অপর ভাষ্য-অনুযায়ী, জেনারেল মনজুর উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষিত ও মার্জিত। তার কিছু ঘনিষ্ঠ অনুসারী আছে। তাদের দিয়ে জিয়া-হত্যা ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতা অধিকার করতে চেয়েছিলেন। ঢাকার বাইরের অন্তত দুটি সেনানিবাসের প্রধানেরাও এই ষড়যন্ত্রের অংশীদার। এখন অবস্থা বেগতিক দেখে তারা চুপ করে গেছেন।
তৃতীয় একটি ভাষ্য-অনুযায়ী, এই খেলায় তৃতীয় একজন আছেন। তিনি কৌশলে জিয়াকে সরিয়েছেন, এখন মনজুরকে সরাবেন। তারপর দু-একজন উচ্চপদস্থ মুক্তিযোদ্ধা সেনা-কর্মকর্তাকে অবসর দিয়ে, দেশের বাইরে পাঠিয়ে, সেনাবাহিনীতে প্রথমে, তারপর দেশে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করবেন।
প্রশ্ন রয়ে যায়, মনজুর কি এতই অর্বাচীন যে, চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করলেই দেশের শাসনভার তার করায়ত্ত হবে বলে ভাবতে পেরেছিলেন? আবার এ-প্রশ্নও রয়ে যায় যে, তিনি কি এতই অপেশাদার যে, তাঁর অধীন কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতি-হত্যার পরিকল্পনা করছেন আর তিনি কিছুই জানতে পারছেন না? তিনি হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব নিলেন, অথচ দোষীদের নিরস্ত করার কোনো প্রয়াস নিলেন না কেন? অথবা চট্টগ্রাম বেতার থেকে একবারও তিনি জাতির উদ্দেশে কিছু বললেন না কেন?
পরে ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহর কাছ থেকে যে-ঘটনাটি জেনেছিলাম, সেটা এখানে বিবৃত করা যায়।
ব্রিগেডিয়ার হান্নান ৩০ মে সকালে মনজুরের প্রতি বিশ্বস্ত সৈন্যদের দ্বারা আটক অবস্থায় ছিলেন। ৩১ তারিখে তাকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেনারেল মনজুরের অভিপ্রায়-অনুযায়ী তিনি ঢাকায় টেলিফোনে চিফ অফ জেনারেল স্টাফ জেনারেল নূরউদ্দীন খানের সঙ্গে কথা বলেন। মনজুর তাঁর পাশে বসে ছিলেন; ঢাকায় নূরউদ্দীনের পাশেও আরো কেউ বসে ছিলেন। ঢাকার আত্মসমর্পণ-দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মনজুর আলোচনার প্রস্তাব দেন। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে জেনারেল ওয়াহিদসহ উচ্চপদস্থ দুজন সামরিক-কর্মকর্তা চট্টগ্রামে আসবেন বলেও কথা হয়। (তারা কি সমকক্ষ হিসেবে কথা বলতে আসছিলেন, না মনজুরকে বন্দি করে নিয়ে যেতে আসছিলেন, তা পরিষ্কার ছিল না।) টেলিফোনে কথা শেষ করার সময়ে হান্নান শাহ শুনতে পান, পাশের জন বলছেন, এখন পাখি ফাঁদে পড়েছে। এই কণ্ঠস্বর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বলে হান্নান শাহর মনে হয়েছিল।
ততক্ষণে অবশ্য মনজুরের অবস্থা সত্যি খারাপ হয়ে এসেছে। ৩০ মে তাঁকে এবং আরো কয়েকজন সেনা-কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদচ্যুত করা হয়। সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে তার নাম করে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। মনজুরের ঘোষিত সান্ধ্য আইন সত্ত্বেও ৩১ তারিখে ঢাকা ও চট্টগ্রামে জিয়ার গায়েবি জানাজায় বিপুল জনসমাগম হয়। আওয়ামী লীগের সদ্যনির্বাচিত সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রধানেরাই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এতে মনজুরের না থাকে জনসমর্থন, না থাকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। চট্টগ্রামের বাইরে যেসব সামরিক ইউনিট তিনি পাঠিয়েছিলেন, তার কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ পালিয়ে যান। তিনি স্পষ্টই উপলব্ধি করেন, সেনানিবাসের অভ্যন্তরেও তাঁর প্রতি সমর্থন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ৩১ মে রাতেই তিনি সপরিবারে সেনানিবাস ত্যাগ করে উত্তরের দিকে চলে যান।
৩১ তারিখে দিনেই আমরা জানতে পারি যে, জিয়াউর রহমানের প্রাণরক্ষার চেষ্টায় নিহত হন তার প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল মইনুল আহসান এবং তাঁর এডিসি ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান। এঁরা উভয়েই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা-কর্নেল মইন ছিলেন বীরপ্রতীক আর ক্যাপ্টেন আশরাফ রক্ষী বাহিনীর সাবেক অফিসার। তাঁদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের কয়েকজন সদস্য এবং পুলিশের একজন সদস্যও নিহত হন।
জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে মন্ত্রী ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ৩০ তারিখ ভোরেই সার্কিট হাউজ থেকে বেরিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটতে থাকেন শহরে। আরেক মন্ত্রী ডা. আমিনা রহমানকে সার্কিট হাউজ থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান চট্টগ্রামের এনডিসি নাসিরুদ্দীন আল মাসুদ। নাসির ও তার স্ত্রী কণার (আমার বন্ধু গাজী শাহাবুদ্দীন আহমদের ছোটো বোন) মুখে পরে আমরা সে-বৃত্তান্ত জানতে পারি।
১ জুন মানিকছড়ির এক চা-বাগানে দুপুরের খাওয়ার খাওয়ার সময়ে জেনারেল মনজুর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার করে তাঁকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের কিছু সময়ের জন্যে হাটহাজারি থানায় এনে রাখা হয়। শোনা যায়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম কুদুসকে মনজুর বারবার অনুরোধ করেছিলেন তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার জন্য। কুদুস সেকথা শোনেননি, তিনি সেনা-কর্মকর্তাদের হাতেই মনজুরকে তুলে দেন। তাঁরা তাঁকে নিয়ে আসেন সেনানিবাসে এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সামনেই তাঁকে হত্যা করা হয়। বলা হয়, জিয়া-হত্যায় বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ সেনারা মনজুরকে হত্যা করেছে। কুদুস পরে ঢাকায় মতিঝিল থানায় বদলি হন। সরকারি কর্ম ত্যাগ করে আরো পরে তিনি দেখা দেন বিশিষ্ট শিল্পপতিরূপে।
মনজুরের সঙ্গে আরো দু-একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। এঁদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও কর্নেল মাহবুব দুজনেই মানিকছড়ির কাছেই নিহত হন। জীবদ্দশায় ধরার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এঁদেরকে হত্যা করা হলো কেন এবং মনজুরকে বাঁচিয়ে রেখে জিয়া-হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা হলো না কেন, এ-প্রশ্ন বহুজনকে আলোড়িত করেছে। আমার মামাতো ভাই সৈয়দ কামরুজ্জামান একবার এক সামরিক কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, দেশের প্রেসিডেন্টকে মারা আপনাদের প্রেরোগেটিভ, কিন্তু প্রেসিডেন্ট-হত্যার দায়ে অভিযুক্ত লোককে বেসামরিক বাহিনী ধরে দিলোতাকে আপনারা কোন অধিকারে মারলেন?’ ওই কর্মকর্তা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ওই স্থান ত্যাগ করেছিলেন।
