রাতে খাওয়ার সময়ে লক্ষ করলাম, অদূরে এক টেবিলে অধ্যাপক আবুদস সালাম আসীন। তাঁর কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। চট্টগ্রামের স্মৃতি তার একেবারেই সাম্প্রতিক। সুতরাং খুশি হয়েই আমাকে গ্রহণ করলেন। তিনি কুয়েতে এসেছেন আরেকটি আলোচনা-সভায় যোগ দিতে। শেরাটনেই আছেন।
আনোয়ার আবদেল-মালেককে জানালাম, সালাম এই হোটেলেই আছেন। তিনি তাঁকে সম্মত করালেন আমাদের সমাপ্তি অধিবেশনে কিছু বলতে।
পরে, আমার সঙ্গে আলাপে, সালাম খুব হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর আশা ছিল, আরব দেশগুলোর কোনো একটিতে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণার জন্য ত্রিয়েস্তের মতো একটি কেন্দ্রস্থাপনে তেল-সম্পদের এই মালিকদের উৎসাহিত করতে পারবেন। তাহলে তরুণ মুসলমান গবেষকেরা সেখানে। জড়ো হয়ে গবেষণা করতে সমর্থ হবে। কিন্তু সে-বিষয়ে এঁরা কেউ সাড়া দিলেন না। তিনি আরো বললেন, দেখো, এরা কল-কারখানা বসাচ্ছে বটে, তার সবই টার্ন-কি ব্যবস্থায়। ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা জাপান ঠিকা নিয়ে কাজটা করে দিচ্ছে–এরা কেউ চোখে দেখে শিখতেও চাইছে না। তেলের টাকার গরমে এদের মাথা গরম–নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববারও সময় নেই। সালামের ইসলাম ও মুসলমানপ্রীতি সুবিদিত। আমি একসময়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি শেষ কবে গেছেন পাকিস্তানে। দুঃখের সঙ্গেই বললেন তিনি, পাকিস্তানে আহমদিয়াদের অমুসলমান ঘোষণা করার পরে স্বদেশে আর তিনি যাননি।
আয়োজকরা অনারব প্রতিনিধিদের সঙ্গে কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে দোভাষী যুক্ত করেছিলেন। যে-ছেলেটি আমার ভাগে পড়েছিল, বুঝলাম, সে সম্পন্ন ঘরের ছেলে। সে ইংরেজি ভাষার ছাত্র, তবে তার পোশাক ঐতিহ্যবাহী আরবদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেওয়াজ-অনুযায়ী আগের বছর গ্রীষ্মকালে সে ইংল্যান্ডে গিয়েছিল ভাষাটা রপ্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়েরই খরচে। দুটি মেয়ে-দোভাষীর সঙ্গে সে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো–তারা ফরাসি পড়ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে–তারাও সেবারে ঘুরে এসেছে প্যারিস। সম্মেলনের অবকাশে ওদের তিনজনকে নিয়ে কফি শপের এক টেবিলে বসে গল্প করলাম। তরুণটি বললো, লেখাপড়া শেষ করে সে ইংল্যান্ডে নাহয় আমেরিকায় চলে যাবে। কুয়েতে কোনো লাইফ নেই, আছে কেবল ভণ্ডামি। এই শেরাটনে পর্যটকেরাও হার্ড ড্রিংক খেতে পায় না, অথচ সম্পন্ন সব কুয়েতির বাড়িতে একটি করে সেলার আছে। সপ্তাহান্তে ট্রেলার নিয়ে তারা চলে যায় শহরের বাইরে–ফ্রিজে পানীয় ভর্তি করে নিয়ে যায়, খালি বোতল সেখানেই ফেলে আসে। মেয়েদুটির দ্বিতীয় ভাষা যদিও ফরাসি, তবু ইংরেজি খানিকটা বলতে পারে। তারা পরেছে একই রকম পাশ্চাত্য পোশাক। ওদের মধ্যে একজনকে খুবই কমবয়সী মনে হয়েছিল। শুনলাম, তার বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত হয়ে গেছে। সেও ভাবছে, পড়াশোনার শেষে ফ্রান্স বা সুইজারল্যান্ডে চলে যাবে। আমার দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা সবাই চলে গেলে দেশে থাকবে কে? আমদানি-করা এভিয়র বোতল থেকে পানি খেতে খেতে সে বললো, যারা নিরুপায়, তারা থাকবে। আর জনশক্তি আমদানি হবে এই এভিয়র বোতলের মতো। সবই তো আমরা আমদানি করি।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিভাগের সেক্রেটারি মেয়েটি মিশরীয়। সে বহু বছর এখানে কাজ করছে। সে কথায় কথায় বললো, কুয়েতিরা অ-স্থানীয়দের কখনো মর্যাদার চোখে দেখে না। আমি যে আরব, কিন্তু তাও কখনো এদের কাছে সমকক্ষ হতে পারব না।
এক ফিলিস্তিনি মহিলা–ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক-অনুযোগ করলেন স্বদেশীয়দের সম্পর্কে। বললেন, যারা ফিলিস্তিনে আছে, তারা সংগ্রাম করছে, কষ্টস্বীকার করছে। আমার মতো যেসব ফিলিস্তিনিকে তুমি বিদেশে দেখো, তারা প্রায় সকলেই বিলাসী জীবনযাপনে ব্যস্ত, নইলে কীভাবে তেমন জীবন যাপন করা যায়, তার সন্ধানে রত। আরব দেশগুলোতে আমরা আশ্রয় পাই, কাজ পাই, কিন্তু তারা আমাদের কখনো আপন করে নেয় না।
কুয়েতে সম্মেলনটা হয়েছিল পাঁচ দিন ধরে। সুতরাং সাধারণত সম্মেলনে যেমন চাপ থাকে, তার থেকে এটি ছিল মুক্ত। আমরা বেশ হেসে খেলে বেড়িয়ে গল্প করেও অধিবেশনে যোগ দিতে পেরেছি। খাওয়া-দাওয়াও ছিল অপর্যাপ্ত। বিদায়ী নৈশভোজটা হয়েছিল শেরাটনের ব্যাংকোয়েট হলে। স্থানীয় আমির-ওমরাহ গণ্য-মান্যেরা এসেছিলেন। হলে ঢুকতেই দরজার দু পাশে দুটি আস্ত রোস্ট ল্যাম–সঙ্গে কার্ভিংয়ের হরেকরকম ছুরি-কাঁটা-চামচ। তারপর অফুরান খাদ্যসামগ্রী টেবিল ভরে। সময় হলে প্রথমে অতিথিদের বলা হলো খাবার নিতে। আমরা সে দুম্বার খানিকটা সংগ্রহ করলাম ছুরি-কাঁটা দিয়ে কেটে। আমাদের নেওয়া হয়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় বন্ধুরা গেলেন খাবার নিতে। ছুরি-কাঁটা-চামচ ফেলে তাঁদের অনেকেই হাত ঢুকিয়ে দিলেন দুম্বার পেটে–কেউ কেউ প্রায় কনুই পর্যন্ত। ফলে, আমরা আর দ্বিতীয়বার দুম্বার কাছে ঘেঁষলাম না।
পরিকল্পনা করেছিলাম, কুয়েত থেকে আবুধাবি হয়ে ফিরব–সেখানে আমার শ্যালিকা নাসরীন, ভায়রা এফ আর এম হাসান এবং তাদের শিশুপুত্র আন্দালিব আছে। আমার যাতায়াতের টিকিট ছিল কুয়েত এয়ারওয়েজে, কিন্তু কেন যেন এই সেক্টরটার টিকিট ছিল মিল ইস্ট এয়ারলাইনসে (এমইএ)। কুয়েত সিটি বিমানবন্দরে তাদের হয়ে কাজ করে এয়ার ইন্ডিয়া। সেখানে রিপোর্ট করতেই ডেস্ক থেকে বলা হলো, আপনার ভিসা নেই, আপনাকে যেতে দেওয়া হবে না। বললাম, আমার জন্যে ভিসা নিয়ে লোক অপেক্ষা করবে আবুধাবি বিমানবন্দরে। তাতে কাজ হলো না। বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার ঊর্ধ্বতন এক ভারতীয় কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বললেন, দেখুন, ভিসা ছাড়া যাত্রী আমরা। নিই না, কেননা, ভিসা না পেলে সে-যাত্রীকে নিজেদের খরচে ফিরিয়ে আনতে হয়–সে-ঝুঁকি কোনো স্টাফ নিতে চায় না। আপনি কি নিশ্চিত যে, সেখানে পৌঁছে আপনি ভিসা পাবেন? বললাম, ঢাকা ছাড়ার আগে আমার আত্মীয়ের সঙ্গে সেরকম কথা হয়েছে। ভদ্রলোক বললেন, আপনার আত্মীয়কে ফোন করে জেনে নিন, তিনি আপনার জন্যে ভিসা সংগ্রহ করতে পেরেছেন কি না। কুয়েতি বন্ধু আমার টাকাটা ফেরত দেবে, এই বৃথা ভরসায় হাতের পয়সা সব খরচ করে ফেলেছি। সঙ্গে যা আছে, তাতে দূরপাল্লার ফোন করা যাবে কি না সন্দেহ। আমাকে ইতস্তত করতে দেখে ভদ্রলোক তার সামনের টেলিফোন দেখিয়ে বললেন, এখান থেকেই কথা বলুন। তাই করলাম। হাসান আমাকে আশ্বস্ত করলো, আমি ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করলাম। তিনি বললেন, চলুন, কাউন্টারের দিকে যাই। তারপর প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে উচ্চারণ করলেন, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আপনার যাতে অসুবিধে না হয়, তা দেখা আমার কর্তব্য। কাউন্টারে আমাকে নিয়ে গিয়ে, সেই আগের লোকটিকেই বোধহয়, বললেন আমাকে বোর্ডিং পাস দিয়ে দিতে। সে বললো, ওঁর ভিসা নেই, আমি ওঁকে বোর্ডিং পাস দিতে পারব না। ভদ্রলোক অনুচ্চ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, হি ইজ এ ইউনিভার্সিটি প্রফেসর। আই টেক রেসপনসিবিলিটি ফর হিম। ইউ ক্যান গেট ইট ইন রাইটিং ফ্রম মি লেটার, বাট ইস্যু দি বোর্ডিং পাস নাউ।’ বলেই ভদ্রলোক ফিরে গেলেন। আমি অভিভূত হয়ে প্রায় দৌড়ে গিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
