খানিক পর অনিরুদ্ধ এলো। খবর পেয়ে অনিল সরকারও এলো। আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। বরুণ দে-কে ফোন করে স্কচ-বার্তা জানালাম। স্থির হলো, হোটেলে থাকার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেসের অতিথি-ভবনে আমরা কয়েকদিন থাকবো। আর সেন্টারে আমি একদিন বক্তৃতা দেববা ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে পাওয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠির বাংলা চিঠিপত্র সম্বন্ধে।
কলকাতায় সারের দুই বন্ধু আছেন। অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ মাহমুদ ওরফে বাচ্চু মিয়া এবং তাঁর অনুজ, ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের কর্মকর্তা, আবদুল হাই মাসুদ ওরফে গেঁদু মিয়া। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র, তবে এ ডব্লিউ মাহমুদ বিশিষ্ট–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে তার খ্যাতি আকাশচুম্বী। সামাজিক ক্ষেত্রেও তার বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে থাকেন তিনি সঙ্গিনীকে নিয়ে। তাঁর বাড়িতে একাধিকবার যাওয়া হলো এবং যথারীতি খাওয়া-দাওয়া হলো। একরাতে এ এইচ মাসুদের কিমবার স্ট্রিটের বাসায় খেলাম এবং তার বিদুষী কন্যার সঙ্গে পরিচিত হলাম।
দিল্লিতে সার যেসব বইয়ের দোকানে গিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত ইংরেজি বইয়ের দোকান এবং নতুন বইয়ের দোকান। পুরোনো দিল্লির বনেদি দোকান থেকে বেশ দাম দিয়ে পুরোনো ইতিহাস বইয়ের হাল পুনর্মুদ্রণ কিনেছিলেন। মনোহারলালের পুস্তক-তালিকায় নাম ছিল, কিন্তু দোকানে মজুদ ছিল না, এমন একটি বইয়ের দাম দিয়ে এসেছিলেন সকালে, ওরা বিকেলে সেটা পাঠিয়ে দিয়েছিল। পরদিন সকালেই আমাদের দিল্লি ছাড়ার কথা ছিল। কলকাতায় এসে সার কিছু নতুন বা অনেকদিনের আগে প্রকাশিত বই কিনলেন এশিয়াটিক সোসাইটি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে। আমিও অল্পস্বল্প কিনলাম। তখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি দিলীপকুমার বিশ্বাস এবং সম্পাদক সরোজমোহন মিত্র। সৌভাগ্যক্রমে এক সন্ধ্যায় তাঁদেরকে পরিষদে পেয়ে গেলাম। উভয়েই আমাদের খুব সমাদর করলেন। সার অবশ্য ধারণা করলেন যে, সমাদরের লক্ষ্য আমি, তিনি উপলক্ষ মাত্র, তবে তা ঠিক নয়।
সার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন মফিদুল হকের সঙ্গে–ওদের যারা বই পাঠায় কলকাতা থেকে, তারা সেই চালানের সঙ্গে সারের পছন্দ-করা বই পাঠিয়ে দেবে। বইয়ের দামও ঢাকায় দেওয়া যাবে। তবে তাঁর সত্যিকারের অভিযান শুরু হলো পুরোনো বইয়ের সন্ধানে। এসব বইয়ের দোকানদারেরা সহজে তাদের সেরা সংগ্রহ দেখাতে চায় না। যখন বুঝতে পারে, খরিদদার সত্যি সমঝদার, তখনই কেবল সেসব বের করে। সারের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাঙাল ভাষায় কথাবার্তা শুনে তারা প্রথমে গা করেনি, তারপর বইপত্র সম্পর্কে তার আগ্রহ এবং মূল্য সম্পর্কে তার ধারণার পরিচয় পেয়ে তারা ক্রমশ উৎসাহী হয়ে উঠলো। সবচেয়ে আনন্দের কথা, একাধিক খণ্ডের একটি বইয়ের যে-খণ্ডটি ১৯৭১ সালে সারের বাড়ি থেকে খোয়া গিয়েছিল, সেটি তিনি কলকাতায় পেয়ে গেলেন।
হোটেল ছেড়ে আমরা যখন সেন্টার ফর দি স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেসের অতিথি-ভবনে থাকছি, তখনই একদিন শান্তিনিকেতনে যাওয়া হলো। সুরঞ্জন দাশ-তখন শান্তিনিকেতনে থেকে গবেষণা করছে, এখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-অনিল সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ। তার অভিভাবকত্ব মেনে আমরা শান্তিনিকেতনে গেলাম। কলকাতা থেকে এক গাড়িতে সার, আমি আর অনিল। সুরঞ্জন আগেই পৌঁছে গেছে সেখানে। অম্লান দত্ত তখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। তিনি অত্যন্ত সহৃদয় ব্যক্তি, আমাকেও প্রীতির চোখে দেখেন। তিনি যথারীতি অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করলেন। সুরঞ্জন আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখালো। পরদিন বিকেলের দিকে রওনা হয়ে রাতে কলকাতায় ফিরে এলাম।
এবার সেন্টারে আমার বক্তৃতার পালা। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিতব্য আমার Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Office Library and Records বইটির ভূমিকার খানিকটা অংশ সামনে খোলা রেখে বাংলায় বলে গেলাম। বক্তৃতা যেমনই হোক, শ্রোতার সংখ্যা ছিল আশাতীত। আমার বন্ধুদের অনেকেই এসেছিলেন। প্রবীণদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত। সকলেই আমার প্রতি দাক্ষিণ্য প্রকাশ করেছিলেন। তাই প্রশ্ন যা হয়েছিল, তার উত্তর দিতে পেরেছিলাম। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে ভবতোষ দত্তের দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয়েছিল। তাছাড়া, তাঁর সম্পর্কে কৌতূহলী আরো অনেকে ছিলেন। সভার শেষে তাঁকে ঘিরে আড্ডা জমেছিল।
আমার ঘনিষ্ঠজন বরুণ দে, অনিল সকার ও অনিরুদ্ধ রায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সার খুব প্রীত হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, তাঁদের কালে বাঙালি হিন্দু সমাজে এমন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটেনি–অন্তত তিনি লক্ষ করেননি। তিনি নিশ্চয় সে-সময়ে অনেক উদার ছাত্র-শিক্ষকের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তবে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স্ক যাদের সঙ্গে তাঁর এবার পরিচয় হলো, তাদের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল। তার মনে হয়তো এই কথাটি দেখা দিয়েছিল যে, তাদের কালে এমন উদারতা সর্বব্যাপী হলে দেশের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।
