আমি তখন চট্টগ্রামে। এসব কথোপকথনের খবর পাই অনেক দেরিতে। আমাকে নিমন্ত্রণ করার আদৌ কোনো পরিকল্পনা আইসিসিআরের ছিল কি না, আমার জানা নেই। সারের কথায়, মনে হয়, তারা নড়াচাড়া শুরু করলেন। তারা সারকে নিতে চান, তবে এটাও বুঝলেন, তাঁর যাওয়ার শর্ত, সঙ্গে আমাকে নিতে হবে। এই অবস্থায় কিছু না করেও বোধহয় তারা পারলেন না। সুতরাং চট্টগ্রামে আমার কাছে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনের একজন প্রতিনিধি এসে জানালেন, তাঁরা আমাকে ভারত-সফরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আমি কবে যেতে পারবো, জানতে পারলে তারা বাধিত হবেন। আর হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও এই সফরে আমন্ত্রিত। রাজ্জাক সাহেব বলেছেন, তিনি আমার সঙ্গেই যাবেন। সুতরাং আমি অধ্যাপক রাজ্জাকের সঙ্গে পরামর্শ করে যদি কর্মসূচি তৈরি করি, তাহলে আরো ভালো হয়। তারা কলকাতা, দিল্লি ও বোম্বাইতে আমাদের জন্যে ব্যবস্থা করেছেন। অধ্যাপক রাজ্জাক তার অতিরিক্ত যেতে চান ত্রিবান্দ্রমে। সেখানে আমাকেও যেতে হবে। তাছাড়া অন্যত্র কোথাও যদি আমি যেতে চাই, তা যেন জানাই। তারা সেখানেও আমাদের দুজনের যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
সারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি আমন্ত্রণ-রহস্যভেদ করতে পারলাম। যথোচিত লজ্জিত হলাম। সার লজ্জার কোনো কারণ দেখলেন না। বললেন, উনি তো ওদের আমাকে দাওয়াত করতে বলেননি, উনি শুধু বলেছেন, আমার সঙ্গে যাবেন। তাদের সামনে সব পথই খোলা ছিল। চাইলে আমাকে নেমন্তন্ন না করলেও পারতো। উনি না গেলে যে ওদের খুব ক্ষতি হতো, তা তো নয়। ওঁর আসল ইচ্ছে, দিল্লিতে তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক অমিয় দাশগুপ্তের দেখা পাওয়া। আর সুযোগ যদি হয়, তাহলে কেরালায় ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে তাঁর বন্ধুস্থানীয় ড. কে এন রাজের সঙ্গে দেখা করা। ভারতে তিনি তেমন কাউকে চেনেন না–আমার যেমন ভালো লাগে, তেমন প্রোগ্রাম করতে পারি। তিনি যে-কোনো জায়গায় যেতে প্রস্তুত, তবে কোথাও বক্তৃতা দিতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিক হোক, লেখাপড়াসংক্রান্ত হোক–যেখানে যা বলার দরকার, আমাকেই বলতে হবে।
দিন-তারিখ ঠিক করেই হাই কমিশনকে জানালাম। বললাম, কলকাতায় একটু বেশি সময় থাকতে চাই এবং তার মধ্যে এক ফাঁকে শান্তিনিকেতন ঘুরে আসতে চাই।
সপ্তাহতিনেকের সফর। ঢাকা থেকে দিল্লি। সার বাজার কুঁড়ে বড় মাপের দুটো ইলিশ মাছ নিয়েছেন তাঁর শিক্ষকের জন্যে। বিমানবন্দর থেকে আমি এক বোতল ব্ল্যাক লেবেল নিয়েছি কলকাতায় পৌঁছে বরুণ দে-কে দেবো বলে।
দিল্লিতে প্রথম সুযোগেই অমিয় দাশগুপ্তের বাড়িতে যাওয়া হলো। এইখানে তার একটু পরিচয় দেওয়া হয়তো প্রাসঙ্গিক হবে। অমিয়কুমার দাশগুপ্তের (১৯০৩-৯২) আদি বাড়ি বরিশাল জেলার গৈলায়। ১৯২২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণির বিএ অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করে এখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগ আলাদা হয়ে গেলে তিনি অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অল্পকাল কটকের র্যাভেন শ কলেজে এবং দীর্ঘকাল বেনারসে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। একসময়ে তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপকও ছিলেন। আমরা যখন দিল্লিতে যাই, তখন তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। শেষজীবনে তিনি বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনা করেন এবং শান্তিনিকেতনেই তার মৃত্যু হয়। অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর কিছু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ ব্যাপক সমাদর লাভ করে। রাজ্জাক সাহেব তার ছাত্র ছিলেন ১৯৩২ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত, পরে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে সহকর্মী হয়েছিলেন, বিভাগ ভাগ হয়ে গেলে তিনি অবশ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যোগ দেন।
দিল্লিতে গুরুশিষ্যের মিলনের দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। অমিয় দাশগুপ্ত সাগ্রহে আমাদের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। রাজ্জাক সাহেব তার পা ছুঁতেই তিনি যে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, সে-আলিঙ্গন সহজে শেষ হয় না। অমিয়বাবুর স্ত্রী কাছে দাঁড়িয়ে মুখে হাসি ছড়িয়ে স্নেহের দৃষ্টিতে রাজ্জাক সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সার তাঁকেও পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। কুশল-বিনিময়ের পরে অমিয়বাবু জানালেন, তাঁর পুত্র পার্থসারথী লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে অধ্যাপনা করছেন, কন্যা অলকানন্দা বোম্বাইতে, জামাতা আই জি প্যাটেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নরপদের মেয়াদশেষে বোম্বাইতেই কী এক গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। আমরা কি বোম্বাই যাবো? তাহলে যেন অবশ্যই তাদের ওখানে যাই–তিনি ওদের বলে রাখবেন।
অমিয়বাবুর বাড়িতে আমরা একাধিক বেলা খেলাম। গল্পগুজব যা হলো, তাতে ঘুরেফিরে আসতে থাকলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের কথা। একটু পরপরই অতীত পুনরায় নতুন হতে থাকলো। আমি তাঁর ছাত্রের স্নেহভাজন হওয়ায় ছাত্রের প্রতি তার ভালোবাসার একটু ভাগ আমিও পেলাম। তাঁর মৃত্যুর অল্পকাল আগে শান্তিনিকেতনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নুরুল মোমেনের। অমিয়বাবু তাঁর কাছে যেভাবে আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাতে নুরুল মোমেনের প্রত্যয় জন্মেছিল যে, আমি প্রফেসর এ কে দাশগুপ্তের একজন প্রিয়পাত্র।
