১ জুন রাঙ্গুনিয়ায় জিয়ার কবর খুঁজে পাওয়া যায়। সেখান থেকে তাঁর দেহাবশেষ তুলে ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ওই হেলিকপ্টারেই ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. আমিনা রহমান। ঢাকায় ফেরেন। শেরে বাংলা নগরে বিশাল জানাজার পরে জিয়ার দেহাবশেষ সমাধিস্থ হয়।
এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য/স্বাধীনতার প্রথম দশক (ঢাকা, ২০০০) বইতে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন যে, জিয়া-হত্যার সংবাদ পেয়েই সেনাবাহিনী-প্রধান জেনারেল এরশাদ ‘পরোক্ষ ইঙ্গিতে সামরিক আইন জারির কথা বললেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তা করতে তাঁকে। আরো প্রায় দশ মাস অপেক্ষা করতে হয়। আপাতত তাঁর নির্দেশে মেজর জেনারেল মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে এক তদন্ত কমিটি গঠিত হয় চট্টগ্রামে সেনাবিদ্রোহ সম্পর্কে অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে। এই কমিটি ৩৫ জন সেনা-কর্মকর্তাকে কোর্ট মার্শাল করার সুপারিশ করেন। মেজর জেনারেল আবদুর রহমানের সভাপতিত্বে গঠিত একটি ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালে ২৯ জন অভিযুক্ত হন। কোর্ট মার্শালে বাদীপক্ষের কৌঁসুলি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার নাজিরুল আজিজ চিশতী ও কর্নেল এ এম এস এ আমিন। আসামিপক্ষকে। সমর্থন করার জন্যে সেনা-কর্তৃপক্ষ যে-তিনজনকে মনোনীত করেন, তাঁরা হলেন ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার হোসেন, কর্নেল মুহম্মদ আইনুদ্দীন ও লেফটেনান্ট কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আটাশ বছর (ঢাকা, ১৯৯৯) বইতে মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম লিখেছেন যে, ‘বিচার প্রক্রিয়াটি অতি সংক্ষিপ্ত ছিল এবং হঠাৎ করে শেষ হয়েছিল। বিচারে ১৩ জন কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড এবং আরো ১৪ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তেরা সবাই এবং কারাদণ্ডপ্রাপ্তেরা প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সর্বকনিষ্ঠ ছিল ক্যাপ্টেন জামিল হক–আমার বন্ধু এ জেড এম আবদুল আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কারাদণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন মেজর লতিফ–আমার ছাত্রী শিরিণ আখতারের স্বামী।
কোর্ট মার্শালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা রুজু করা হয়। আবেদনকারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এম এইচ খোন্দকার, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, খন্দকার মাহবুবউদ্দীন আহমেদ, ড. এম জহির, গাজীউল হক ও জাকের আহমদ। সরকারপক্ষে দাঁড়ান অ্যাটর্নি জেনারেল কে। এ বাকের, তাঁর সঙ্গে আবদুল ওদুদ ভূঁইয়া, সোহরাব আলী, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এম এম হক ও বি হোসেন। তিনদিন শুনানির পরে বিচারপতি ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি লতিফুর রহমানকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ মামলা খারিজ করে দেন। তাঁরা বলেন, কোর্ট মার্শালের বিরুদ্ধে রিট আবেদন গ্রহণের এখতিয়ার হাইকোর্টের নেই। আবেদনকারীরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। সেখানে আবেদনকারীদের পক্ষে যোগ দেন ড. কামাল হোসেন ও সিরাজুল হক। পাঁচদিন শুনানির পরে প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, বিচারপতি রুহুল ইসলাম, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ আপিল প্রত্যাখ্যান করেন মূলত এখতিয়ারের প্রশ্নেই।
মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের প্রাণরক্ষার দাবিতে তাঁদের স্বজনরা অনশন করেন। ২২ সেপ্টেম্বর আপিল আদালতের রায় ঘোষিত হলে ঢাকায় প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়, ঢাকার বাইরেও প্রতিবাদ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগসহ বহু রাজনৈতিক দল
মৃত্যুদণ্ডদানের নিন্দা করে। অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার প্রার্থনা অস্থায়ী। রাষ্ট্রপতি না-মনজুর করেন। দেশের বিভিন্ন কারাগারে ২২ সেপ্টেম্বর রাতেই ১২ জন সামরিক কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আরেকজনের ফাঁসি বিলম্বিত হয় তিনি তখন চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে। ক্যাপ্টেন জামিলের পিতা ছিলেন তখন ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ প্রিজনস। শোনা যায়, পুত্রসহ ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার নির্দেশ তাঁকেই স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। কারাদণ্ডে দণ্ডিত কর্মকর্তাদের শাস্তি পরবর্তীকালে লাঘব করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তারা মুক্তিলাভ করেছিলেন।
জিয়া-হত্যার তদন্ত হয়নি, সুতরাং সে-রহস্য উদঘাটিত হয়নি। তদন্ত, বিচার ও শাস্তি যা হয়েছিল, তা সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের কারণে। বহু বৎসর পরে মনজুর-হত্যার জন্যে তাঁর ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর জেনারেল এরশাদকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করেন। নানা কারণেই বাদীপক্ষ সে-মামলা ঠিকমতো চালাতে পারে নি। তবে মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
যশোরের জিওসি মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীকে জিয়া-হত্যার পরপর সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই অবসর দিয়ে মিশরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেনারেল মইন লিখেছেন, মেজর জেনারেল আবদুস সামাদের নেতৃত্বে গঠিত একটি বোর্ডের মাধ্যমে ‘আরো প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে বিভিন্ন অজুহাতে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা নন, এমন কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ অবসরপ্রাপ্ত হন। নিজের অবস্থা সম্পর্কে জেনারেল মইন লিখেছেন :
