১৮ এপ্রিল সকালে ক্যাম্পাস থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে সেনানিবাসের একটি প্রবেশদ্বারে আমার আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে গন্তব্যে কীভাবে পৌঁছাবো জানতে চাওয়ায় কর্তব্যরত প্রহরী নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, ‘সামনে গিয়ে ডান দিকে যান–ধুতি, হারমোনিয়াম, সব ওদিকেই গেছে।’ তিক্ততা নিয়েই যথাস্থানে পৌঁছোলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে সবাই এসে পড়লেন। কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে জেনারেল মনজুর এলেন নির্ধারিত সময়ের একটু পরে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, তার সহকর্মীরা দায়ে পড়ে এসেছেন–তাঁরা আদৌ এ বিষয়ে আগ্রহী নন। মনজুর এসে আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বলেছিলেন, সূর্য সেনের সহযোগী বিপ্লবীদের কয়েকজন চট্টগ্রামে আছেন–তাঁরা কি এসেছেন?’ বললাম, তারা এখানেই আছেন। উনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিন। আমি আলাপ করিয়ে দিলাম। মনজুর তাদের বললেন, আপনারা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন–আমি আপনাদের পেছনে থাকবো। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আপনি আমার পাশে থাকবেন। আমি বললাম, ‘ভিত্তিপ্রস্তরে তো আপনার নাম লেখা হয়েছে–আপনি স্থাপন করলেই ভালো হয়। মনজুর বললেন, ‘লেট’স পে হোমেজ টু হিস্ট্রি। আমি তার কথা শুনে গভীরভাবে আপ্লুত হলাম।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জায়গায় বিনোদবিহারী চৌধুরী, কালীপদ চক্রবর্তী ও অনঙ্গ সেন সামনে দাঁড়ালেন, তার পেছনের সারিতে সামরিক পোশাকে জেনারেল মনজুর, সঙ্গে আমি, তার পেছনে ইউনিফর্মপরা সামরিক কর্মকর্তারা, তার পেছনে বাকি সবাই। বিপ্লবীরা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। মনজুর স্যালুট দিলেন। সেনাবাহিনীর ছোটো বাদকদল বিউগল বাজালো। তারপর দু-তিনটি গান পরিবেশিত হলো। সকালের অনুষ্ঠানের সেখানেই সমাপ্তি। জেনারেল মনজুর ও তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে করমর্দন করে ফিরে এলাম।
সন্ধ্যায় মুসলিম ইনসটিটিউটে স্মরণসভা। প্রধান অতিথি হয়ে ঢাকা থেকে এসেছেন বিচারপতি সৈয়দ মুহম্মদ হোসেন। রেলস্টেশন থেকে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমাদের বাড়িতে। তাঁর সঙ্গ মানেই আনন্দের উৎস। সভাস্থলে তিনি একটু আগে আসতে চাইলেন–সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হবে, এই কারণে। তাই হলো। কিছুকাল আগে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর মৌখিক ভাষণ টেপ থেকে অনুলিখিত হয়ে মহানায়ক বঙ্গবন্ধু’ নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং তাৎক্ষণিক সাড়া জাগায়। ফলে, তার বক্তৃতা শুনতে মানুষের খুব আগ্রহ ছিল, তাঁকে দেখতে ও তাঁর সঙ্গে পরিচিত হতেও অনেকে উৎসুক ছিলেন। ফলে তাঁকে ঘিরে সর্বক্ষণ ভিড় লেগে ছিল। সেই সন্ধ্যায় তিনি খুব উদ্দীপনাময় ভাষণ দিয়েছিলেন–তাতে স্বাধীনতা-ঘোষণার বিষয় নিয়ে জিয়াউর রহমানের নাম না করে তাঁর প্রতি কিছু শ্লেষোক্তি ছিল। শ্রোতারা তাঁর বক্তৃতা খুব উপভোগ করেছিলেন। প্রধান অতিথি সেই রাতের ট্রেনেই ঢাকায় ফিরে যান।
৪৬.
রুচি এসএসসি পরীক্ষা দিলো ১৯৮০ সালে। ওই পরীক্ষায় তার একটি বিষয় ছিল সংগীত। বোর্ডের নিয়মানুযায়ী, সংগীতের পরীক্ষা দিতে হবে কুমিল্লায়, বোর্ডের অফিসে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে গেলাম কুমিল্লায়, উঠলাম বোর্ডেরই অফিস-সংলগ্ন অতিথি-নিবাসে। যতদূরসম্ভব আত্মগোপন করে থাকলাম–বেশি প্রকাশিত হলে মনে হতে পারে, মেয়ের পরীক্ষার তদৃবির করতে এসেছি। খাওয়া-দাওয়া সারলাম বোর্ড অফিসের উলটোদিকের ছালাহউদ্দীন রেস্টুরেন্টে। কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে গেল–তিনি তাঁর সরকারি বাসভবনে যেতে বললেন। তাঁর স্ত্রী আমার সহোদরাতুল্যা–আবাল্য তাকে বকুল আপা বলে ডাকি। সুতরাং যেতেই হলো এবং চায়ের সঙ্গে বকুনি খেতে হলো-কুমিল্লায় এসেছি, তাও সপরিবারে, অথচ নিজে থেকে দেখা করিনি। আমার শ্যালক আজিজের বন্ধু–এখন আর সে নেই–দেওয়ান তাইয়েবুর রহমান তখন যমুনা অয়েল কোম্পানির কুমিল্লা অফিসের কর্মকর্তা। কীভাবে যেন খবর পেয়ে সে আমাদের খুঁজে বের করলো এবং ক্রমাগত আফসোস করতে থাকলো। সে কুমিল্লায় আছে, আর আমরা কিনা তার ওখানে না উঠে থাকছি বোর্ড অফিসের অতিথিশালায়, আর খাচ্ছি ছালাহউদ্দীন রেস্টুরেন্টে–এর চেয়ে বড়ো অঘটন আর কী হতে পারে! কবুল করতেই হলো যে, সে যে কুমিল্লায় আছে, সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। সেদিনই দুপুরে ওদের বাড়ি যেতে হলো। তার স্ত্রী নাজমা সেই দুপুরেই ঢাকায় ফিরে যাবে–তারই মধ্যে রান্নাবান্না করে সযত্নে আমাদের খাওয়ালো। তাদের ছেলেমেয়েরা তখন খুবই ছোটো। এখন তো নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা চিত্রশিল্পী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দেওয়ানের বাড়ি থেকে খেয়েই আমরা চট্টগ্রামের পথে রওনা হলাম।
যে-সন্ধ্যায় সেবারে এসএসসির ফল প্রকাশিত হলো, সে-সন্ধ্যায় রুচির ফলাফলের খবর পাইনি, কেননা, শহর থেকে দূরে হওয়ায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে (স্কুল ও কলেজ শাখা মিলিয়ে) কাগজপত্র এসে পৌঁছোতে দেরি হয়। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান সহকারী আবদুর রশীদ শহর থেকে বিভাগে পৌঁছে আমাকে ফোনে জানালেন, মেধা-তালিকায় রুচি অষ্টম স্থান পেয়েছে, দৈনিক আজাদীতে পুরো তালিকা বেরিয়েছে, বিভাগের পিয়ন দিয়ে তিনি কাগজটা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। খবরটা পেয়ে কী যে অভিভূত হয়ে গেলাম–তা বলার নয়। তারপরেই কলেজের স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক ফোন করলেন, রুচিকে এবং তার বাপ-মাকে অভিনন্দন জানাতে। তাকে বললাম, মেয়ের লেখাপড়ার বিষয়ে আমার কোনো ভূমিকা নেই, কিছু আছে তার মায়ের, বেশি আছে তার শিক্ষকদের আর এখলাসউদ্দীনের। এখলাসউদ্দীন আহমদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক-কলেজটির দেখাশোনা করার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর সমালোচকেরা বলতেন, নিজের বিভাগের চেয়ে কলেজের দিকে তার মনোযোগ বেশি। কথাটা খুব মিথ্যে নয়। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর প্রতি তার নজর ছিল–তাদের মধ্যে যারা ক্যাম্পাসে থাকতো, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি পড়াতেন এবং পড়াশোনার তত্ত্বাবধান করতেন। রুচিদের গৃহশিক্ষক ছিলেন তাদেরই স্কুলশিক্ষক আলেফ হোসেন। তিনি খুবই যত্নের সঙ্গে ওদের পড়িয়েছিলেন। ফলাফল জেনে এখলাস এলেন মুচকি হাসতে হাসতে–তারপর অন্য প্রতিবেশীরা। খাওয়াদাওয়া ছাড়াই এক মহোৎসব হয়ে গেল।
