সেইবারই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার কৃতী ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে হিজবুল বহরজাহাজে আনন্দ-ভ্রমণে গিয়েছিলেন। রুচি যায়নি–সম্ভবত তার চেয়ে যারা পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল, তাদেরই নিমন্ত্রণ ছিল। তবে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া সংবর্ধনায় সে উপস্থিত ছিল। টেলিভিশনে হিজবুল বহর অধ্যায়ের যে-দৃশ্য দেখেছিলাম, তা আমার কাছে প্রীতিপ্রদ মনে হয়নি। দেখলাম, জিয়াউর রহমান বক্তৃতা দিচ্ছেন, আর তার পায়ের কাছে সুরের কুসুমগুলির মতো ছড়িয়ে আছে ছাত্রছাত্রীরা, সামনের দিকে শিক্ষকেরাও আছেন। সেখানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কে এম আমিনুল হকও ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন, তখন তাঁকে দেখেছি গোঁফ-দাড়ি কামানো এবং নিখুঁত পাশ্চাত্য পোশাকে সুসজ্জিত। পরবর্তীকালে ধর্মানুরাগবশত তিনি বেশ বড়ো দাড়ি রেখেছিলেন এবং আলখাল্লা গোছের পোশাক পরার অভ্যাস করেছিলেন। জিয়াউর রহমান বক্তৃতার মাঝখানে তাকে যেভাবে ‘এই যে মৌলভি সাহেব বলে সম্বোধন করছিলেন, তাতে তার প্রাপ্য সম্মান জানানো হয়নি বলে আমার মনে হয়েছিল।
এই হিজবুল বহর-ভ্রমণ থেকেই বাংলাদেশের ছাত্র-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কৃতী ছাত্রদের অনেককে রাষ্ট্রপতি কাছে টেনে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার মানে দাঁড়িয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া। ছাত্র-রাজনীতি করলে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু কৃতীদের কেউ কেউ যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের নেতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটাই ছিল সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-সংঘর্ষ তার আগেই শুরু হয়েছিল, এবারে সে-সংঘাত প্রবল হলো।
৪৭.
১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে নোবেল পুরস্কারবিজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালাম। এলেন বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এম হারুন অর রশীদ তাঁর এই সফরের আয়োজন করেন। সুতরাং তিনি এসেছিলেন মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই। এই সুযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিএসসি উপাধিতে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পেছনে বেশি সক্রিয় ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এখলাসউদ্দীন। আহমেদের উদযোগ, তবে উপাচার্য আবদুল করিমেরও যথেষ্ট আগ্রহ ছিল এ বিষয়ে। অধ্যাপক সালামের মতো গুণী মানুষকে আমাদের মধ্যে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম।
কাছাকাছি সময়ে আরেক গুণী মানুষকে আমাদের মধ্যে পেয়েছিলাম। তিনি সমাজবিজ্ঞানী রামকৃষ্ণ মুখার্জি। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আমন্ত্রণে–এ কে নাজমুল করিম স্মারক বক্তৃতা দিতে–ওই স্মারক বক্তৃতার শুরুই হয়েছিল তাঁকে দিয়ে। এই সুযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগ তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওই বিভাগে একটা বক্তৃতা দিতে। তিনি সম্মত হয়েছিলেন এই শর্তে যে, চট্টগ্রামে তিনি থাকবেন আমার বাড়িতে। আমি বাংলার ছাত্র হয়ে অত নামজাদা সমাজবিজ্ঞানীর প্রিয়পাত্র হলাম কী করে, এ-প্রশ্ন আমাদের অনেক সহকর্মীকে আলোড়িত করেছিল। অধ্যাপক মুখার্জি বক্তৃতা দিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আর সস্ত্রীক থাকলেন আমার ক্যাম্পাসের বাড়িতে। পূরবী মুখার্জির সঙ্গে আমার সেই প্রথম পরিচয় হলো–নিজের গুণে তিনি আমাদের সবাইকে অল্প সময়েই আপন করে নিয়েছিলেন। আনন্দ তখন বছর আটেকের ছেলে–সে রামকৃষ্ণ মুখার্জির খুব ভক্ত হয়ে গেল, তার আয়েশের দিকে খুব নজর রাখতে থাকলো। তার ক্ষিপ্রতা দেখে মুখার্জি তাকে ডাকতে শুরু করলেন ম্যানেজার বলে। কিছু দরকার হলে আমাকে না ডেকে আনন্দকে ডাকতেন। বলতেন, ওকে বললে সব ম্যানেজ করে দেবে। ওঁদের নিয়ে সপরিবারে রাঙামাটি গেলাম গাড়ি চালিয়ে গিয়ে অবশ্য বিজ্ঞপ্তি দেখলাম, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশিদের সেখানে প্রবেশ নিষেধ। একটু ভয় পেলাম। তবে সবটা নির্বিঘ্নে কাটলো। রামকৃষ্ণ মুখার্জি অনর্গল কথা বলে গেলেন–আমরা শুনতে থাকলাম।
এর আগেরবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম কুণ্ঠিত হয়ে। ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ আমার ছোটো ভায়রা মোবারক হোসেনের বড়ো ভাই। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে থাকতে আমাদের দুই পরিবারে বেশ যাতায়াত ছিল। তিনি সদ্য বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির কম্যান্ডান্ট নিযুক্ত হয়েছেন–তার আগে তার দায়িত্ব ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে। হান্নান শাহ চাইলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে আসার আগে আমাদের একবার সে-অঞ্চল ঘুরিয়ে আনবেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আছেন বিএমএ-র বিদায়ী কম্যান্ডান্ট মেজর জেনারেল আবদুর রহমান এবং পার্বত্য এলাকায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুস সালাম সপরিবারে। চতুর্থ পরিবার আমাদেরটা। সামরিক বাহিনীর গাড়িতেই ক্যাম্পাস থেকে রাঙামাটি গেলাম। সেখানে ওঠা হলো লঞ্চে–জলপথেই বেশির ভাগ সময় বেড়িয়ে ও খেয়ে রাঙামাটি ফেরা। আবার সড়কপথে চট্টগ্রাম-প্রত্যাবর্তন।
আবদুর রহমান যখন ব্রিগেডিয়ার হিসেবে বিএমএ-র কম্যান্ডান্ট ছিলেন, তখন কোনো একটা উপলক্ষে আমি তাঁদের অ্যাকাডেমিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। কথায় কথায় আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তরুণ সামরিক কর্মকর্তাদের দেখি অন্যের সঙ্গে খুব রূঢ় আচরণ করতে, এর কারণ কী?’ তিনি বলেছিলেন, আপনি যাদের কথা বলছেন, ওরা নিশ্চয় ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। অল্পবয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কঠোর শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। আদেশ দিতে ও মানতে শিখেছে, মায়া-মমতা পায়নি, করতেও শেখেনি। তারপর তাঁর বিএমএ-র এক ছাত্রের কথা বললেন। তার পিতৃবিয়োগের সংবাদ পেয়ে তিনি তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কারণ না জানিয়েই। সে ফিরে আসার পরে তাকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে যখন সমবেদনা জানিয়েছিলেন, তখন সে বেশ চটপটে ভাবেই বলেছিল, তার খুব অসুবিধে হবে না। জেনারেল রহমান বলেছিলেন আমাকে, নিজের পরিবারের জন্যেই যার টান নেই, দেশের প্রতি তার টান আসবে কোথা থেকে? তাঁর সেদিনের কথাবার্তায় আমার মনে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময় জেগেছিল।
