আবুধাবি বিমানবন্দরে হাসান এসেছিল আমার ভিসা এবং তার অফিসের এক আরব যুবককে নিয়ে। কোনো ঝামেলা হলো না। বিমানবন্দর থেকে। বেরিয়ে সবুজের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এরা কত কষ্ট করে সবুজ করছে, আর আমরা কত অবহেলায় সবুজ হারাচ্ছি!
তিনটে দিন খুব ভালো কাটলো আবুধাবিতে। বেড়ানো হলো, অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলো। আমার শ্যালক আজিজের বন্ধু হেলালের বাড়িতে এবং রাষ্ট্রদূত মুহম্মদ মহসিনের বাড়িতে খেলাম। দোকান-বাজারে গিয়ে দেখি, বাংলায় আমাদের ডাকাডাকি করছে। এক দোকানে মধ্যবয়সী এক সেলসম্যান নিম্নকণ্ঠে আমার নাম করে জিজ্ঞাসা করলেন, আমিই সেই ব্যক্তি কি না। খুব অবাক হয়ে বললাম, হ্যাঁ, আপনি কেমন করে চিনলেন? তিনি বললেন, দেশে থাকতে কাগজে আপনার ছবি দেখেছি। তারপর জানালেন, চট্টগ্রামেরই এক গ্রামাঞ্চলে তিনি শিক্ষকতা করতেন। তাতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল। তাই চাকরি নিয়ে চলে এসেছেন। পেশার পরিবর্তনে তিনি একটু গ্লানিবোধ করেন, তাঁর কথার ভঙ্গি থেকে তা বেশ বোঝা গেল।
আমি কুয়েতে যাওয়ার আগে উপাচার্য আবদুল করিম বলেছিলেন, তাঁর জন্যে যেন সেখান থেকে এক বোতল জয়তুনের তেল নিয়ে আসি। আমার দোভাষী সেই ছাত্রটিকে বলেছিলাম তা সংগ্রহ করে দিতে। সে প্রায় আধা গ্যালনের এক প্লাস্টিক-কন্টেনারে যা নিয়ে এলো, তা বিদেশি অলিভ অয়েল। সেটা সুটকেসে নেওয়া সম্ভবপর ছিল না বলে কুয়েত থেকে আবুধাবি, আবুধাবি থেকে ঢাকা, এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে হাতে করে নিয়ে আসতে হলো। প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রে কৌতূহলীদের প্রশ্নের জবাবে বলতেই হলো, ‘তেল–ভাইস চান্সেলরকে দিতে যাচ্ছি।’
৪৯.
মাসখানেক পরেই, কিছুটা আকস্মিকভাবে ও অপ্রত্যাশিতভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল আজিজ খান। তিনি মন্ত্রী ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছোটো ভায়রা। কেউ বললেন, তার নিয়োগ হয়েছে সেই সুবাদে; কেউ বললেন, তাঁর সঙ্গে আলাপে প্রীত হয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বয়ং এই দায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের একটা সুযোগ আমার ঘটেছিল এর অল্পকাল আগে। সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত কিছু লোককে তিনি বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মতবিনিময় ও নৈশভোজের জন্যে। রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণরক্ষা কর্তব্যের শামিল–সুতরাং যাতায়াত-খরচ দেবে বিশ্ববিদ্যালয়। আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলাম।
গিয়ে দেখি, এলাহি কাণ্ড। বহু লোকের সমাগম। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকী গেছেন একাডেমির কিছু প্রকাশনা সঙ্গে নিয়ে–গাড়ি থেকে সেসব নামাতেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যেরা হাঁ-হাঁ করে ছুটে এসেছেন। আগে থেকে অনুমতি না নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে এসব দেওয়া যাবে না। অনেক বয়স্ক মানুষ এসেছেন–চলাফেরা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হলেও।
রাষ্ট্রপতি বক্তৃতা দিলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকতে এবং দেশে-বিদেশে সেই স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরতে আহ্বান করলেন। তিনি আরো জানালেন, তিনিও একসময়ে সাহিত্যচর্চা করতেন এবং তারও একটি লেখার খাতা ছিল। এ-সময়ে মোহাম্মদ মোদাব্বের ব্যাকুলভাবে জানতে চাইলেন, খাতাটা এখনো তাঁর কাছে আছে কি না। তাঁকে হতাশ করে জিয়াউর রহমান বললেন, সেটা হারিয়ে গেছে। বক্তৃতার শেষে রাষ্ট্রপতি জিজ্ঞাসা করলেন, উপস্থিত ব্যক্তিদের কারো কোনো প্রশ্ন আছে কি না। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বললেন, ‘রামপ্রাণ গুপ্ত, কেশবচন্দ্র গুপ্তের মতো হিন্দু লেখকেরা হজরত মুহম্মদ, ইসলামের ইতিহাস এবং ভারতে মুসলিম শাসন সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো বই লিখেছেন–সেসব বই এখন দুষ্প্রাপ্য। সরকার যদি বাংলাদেশে এসব বই পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন, তবে সকলে উপকৃত হবে। তার কথাটা জিয়াউর রহমান বুঝতে পারেননি, সুতরাং বিরক্তির সুরে প্রশ্ন করলেন, আমরা সবাই বাংলাদেশি–আপনি হিন্দু-মুসলমানের প্রশ্ন তুলছেন কেন?’ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ নিজের কথাটা পরিষ্কার করতে উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু এরই মধ্যে আর কেউ প্রশ্ন করে ফেললেন এবং আজরফ সাহেবের নিকটতম উপবিষ্টেরা তাঁকে সযত্নে বসিয়ে দিলেন। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের সাহিত্য সম্পর্কে কিছু একটা বললেন। রাষ্ট্রপতি একটু কুপিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা-যুদ্ধ বলি–আপনি মুক্তিযুদ্ধ বলছেন কেন? আমার কিছুই বলার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু এই ক্ষণটিতে আমি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মাননীয় রাষ্ট্রপতি, খবরের কাগজে পড়লাম, সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করছেন। মুক্তিযুদ্ধ না হয়ে থাকলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি হচ্ছে কীভাবে? রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে বললেন, আমরা স্বাধীনতা-যুদ্ধ বলি। আর অল্পক্ষণ এরকম মতবিনিময়ের পরে নৈশভোজের ডাক পড়ল। শুরু হয়ে গেল রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছাবার প্রতিযোগিতা।
সে-বছরে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা-দিবস না বলে সরকারিভাবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল জাতীয় দিবস হিসেবে।
৫০.
১৯৮০ সালের কোনো এক সময়ে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের এক কর্মকর্তা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কাছে গিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের পক্ষ থেকে তাঁকে ভারত-ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানাতে। তিনি সেই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা ড. আনিসুজ্জামানকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন না? কর্মকর্তা নিশ্চয় অপ্রতিভ হয়েছিলেন, তবে শিষ্টাচার বজায় রাখতে বলেছিলেন, নিশ্চয় নিশ্চয়, ওঁকেও আমরা যথাসময়ে নিমন্ত্রণ করবো। রাজ্জাক সাহেব নিস্পৃহভাবে জানিয়েছিলেন, ওকে যখন নিমন্ত্রণ। করবেন, তখন আমাকে বলবেন; আমরা একসঙ্গে যাবো।
