যেহেতু আমি অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল তাই নিয়ম অনুসারে আমার সার্বিক তত্ত্বাবধানে কোর্ট মার্শাল হওয়ার কথা। অথচ, আমাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে না জানিয়ে এবং না জড়িয়ে সেনাবাহিনীর প্রচলিত আইন ভেঙে ওইসব কোর্ট মার্শাল ও তদন্ত করা হয়। এদিকে আমার পেছনে সর্বক্ষণ গোয়েন্দা। আমার টেলিফোনে আড়িপাতা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা বাসাতে আমার চালচলন পর্যবেক্ষণের জন্য সামরিক গোয়েন্দারা গাড়িতে ওয়ারলেস লাগিয়ে পাহারা দিচ্ছে। এক পর্যায়ে একদিন আমি গোয়েন্দাদের সার্বক্ষণিক পাহারায় অতিষ্ঠ হয়ে টেলিফোনে খুব রূঢ় ভাষায় সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী (পরে। এরশাদের মন্ত্রী) ও সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদকে বিষয়টি অবহিত করি। তারা দুজন এমন ভান করলেন যেন তাদের অজান্তেই আমার ওপর নজরদারি হচ্ছে। বস্তুত তাঁদের অজান্তে এমনটি হবে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
১৫ নভেম্বর দেশে রাষ্ট্রপতি-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি সাত্তার যাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, সেজন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়। বিএনপি প্রার্থী হিসেবে তিনি পান এক কোটি ৪২ লাখের ওপর ভোট। আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং অন্যদের দ্বারা সমর্থিত ড. কামাল হোসেন পান প্রায় ৫৭ লাখ ভোট। হাফেজজী হুজুর পান চার লাখের কাছাকাছি। জেনারেল ওসমানী পান তিন লাখের কিছু বেশি। মেজর জলিল পান প্রায় আড়াই লাখ। ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ পান প্রায় সোয়া দুই লাখ।
নাগরিকদের পক্ষ থেকে অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আমরা কয়েকজন একটি বিবৃতি দিয়ে কামাল হোসেনকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম।
জেনারেল এরশাদ প্রায় প্রকাশ্যেই বিএনপি প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। নির্বাচনে বড়রকম কারচুপি হয়। চট্টগ্রামের একটি ভোটকেন্দ্রে যখন ভোটগণনা চলছিল, তখন বেতার-টেলিভিশনে সেই কেন্দ্রের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষিত হয়।
কাছে-দূরে
১.
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলকাতা থেকে মুক্তধারা আমার মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য পুনর্মুদ্রণ করেছিল। সেটাই ছিল দেশের বাইরে আমার বইয়ের প্রথম। প্রকাশনা। ১৯৭৮ সালে কিয়োটোতে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিম্পোজিয়মে পঠিত প্রত্যেকটি প্রবন্ধই বোধহয় মনোগ্রাফ-আকারে ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করেছিল টোকিও থেকে। তার মধ্যে আমারটাও ছিল একটি। সেটি আবার সংকলিত হয়েছিল আনোয়ার আবদেল মালেক ও এ এন পাণ্ডেয়া-সম্পাদিত সিম্পোজিয়মের বিবরণ-সংবলিত Intellectual Creativity in Endogenous Culture গ্রন্থে, তাও টোকিও থেকেই, ১৯৮১ সালে। এই ১৯৮১ সালেই লন্ডন থেকে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি প্রকাশ করলো আমার Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Office Library and Records, গ্রন্থস্বত্ব রানির। আমি পরিহাস করে বলেছিলাম, রানি আমার প্রকাশকদের একজন।
লাইব্রেরি-কর্তৃপক্ষ আমার জন্যে বই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকায় ব্রিটিশ কাউনসিলের কাছে–কূটনৈতিক ব্যাগের সুবিধে নিয়ে। ব্রিটিশ কাউনসিলের আঞ্চলিক প্রতিনিধি আমাকে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে বইটি গ্রহণ করার সুবিধে আমার হবে। বলেছিলাম, আমি ঢাকায় আসছি–তখন সংগ্রহ। করবো। সে-ভদ্রলোকের সঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ভালো আলাপ ছিল। সারূকেও তিনি বইটির প্রাপ্তিসংবাদ জানিয়েছিলেন। সার মহাখুশি। চট্টগ্রামে আমাকে ফোন করে নানা কথা বললেন। আমি ঢাকায় এসে সারূকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশ কাউনসিলে গেলাম। বইগুলো নিয়ে সার ও আমি স্বামীবাগে এলাম–সেখানে বেবী এবং ছেলেমেয়েরাও ছিল। সার বেবীকে বললেন, আমার ষাট বছর বয়সে বইটি বের হলে তিনি এত উত্তেজিত হতেন না, মধ্য-চল্লিশে ব্লুমহার্টের ক্যাটালগের সাপ্লিমেন্টারি ভলিউম প্রকাশ করতে পারা একেবারে সামান্য অর্জন নয়। আমার মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য এবং মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (ঢাকা, ১৯৬৯) তাঁর অনুমোদন লাভ করেছিল। তবে স্বরূপের সন্ধানে (ঢাকা, ১৯৭৬) তাঁর কৌতূহল জাগায়নি, এবং মুনীর চৌধুরী (ঢাকা, ১৯৭৫) পড়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘কী সব। লিখছেন! এখন তিনি প্রসন্ন হলেন, যদিও এ-প্রসন্নতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমি যে দেশ-বিদেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়মে প্রবন্ধ পড়তে যাই, এ ছিল তাঁর খুবই অপছন্দ। তিনি বলতেন, ‘ওদের দরকার সেমিনার করা, কিন্তু হেইখানে প্রবন্ধ পড়ার কী দরকার আপনার! অন্যের কাজে সময় নষ্ট না কইরা নিজের কাজ করেন না কেন?’ পরে তিনি আশাহত হয়ে বলেছিলেন, আপনি তো আর ল্যাখ্যাপড়া করলেন না! তিনি নিজেই মুসলিম-মানস ইংরেজিতে অনুবাদ করতে শুরু করেছিলেন, শেষ করতে পারেননি; আমার কাছে তার অনেক প্রত্যাশা ছিল, আমি পূরণ করতে পারিনি। তাঁর নির্লিপ্ততা আমি আয়ত্ত করারও চেষ্টা করিনি।
Factory Correspondence-এর প্রকাশ আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা, একথা আমি সব সময়ে স্বীকার করবো। ওটি আমার অশেষ পরিশ্রমের ফসল। Bulletin of the School of Oriental and African Studiesu 478 কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Modern Asian Studiesএ তার অনুকূল সমালোচনা বের হয়েছিল। তা না হলেও, আমি জানতাম, আমি ফাঁকি দিইনি। কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলো হিসেবে আমি নামমাত্র যুক্ত ছিলাম সোয়াসের ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ অ্যান্ড সিলোন ডিপার্টমেন্টের প্রধান। প্রফেসর রাইটের সঙ্গে। সংস্কৃতের পরে বিকশিত হয়েছে, এমন কোনো ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী হওয়ার কোনো কারণ তাঁর ছিল না। তিনি যখন প্রথম। শোনেন যে, আমি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোন ঢাকা কুঠির ‘লেটার-বুকস নিয়ে মেতে উঠেছি (লেটার-বুকস’ কথাটাতেই তার আপত্তি ছিল), তখন সাহিত্যের অধ্যাপকের এহেন দুর্মতিতে তিনি বেশ উদৃবিগ্ন হয়েছিলেন, যদিও তা যথাসাধ্য চেপে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি ওঁকে এক কপি বই পাঠিয়েছিল সৌজন্যস্বরূপ, তিনি পত্রপাঠ–সম্ভবত বইটির একটি পাতা না খুলেই–সেটা চালান করে। দিয়েছিলেন সোয়াস লাইব্রেরিতে। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আশা করি, আমি কাজটা ঠিকই করেছি।’
