সমাপ্তি অধিবেশন
একজন অতিথির ভাষণ; মনিরুজ্জামানের ধন্যবাদজ্ঞাপন; সভাপতির ভাষণে কর্মশালার আলোচনার সারসংক্ষেপ : আনিসুজ্জামান।
.
দুটি কর্মশালাতেই মানবিকী বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের এতজন সাধক অংশগ্রহণ করেছিলেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও কোনো অভিযোগ শুনিনি। আমার সহকর্মীরা যেমন প্রাণপণে কাজ করেছিলেন, আমার পক্ষে তা ছিল শ্লাঘার বিষয়। অংশগ্রহণকারীদের সহযোগিতাও ছিল খুব উল্লেখযোগ্য। এ রকম কর্মশালা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। তা করেনি, তবে আনোয়ার আবদেল-মালেক খুশি হয়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন, পরে কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনা সভায় এই কর্মশালার বিবরণ উপস্থাপন করতে। আমি তা করেছিলাম আলজিয়ার্সে, সে-কথা যথাসময়ে বলা যাবে।
৪৫.
১৯৭৯ সালে–আমার বিদেশযাত্রার অল্পকাল পরেই–দেশ থেকে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়। তার কিছুকাল পরে ১৯৭৪ সালে জারিকৃত জরুরি অবস্থারও অবসান ঘটে এবং সংবিধানে দেওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তাতে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়, তা নয়। তবু সামরিক শাসনের অবসান এবং মৌলিক অধিকারের পুনর্বহাল স্বস্তিকর অবস্থা বই কি! এ-সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জাতীয় সম্মেলনে দলীয় রাজনীতির প্রারম্ভিক পর্যায়ে হঠকারিতা করা হয়েছিল বলে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল-খনন কর্মসূচি গ্রহণ করে অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন করবেন বলে ঘোষণা দেন। এতে বেশ সাড়া পড়ে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি পর্যন্ত এই কর্মসূচিকে সোৎসাহে সমর্থন করে। শুনেছিলাম, মণি সিংহ এ-বিষয়ে একমত হননি, কিন্তু পার্টির অধিকাংশ সদস্যের মত তিনি মেনে নেন। জিয়াউর রহমান কথায় কথায় বিপ্লবের ধুয়া তুলতে থাকেন এবং সাধারণ মানুষ বুঝিলাম, নাই বুঝিলাম, জয় তব জয়’ ভাব নিয়ে তাঁকে সংবর্ধিত করে। তরুণদের মধ্যে জাসদ তখনো জনপ্রিয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়তে যায় মাহমুদুর রহমান মান্না। সেখানে সে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়। আওয়ামী লীগ তখনো বাকশালে-আওয়ামী লীগে এবং আওয়ামী লীগের একাধিক দলে বিভক্ত। তবে তারাও ঘর গোছাতে শুরু করে।
১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের–অন্য কথায়, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের–পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি। চট্টগ্রামে তা উদ্যাপনের জন্যে নাগরিকদের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠিত হয় আমাকে সভাপতি এবং সদ্যপ্রয়াত অ্যাডভোকেট শফিউল আলমকে সম্পাদক করে। সেদিনকার বিপ্লবীদের মধ্যে বিনোদবিহারী চৌধুরী, কালীপদ চক্রবর্তী ও অনঙ্গ সেন আমাদের মধ্যে থাকায় আমরা খুব উৎসাহিত বোধ করি। যে-জালালাবাদ পাহাড়ে সূর্য সেনেরা যুদ্ধ করেছিলেন, তা এখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের চৌহদ্দির অন্তর্ভুক্ত। আমরা সেখানেই একটি স্মারকস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাব করি। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং ঢাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ-বিষয়ে চিঠি লিখে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তখন কমিটির পক্ষ থেকে আমরা কয়েকজন চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্যে আমাদের চিঠি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে কোনো আপত্তি না জানালে–সম্ভবত অনুমোদন ও বাধা কোনোটাই আসবে না–তিনিই স্মারকস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুমতি দেবেন নিজের দায়িত্বে। আমাদের প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়ে সেদিনই তিনি স্মারকস্তম্ভের জায়গাটি চিহ্নিত করেন। আমরা লিখিতভাবে ও মৌখিকভাবে তাকেই অনুরোধ করি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্যে। তিনি সম্মতি দেন।
জিওসির দপ্তরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আঁকা কয়েকটি তৈলচিত্র টাঙানো ছিল। কিছুক্ষণ পর পর সেদিকে আমার চোখ যাচ্ছিল। তা লক্ষ করে জেনারেল মনজুর বললেন, ‘এগুলো আমি আঁকিয়েছি। ছবিতে যাদের মুখ দেখছেন, তারা সবাই। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পীর কল্পনা নয়। ছবি আঁকাবার জন্যে আমি তাদের জড়ো করিয়েছিলাম। আমি তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করলে তিনি মৃদু হাসেন। আমি এক ফাঁকে তাঁর স্কুলজীবনের সহপাঠী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোকাদ্দেসুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথা। বলি। তিনি আরমানিটোলা স্কুল নিয়ে সামান্য স্মৃতিচারণ করেন। স্থির হয়, ১৮ এপ্রিল সকালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে এবং সেদিন সকলে অবাধে সেনানিবাসে প্রবেশ করতে পারবেন।
চট্টগ্রাম বিপ্লবের পঞ্চাশবর্ষপূর্তি উদ্যাপন পরিষদের সভাশেষে একদিন বেরিয়ে আসছি। দেখি, এক তরুণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মী বলে মনে হয়। সে-ও আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। বোঝাই গেল, আমাকে সে চেনে না। সে জানতে চাইলো, আমি মিটিং থেকে বের হচ্ছি কি না। আমার হাঁ-সূচক উত্তর শুনে সে প্রশ্ন করলো, চট্টগ্রামে বিপ্লব করা সম্পর্কে সভায় কী স্থির হলো। তার জ্ঞানের বহর দেখে আমি বিস্মিত হলাম। পালটা প্রশ্ন করলাম, সে এই সভার খবর পেল কোথা থেকে? সে বললো, খবরের কাগজ থেকে। আমি বললাম, আজ স্থির হয়েছে যে, ১৮ এপ্রিলে আমরা সবাই ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে বিপ্লব করবো। আপনিও আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন।’ বেচারির একেবারে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা।
