হান্নান শাহর আমন্ত্রণে ভ্রমণে গিয়ে মেজর জেনারেল আবদুর রহমানের সঙ্গে এবার পরিচয়টা প্রগাঢ় হলো। তিনিই বললেন, তাঁর ছেলের নাম রেখেছেন আমার শিক্ষক মুহম্মদ আবদুল হাই। হাই সাহেবের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তার তদানীন্তন শ্বশুর ড. আবদুল মতিন চৌধুরীর মাধ্যমে। এতক্ষণে তাঁর পরিচয় আমার কাছে স্পষ্ট হলো। আমিও এই সুযোগে বললাম যে, তাঁর প্রথম শাশুড়ি–তাছাড়াও আত্মীয়া–রাজিয়া মতিন চৌধুরী নিজের অদৃষ্টদোষে আমার ছাত্রী হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনে হলো, ব্যাপারটা তাঁর অজানা নয়।
তিন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে অনিবার্যভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ হলো। সেখানকার রাজনৈতিক সমস্যার যে-সামরিক সমাধান আমাদের সরকার খুঁজছেন, তা যে সফল হতে পারে না, সে সম্পর্কে আমার দৃঢ় বিশ্বাসের কথা আমি ব্যক্ত করলাম। ওঁরা বললেন, বিদ্বজ্জনেরা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে থাকেন এবং আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমি মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা বললাম, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপিনসের নজির দেখালাম। ওঁরা জানতে চাইলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের যেসব স্থাপনা আছে–যেমন, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা উপগ্রহ যোগাযোগ-কেন্দ্র–এসব কি আমি পাহাড়িদের কাছে সমর্পণ করতে বলি? আমি বললাম, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসকেরা তো এই ধরনের চিন্তা করেছিলেন। পাহাড়িরা পুরো দেশটাকে নিজের বলে ভাবতে না পারলে একদিন তারা বিচ্ছিন্নই হয়ে যাবে। পার্বত্য এলাকায় বাঙালিদের বসতিস্থাপন করে আমরা যে-পথে অগ্রসর হচ্ছি, তা বাংলাদেশকে আপন ভাবতে তাদের সাহায্য করবে না।
মতপার্থক্য হলেও আমরা কেউ উত্তেজিত হইনি, কেউ আমার দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করেননি।
লঞ্চে যেতে যেতে এক তীরে কিছু পাহাড়িকে চলাফেরা করতে দেখেছিলাম। আমাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিতে প্রবল ঘৃণা ছিল বলে মনে হয়েছিল। ক্যাম্পাসে ফিরে আসার পরে বেবীও আমাকে তার ঠিক একই অনুভূতির কথা বলেছিল।
৪৮.
সৃষ্টিশীলতা নিয়ে সিম্পোজিয়াম। এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার পর এবার আরব ভুবন। পর্যায়ক্রমে তৃতীয় সম্মেলন। এটি অনুষ্ঠিত হলো কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেক্সিকোতে যে-কুয়েতি অধ্যাপকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল, তিনিই এর আয়োজক।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা কুয়েত-শেরাটনে। ঘরের টেবিল-ল্যাম্পটা কাজ করছিল না। আমার নালিশের জবাবে যে-তরুণ সেটা সারাতে এলো, সে কাজ করতে করতে প্রশ্ন করলো, আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া?’ বললাম, না, আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। তখন সে হৃষ্টচিত্তে জানতে চাইলো, বাংলাদেশে কোথায় থাকেন আপনি?’ চট্টগ্রাম শুনে সে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করলো, চট্টগ্রামের কোথায়? বুঝিয়ে বললাম। সে নিজে চট্টগ্রামের সন্তান–চাকরি নিয়ে এখানে এসেছে বৎসরাধিককাল। তার সনির্বন্ধ অনুরোধ, যে-কোনো প্রয়োজন হলে তাকে যেন খবর দিই, সে যথাসাধ্য করবে।
কুয়েত শহরের রাস্তাঘাটে বেশি পুলিশ লক্ষ করলাম না, কিন্তু সকলেই দেখি, ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলছে। ঢাউস ঢাউস গাড়ির চালকেরা সকলেই পথচলার অগ্রাধিকার দিচ্ছে পথচারীকে। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, সুবিন্যস্ত রাস্তাঘাট।
সম্মেলনস্থানে এক কুয়েতি বললেন, আপনার নামটা বেশ অভিনব–আনিসুর রহমান, আনিসুল ইসলাম নয়, আনিসুজ্জামান। এমনটা আর শুনিনি। আমি কিছু বলার আগে পাশ থেকে আরেক আরব বলে উঠলেন, অবাক হওয়ার কী আছে? আনিস আল-জামান, যুগবন্ধু। খাঁটি আরবি নাম। প্রথম ব্যক্তি জানতে চাইলেন, তিনি কোন দেশ থেকে এসেছেন। দ্বিতীয়জন জানালেন, মিশর। প্রথমজন বললেন, মিশরে হয়তো আপনারা এ-ধরনের নামের সঙ্গে পরিচিত, আমরা, কুয়েতিরা, নই।
আয়োজক অধ্যাপক একটু পরে এলেন, আমাকে দেখে সহর্ষে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বললাম, তোমাকে যে আমি লন্ডন থেকে সুটকেস পাঠালাম, সেটা পেয়েছিলে? সে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, অবশ্যই অবশ্যই। তুমি আমার প্রিয় ভ্রাতা। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। বললাম, তুমি একবার প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করলে না! (আমার টাকা খরচের কথা মুখ ফুটে বললাম না, ভাবলাম, এই প্রসঙ্গে তার মনে পড়বে।) সে বললো, প্রাপ্তিস্বীকার করিনি? নিশ্চয় করেছি। তুমি আমার প্রিয় ভ্রাতা। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। তবে তার কথা শুনে স্পষ্টই বোঝা গেল, প্রাপ্তিস্বীকারের ইচ্ছে থাকলেও সেটা করা হয়ে ওঠেনি তার পক্ষে।
চিঠিতে আনোয়ার আবদেল-মালেক লিখেছিলেন, সম্মেলনে আমার কোনো প্রবন্ধ পড়বার দরকার নেই। পঠিত প্রবন্ধ এক-আধটা আলোচনা করলেই হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর তিনি বললেন, প্রিয় আনিস, তোমাকে বলেছিলাম, কিছু লিখতে হবে না। এখন দেখছি, লেখা দরকার। তুমি ভাই রাতের মধ্যে একটা লেখা তৈরি করে ফেলল।
সারারাত জেগে লিখলাম–অ্যান আউটসাইডার’স ভিউ অফ অ্যারাব এনডোজেনাস ইন্টেলেকচুয়াল ক্রিয়েটিভিটি। সারকথা : আরব সৃষ্টিশীলতায় আমি তিনটে বৃত্ত দেখতে পাই। প্রথমটি আঞ্চলিক, উপজাতীয়ও বলা যেতে পারে-আরবদের মধ্যেই অঞ্চলভেদে তার রকমফের আছে। দ্বিতীয়টি ইসলামি–এটা তারা ভাগ করে নেয় সংখ্যাগুরু অনারব মুসলমানের সঙ্গে। তৃতীয়টি অপেক্ষাকৃত আধুনিকতার যোগ সারা বিশ্বের সঙ্গে। প্রায় বছর দুই পরে মরক্কোর কিং হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের মিশরীয় অধ্যাপক হাসান হানাফি আমাকে বলেছিলেন, আরবরা যে মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যালঘু, এ কথাটা তুমিই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলে-সেকথা আমার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি।
