ভারত-ভ্রমণশেষে সানন্দিতচিত্তে আমরা দেশে ফিরে এলাম।
তারপর একদিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে সারের বাড়িতে গিয়ে দেখি, কলকাতা থেকে আমাদের বইপত্র এসে গেছে এবং যেসব বইয়ের দুটি করে কপি আছে, আমাদের এক তরুণ সহকর্মী তার থেকে একটি বেছে আলাদা করে রাখছে। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ডুপ্লিকেটগুলো আমার।’ তখন বোধহয় সারেরও খেয়াল হলো। অদম্য গবেষক বললো, ‘ঠিক আছে, আমি এগুলো দেখে নিয়ে আপনাকে ফেরত দেবো। তারপর যা হওয়ার তা হলো।
তারও বেশ কিছুদিন পরে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনের সেই কর্মকর্তা আমার কাছে জানতে চাইলেন আমাদের ভারতভ্রমণ কেমন হলো। বললাম, খুব ভালো। বন্দোবস্ত ছিল খুব ভালো, মানুষজন ছিলেন অতিথিপরায়ণ, দ্রষ্টব্য ছিল চিত্তচমঙ্কারী। তিনি একটু থেমে বললেন, ‘ফিরে এসে আপনারা কেউ আইসিসিআর-কে কিছু লিখে জানালেন না। তাই আমরা একটু চিন্তিত হয়েছিলাম।’
সারের তো চিঠি লেখার অভ্যাস নেই। কিন্তু আমিও ভারতীয় হাই কমিশন বা আইসিসিআরকে ধন্যবাদ জানিয়ে কিছু লিখিনি। ভদ্রলোকের কথায় লজ্জা পেলাম। মনে হলো, এখন লিখি। তারপর মনে হলো, এখন আর লিখে কী হবে, বড়ো দেরি হয়ে গেছে।
৫১.
১৯৮১ সালের ৩০ মে। আমার ভাগ্নি-জামাই কাজী আলী আফজাল চট্টগ্রাম শহর থেকে এসেছেন তার পরিচিত দুই ভদ্রলোককে নিয়ে। ক্যাম্পাসের বাসায় বসার ঘরে বসে কথা বলছি। ওঁরা চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো। এরই মধ্যে ফোন এলো বিভাগ থেকে : সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে মধ্যরাত্রির পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের কিছুসংখ্যক সামরিক কর্মকর্তার হাতে। ওইটুকু শুনেই শহরবাসীরা দ্রুত প্রস্থান করলেন। আমি চেষ্টা করলাম বেতারে খবর শুনতে।
ঢাকা আর চট্টগ্রাম বেতারের ঘোষণা একরকম নয়। ঢাকা বেতার বলছে, কিছু দুষ্কৃতকারী সামরিক ব্যক্তি জিয়াকে হত্যা করেছে, এসব বিদ্রোহী সৈনিক ও সেনা-কর্মকর্তাদের অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে (সেইসঙ্গে মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়)। চল্লিশ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বেতার বলছে, রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হয়েছেন, এক বিপ্লবী পরিষদ দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বেতারের কথায় কান না দিতে দেশবাসীকে অনুরোধ করছে ঢাকা বেতার। চট্টগ্রাম বেতার থেকে এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম সফররত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এ খান বিপ্লবী পরিষদের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করলেন। পরে ঢাকা বেতার থেকে বলা হলো, তিনি একটি জাহাজযোগে ঢাকা রওনা হয়ে গেছেন। আরো পরে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে তিনিও সংবিধানমতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করলেন।
আমার মনে হলো, ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ও তাঁর পরিবারের খবর নেওয়া দরকার। বেতারের প্রথম ঘোষণা শুনেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ফোন করে কম্যান্ডেন্টের বাসায় সংযোগ দিতে অনুরোধ করলাম। টেলিফোন বেজে চলল, কেউ সাড়া দেয় না। বুঝলাম, বাড়িতে কেউ নেই। ভাবলাম, নিরাপদে থাকলেই হলো। পরে ভাবি ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, তারা নিজেদের বাসস্থানে নেই, তবে নিরাপদে আছেন।
ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে হাটহাজারিতে গেলাম। থানায় পাওয়া গেল ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম কুদুসকে। তাঁকে খবরাখবর জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, বিপদের মধ্যে আছেন। শুধু রাষ্ট্রপতিই নিহত হননি, সেনাবাহিনীর হাই কম্যান্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বিরোধ লেগে গেছে এবং তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। গুজব, ঢাকা বা কুমিল্লা থেকে সেনাবাহিনীর ইউনিট রওনা হয়েছে চট্টগ্রামের দিকে, চট্টগ্রাম থেকে সৈন্য পাঠানো হয়েছে শুভপুর ব্রিজে তাদেরকে প্রতিরোধ করতে।
ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি নিশ্চিত, ভারতের প্ররোচনায় এ-হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ভারতীয়রা সীমান্তের দিকে এগিয়ে এসেছে সংঘর্ষ বাধাবার জন্যে।
যে-সারিতে আমার বাসা, তার দক্ষিণের সারির প্রথম বাসাটি আমাদের উপ রেজিস্ট্রার (জনসংযোগ) আবু হেনা মোহাম্মদ মহসীনের। তার শ্যালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানকে জানতাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। এখন শোনা গেল, জিয়ার হত্যাকারীদের মধ্যে তিনি একজন। আরো শুনলাম, মিলিটারি জিপে করে আজই সকালে তিনি নাকি বোনের বাড়িতে এসেছিলেন কিছুক্ষণের জন্যে।
লোকমুখে ঘটনার দুটি প্রধান ভাষ্য দাঁড়িয়ে গেল। জেনারেল আবুল মনজুরের সঙ্গে কিছুকাল ধরে জিয়াউর রহমানের মনান্তর চলছিল। সামরিক গোয়েন্দারা রাষ্ট্রপতিকে চট্টগ্রামে রাত্রিযাপন করতে নিষেধ করেছিল, জিয়া তা শোনেননি। এ-দুটি বিষয় উভয় ভাষ্যেই ছিল। তারপর, এক ভাষ্য-অনুযায়ী, কিছুসংখ্যক বিক্ষুব্ধ সেনাকর্মকর্তা রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া তাদের এক দাবি; সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতার রদবদল ঘটানোও তাঁদের উদ্দেশ্য। তারা ভেবেছিলেন, অপহরণ করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে তারা এসব কাজ করিয়ে নেবেন। কিন্তু তাঁদেরই মধ্যে এক সামরিক কর্মকর্তা মদোন্মত্ত হয়ে নিজের অস্ত্র দিয়ে জিয়াকে হত্যা করেন। এরপর তারা সবাই সেনানিবাসে ফিরে এসে জিওসি-কে সবকিছু জানান। মনজুর তাঁর কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাজের দায়িত্ব নিজে নিয়ে সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে আলাপ করতে চান। সদর দপ্তর তাকে আত্মসমর্পণ করতে বললে তিনি অস্বীকার করেন এবং সেনাপ্রধানকে পদচ্যুত করার ঘোষণা দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব দাবি করে বসেন।
