আমরা গেলাম দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে–কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য-সাক্ষাৎকার করতে। জওহরলালে তখনো বোধহয় পার্থসারথী ছিলেন উপাচার্য–তিনি খুবই সহৃদয় মানুষ। আমাদের দেখা হলো শিক্ষামন্ত্রী নূরুল হাসানের সঙ্গে। তার সঙ্গে আমার সামান্য পরিচয় হয়েছিল ১৯৭১ সালে। সারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল–তা কি ১৯৭৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় যখন সারুকে সাম্মানিক ডি. লিট উপাধি দেয়, তখনকার, নাকি আরো আগে যখন তারা উভয়েই বিদেশে ছিলেন, তখনকার, ঠিক বলতে পারবো না। কথাপ্রসঙ্গে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়। থেকে প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস-সম্পর্কিত মানচিত্রমালার প্রশংসা করেছিলেন সার। নূরুল হাসান বললেন, ওটা আপনার ভালো লেগেছে? তাহলে আমাদের অ্যাটলাসটা আপনি দেখেন নি। সেটা শিকাগোরটার চেয়ে বহুগুণে ভালো। সার, মনে হয়, কথাটা স্বীকার করলেন না, তবে হয়তো। সৌজন্যবশতই এ-নিয়ে উচ্চবাচ্য করলেন না।
ডি এস কোঠারি তখন উচ্চশিক্ষাবিষয়ক কোনো উচ্চপদে আসীন। তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমরা রজনী কোঠারির সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভেও গেলাম। রজনী জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা-পর্ষদের সদস্য। আমি যে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তা তিনি জানতেন। তবে আমাদের প্রকল্প-পরিচালক আনোয়ার আবদেল মালেক ও তার মধ্যে বোধহয় যথেষ্ট প্রীতি ছিল না। সুতরাং একবারমাত্র ওই প্রসঙ্গের উল্লেখ করে আমরা থেমে গেলাম। রাজ্জাক সাহেব সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। থাকলে তিনি যেভাবে নিজের বিদ্যা জাহির করেছিলেন, তা করতেন না।
দিল্লি থেকে আমরা ট্যাকসি করে জয়পুর গেলাম, সেই রাতেই আবার ফিরে এলাম। পথের দু পাশে বিস্তীর্ণ ফসলক্ষেত্রে কর্মরত নরনারীর বর্ণবহুল পরিধেয় অতি দৃষ্টিনন্দন। জয়পুরের রাজকীয় প্রাসাদগুলিও মনোমুগ্ধকর।
বোম্বাইতে আই জি প্যাটেলের বাড়িতে নৈশভোজ খাওয়া হলো–ভোেজ কয় যাহারে। শহরের বাইরে বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস এবং শহরে নির্মীয়মাণ ক্যাম্পাস–দু জায়গায়ই গেলাম। মালাবার হিলসে জিন্নাহ্ যে বাড়িতে থাকতেন, সেটা দেখা হলো। হোটেলের ডাইনিং হলের হোস্টেস মেয়েটি দেখতে খানিকটা শাবানা আজমির মতো। বয়স্ক মানুষ বলে রাজ্জাক সাহেবের খুব যত্নআত্তি করতো, স্বাভাবিকভাবে আমিও তার ভাগ পেতাম। সার কিন্তু কোনো কথাই তার সঙ্গে বলতেন না, খাওয়ার অর্ডারটাও আমাকে দিতে বলতেন। হোটেলে আমাদের শেষরাতে খাওয়ার সময়ে সার আমাকে বললেন মেয়েটিকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানাতে। সে খুবই অভিভূত হলো। বললো, তার। অবস্থায় বাংলাদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত, কিন্তু যদি কখনো তেমন সুযোগ হয়, অবশ্যই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমাদের সহৃদয়তা তাকে খুব স্পর্শ করেছে।
ত্রিবান্দ্রমে কে এন রাজ খুব সমাদর করলেন। তার সেন্টারটা স্বয়ংসম্পূর্ণ–সেখানেই আমরা থাকলাম। অনেক গবেষক কাজ করছেন, গ্রন্থাগার খুব সমৃদ্ধ। রাজ্জাক সাহেব সেখানে বক্তৃতার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করায় প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সঙ্গে এক বৈঠকের আয়োজন করলেন কে এন রাজ। সেখানে রাজ্জাক সাহেবের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, ‘ঢাকায় নাম না করে শুধু সার বলতে আব্দুর রাজ্জাককেই বোঝায়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাকে বলেছেন যে, তাঁর শাশুড়ি–যিনি কোনোদিন স্কুলে যাননি, তিনিও-ওঁকে সার বলে সম্বোধন করেন। সভায় তুমুল হাস্যধ্বনি ও করতালি।
ত্রিবান্দ্রম থেকে মাদ্রাজ যেতে হবে। বিমানবন্দরে যখন উড়োজাহাজে ওঠার ডাক পড়ল, সার আমার ব্যাগটি হাতে করে অগ্রসর হলেন। আমি তাঁকে বারংবার বলতে থাকলাম সেটা আমার হাতে দিতে, তিনি কর্ণপাত করলেন না। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আমার ঠিক সামনে তিনি। একজন কর্মকর্তা তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে খুললো। ওপরেই স্কচ হুইস্কির বোতল দেখে সারের দিকে অর্থপূর্ণ হাসি ছুঁড়ে দিয়ে সে ব্যাগ বন্ধ করে দিলো। আমার খুবই রাগ হলো। ভর্ৎসনার সুরে সারুকে বললাম, আপনাকে বারবার বলছি আমার ব্যাগ আমার হাতে দিতে, আপনি কিছুতেই শুনলেন না। সার খুব নিস্পৃহভাবে জানতে চাইলেন, ক্যান, কী হইছে?’ বললাম, ‘দেখলেন না, লোকটা আপনার দিকে চেয়ে কীভাবে হাসলো? কী ভাবলো, বলেন তো!’ সার বললেন, ‘তায় কী হইলো? হার লগে আমার জীবনে দেখা হইবো নাকি?’ এরপরে আমি আর কী বলতে পারি!
মাদ্রাজে শুধু রাতটা হোটেলে কাটানো। পরদিন সকালে সমুদ্রোপকূলে কিছুটা গাড়িতে ঘোরা। খানিক পরই কলকাতা যাত্রা।
কলকাতায় হোটেলে পৌঁছে ফোন করলাম অনিরুদ্ধ রায়কে। ইংরেজিতে বললাম, আমি আলীগড় থেকে আসছি। পার্ক হোটেলে আছি। তারপর ওর সুপরিচিত এক মহিলার নাম করে বললাম, তিনি আমাকে আপনার ফোন নম্বর দিয়েছেন, আমার হাতে একটা চিঠিও দিয়েছেন। আপনি কি একবার আসতে পারবেন চিঠিটা নিতে? আমি তো কলকাতা ভালো চিনি না, নইলে নিজেই পৌঁছে দিতাম। অনিরুদ্ধ খুব ব্যগ্র হয়ে বললো, না না, আমিই আসবো। আপনার রুম নম্বরটা বলুন। আমি রুম নম্বর জানালাম। সে আবার বলতে বললো। বললাম। সে এবার বাংলায় বললো, ‘গলাটা চেনা মনে হচ্ছে।’
