধেক ভালো হয়ে গেলাম, অধিবেশনে অনুপস্থিতির ফলে লজ্জিত হওয়ার কারণও অপসৃত হলো।
