শফিদের অনুপস্থিতিতে শুধু সকালের নাশতাটাই নিজে করে নিতাম। দু বেলা বাইরে খেতাম। ফিরতাম দেরিতে। বিবিসি-র নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর যেদিন কাজ থাকতো সেখানে সেদিন তো মধ্যরাতের অনেক পরে অর্ধনিদ্রিত লন্ডন দেখতে দেখতে ট্যাকসিতে ফিরতাম। নইলে টিউব আর ট্রেন ধরে ফেরা।
একবার কামাল হোসেন ও হামিদা এলেন অকসফোর্ড থেকে। তাঁদের সঙ্গে সিনেমা দেখে খেয়ে মার্বেল আর্চে বোধহয় শেষ টিউবটা ধরতে পারলাম দৌড়ে। কামরায় আরেকজন মাত্র যাত্রী। খানিক পরে টের পেলাম, তিনি আমাকে মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। আরো একটু পরে তিনি উঠে আমার কাছে এসে বসলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে, তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আমি একটু ভয়ই পেলাম। অন্যেরা পরামর্শ দিয়েছিলেন, অমন অবস্থায় কনডাক্টর-গার্ডের কাছাকাছি কামরায় উঠতে। এই রাতে তা করার সময় ছিল না। বললাম, না, রাত বেশি হওয়ায় একটু চিন্তা করছি আর কী!’
তিনি জিজ্ঞাসা করে যেতে থাকলেন কোথায় থাকি, কোন স্টেশনে নামবো, কীভাবে বাড়ি যাবো। আমার ভয় বাড়তে লাগলো। পরে অবশ্য কিছু হয়নি।
মানুষের এমনি স্বভাব। গভীর রাতে একা পথ চলতে ভয় হয়। আবার হঠাৎ পদশব্দ পেলেও ভয় লাগে।
৪১.
ফ র মাহমুদ হাসান ও শামসী আরাকে চিনি তাদের ছাত্রজীবন থেকে আমার ভাগ্নে মামুনের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের সুবাদে। আমি যখন সপরিবারে লন্ডনে, তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগটা পুনঃস্থাপিত হয়। মাহমুদের পিএইচডির কাজ তখনো বোধহয় শেষ হয়নি। এর মধ্যে সে লন্ডনের সাপ্তাহিক জনমত সম্পাদনা করেছিল কিছুকাল, বিবিসির বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজে জড়িয়ে গিয়েছিল। বিবিসির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এক বিপ্লবী স্লোগান প্রচার করায় সেখানকার পথ ওর জন্যে বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তাতে তার পরোয়া ছিল না। শামসী–যাকে আমরা জ্যোৎস্না বলে ডাকতেই অভ্যস্ত–শিক্ষকতা করতো লন্ডনের এক স্কুলে। দুই মেয়ে নিয়ে তারা থাকতো মাহমুদের মেজো ভাই মামুন ও তার স্ত্রীর সঙ্গে একই বাড়িতে। মামুনের অবশ্য পড়াশোনার জন্যে আরেকটা ডেরা ছিল–সেখানেই তিনি বেশির ভাগ সময় থাকতেন। তাঁর স্ত্রী অতি সরল মেয়ে–মাহমুদের ঠাট্টার হুলে বিদ্ধ হয়ে সবসময়ে অস্থির থাকতেন। আমরা সপরিবারে মাহমুদদের বাড়ি গেলে জ্যোৎস্নার কাজ বেড়ে যেতো, তার জা কিছুটা ভাগ নেওয়ার চেষ্টা অবশ্য করতেন। নিদারুণ পরিশ্রমের মধ্যেও জ্যোৎস্নার মুখের হাসিটি অম্লান থাকতো।
পরের দুবার যখন আমি একা লন্ডনে ছিলাম, তখনো মাহমুদদের বাড়িতে একইরকম আপ্যায়ন পেয়েছি। একবার সপ্তাহান্তে ওদের বাড়ি যাবো বলে মাহমুদের সঙ্গে স্থির করলাম, এর মধ্যে শিল্পী রশিদ চৌধুরী চলে এলেন লন্ডনে। মাহমুদকে ফোন করে বললাম, রশিদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে আসবো তার অসুবিধে না হলে। মাহমুদ মহা আনন্দিত হয়ে সম্মতি জানালো; জানতে চাইলো, রশিদ চৌধুরীকে সে ফোন করবে কি না। বললাম, তার দরকার হবে না। রশিদ একটু ইতস্তত করছিলেন। বলছিলেন, আমার যখন যাওয়ার কথা, আমিই যেন মাহমুদদের বাড়ি চলে যাই, তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎটা না হয় আরেকদিন হবে। আমি বললাম, তা নয়, ইচ্ছে করলে ওইদিন বাদ দিয়ে অন্য কোনোদিন সেখানে যাওয়া যায়, তবে আমি চাইছিলাম, বিকেলটা একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করে রশিদকে নিয়েই সেখানে যাবো এবং সেখানে খাওয়াদাওয়া সেরে একসঙ্গে ফিরবো। একথাও বললাম যে, তাঁর কুণ্ঠিত হওয়ার মতো কারণ থাকলে আমি কখনোই তাকে নিয়ে যেতে চাইতাম না। রশিদ যেতে সম্মত হলেন।
মাহমুদের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া গেল না। জ্যোৎস্নার মুখ দেখে বোঝ। গেল, সে আমাদের আগমন প্রত্যাশা করছিল না। তবে আমাদের দেখে সে বুঝে নিয়েছিল যে, মাহমুদকে বলে-কয়েই আমি একজন বিশিষ্ট অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে। গেছি। আমি জানতে চাইলাম, মাহমুদ বুঝি তোমাকে বলতে ভুলে গেছে? জ্যোৎস্না বললো, তাতে কিছু নয়, আপনারা বসেন। মাহমুদ যে কখন ফিরবে, কিছু বলে যায়নি। আশা করি, বেশি দেরি হবে না।’ রশিদ বিব্রত হয়ে আমার। দিকে তাকালেন। জ্যোৎস্নাকে বললাম, আজ বরঞ্চ আমরা আসি, আরেকদিন আসা যাবে। সে বললো, তা হবে না। খাওয়াদাওয়া করে তারপরে যাবেন। আমি এখনো রান্না চড়াইনি–কোনো অসুবিধে হবে না।’
রশিদ আর আমি বসে বসে গল্প করতে লাগলাম। জ্যোৎস্না মাঝে মাঝে এসে খোঁজখবর নিতে থাকলো। বেশ খানিকক্ষণ পরে মাহমুদের প্রবেশ, আমাদের দেখে শিরে করাঘাত, হইচই, খবরদারি। জ্যোৎস্নার আন্তরিকতায় রশিদের বিব্রতভাব খানিকটা দূর হয়েছিল, বাকিটা দূর হয়ে গেল মাহমুদের কথার তোড়ে। অতিথিকে বাড়িতে ডেকে ভুলে যাওয়া যে এই লোকটির পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক, রশিদের সে-প্রত্যয় জন্মালো এবং জ্যোৎস্নাকে এমন পরিস্থিতি যে প্রায়ই সামলাতে হয়, তা অনুমান করে তার প্রতিও কিছু সহানুভূতি দেখা দিলো। ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে এই দম্পতি রশিদের আপন হয়ে গিয়েছিল।
এর বেশ কিছুকাল পরে লন্ডনেই একদিন ওবায়েদ জায়গীরদার আমাকে বললো, তোমার বন্ধু এখন একটা বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে স্থিত হতে চায়। রশিদকে আমার কাছে উল্লেখ করতে হলে সে হয় তোমার বন্ধু’ নয় ‘আমার বন্ধু’ বলতো।
