লেনি নিজেই কথাটা তোলে। গতবারে তোমাকে বলেছিলাম, আমি একজনের সঙ্গে থাকি, মনে আছে?
বলি, হ্যাঁ। এবারে জানতে চাই, কী খবর তার?
লেনি বলে, আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি।
বলি, সুখবর। আগাম অভিনন্দন। কতদিন থাকলে তোমরা একসঙ্গে?
প্রায় দশ বছর।
বেশ তো। মধুর সমাপ্তি। অনন্তকাল সুখে থাকো।
এই প্রসঙ্গের আরেকটি পর্ব আছে। সেটি এখানেই বলে নিই।
পরের বছর চট্টগ্রামে টেলিগ্রাম পাই লেনির। কলকাতা থেকে পাঠিয়েছে। কদিনের জন্যে বেড়াতে আসতে চায় চট্টগ্রামে। আমি থাকবো কি না জানতে চায়।
নির্দিষ্ট দিনে তাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসি বাড়িতে। সে আসতে আসতে বলে, সে কোনো বক্তৃতা দিতে চায় না, কোনো সভায় যেতে চায় না। পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেবে, পারলে শুয়ে শুয়ে দিন কাটাবে।
এবারে তার স্ত্রীর সংবাদ নিই। লেনি বলে, একসঙ্গেই এসেছিলাম ভারতে। সে গেল কাঠমান্ডুতে। আমি ভাবলাম, এই ফাঁকে তোমার এখান থেকে বেড়িয়ে যাই।
বললাম, খুব ভালো করেছ। কেমন আছো তোমরা?
লেনি ম্লান হাসি হাসে। বলে, বিয়েটা টিকবে কি না সন্দেহ।
জানতে চাই, কী হলো আবার?
বলে, আমি সন্তান চাই, সে চায় না।
বলি, তুমি একটা হতভাগা। দশ বছর একসঙ্গে কাটালে, আর সে মা হতে চায় কি না, এতদিন তা জানতে পারোনি?
লেনি চুপ করে থাকে।
ইফরাইম মিলারের সঙ্গেও এমনি করে দেখা হয়ে গিয়েছিল লন্ডনে। ইফরাইম ছিল অ্যারোনটিকাল ইনজিনিয়ার। কী খেয়াল হলো, চাকরি-বাকরি ছেড়ে বাংলা পড়তে শুরু করলো। তারপর ডিমকের অধীনে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে গবেষণায় প্রবৃত্ত হলো পিএইচ ডি পর্যায়ে। কলকাতায় এলো, সেখান থেকে ঢাকায়, সেখান থেকে যোগাযোগ করে চট্টগ্রামে। কদিন থাকলো আমার বাড়িতে।
ওই গবেষণারই কাজ করছিল লন্ডনে। আমাকে একদিন সাউথ ব্যাংকে নিয়ে গেল সিনেমা দেখাতে। শাবানা আজমি-অভিনীত অঙ্কুর।
এবারে একদিন দুপুরবেলায় খাওয়া সেরে উঠেছি লাইব্রেরির লিফটে। সহযাত্রীর সঙ্গে গল্প করতে করতে এক শ্বেতাঙ্গিনীও উঠলো তাতে। মুখটা চেনা মনে হলো। চারতলায় লিফট থেকে নেমে তার উদ্দেশে ‘এক্সকিউজ মি বলেছি, দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সে-ও আর ইউ’ বলে হেসে দিলো। হাসি দেখে নিঃসন্দেহ হলাম। গেইল মিনো। ঢাকায় ইউএসআইএসে উপ-প্রধান ছিল। পনেরো বছর আগে যখন আমি ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্যে দরখাস্ত করি, তখন আমার ইংরেজিজ্ঞানের সার্টিফিকেট নিয়েছিলাম তারই কাছে। আমেরিকা থেকে ফিরে তাকে আর ঢাকায় পাইনি। তবে জানতে পেরেছিলাম, সরকারি চাকরি ছেড়ে সে লেখাপড়ার জগতে প্রবেশ করেছে। তার পিএইচ ডি র কাজ The Khilafat Movment in India প্রশংসিত হয়েছে।
এতকাল পরে দেখা। স্থির হলো, পরদিন লাইব্রেরির কাজ সেরে আমরা কোথাও গিয়ে বসবো এবং এতদিনের হিসাবনিকাশ করবো।
সেইমতো একটা পাবে গিয়ে বসলাম। গেইলের স্বাস্থ্য-সৌন্দর্য উভয়েরই খানিকটা হানি হয়েছে। বললাম, শিকাগো থেকে ফিরে তোমার খোঁজ করেছিলাম, গেইল। শুনলাম, তুমি ওয়াশিংটনে বদলি হয়ে গেছে। তারপর শুনলাম, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছ। তোমার বইটার খবর রাখি, আর কিছু জানি না।
গেইল আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসি হাসে। একটু একটু খায়, কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরেটা দেখতে থাকে। ধীরে ধীরে কথা বলে।
ঢাকা থেকে সে বদলি হয়ে গিয়েছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে, ইউএসআইএসের সদর দপ্তরে। কিন্তু সরকারি কাজ তার ভালো লাগছিল না, একদিন চাকরি ছেড়ে দিলো। তারপর ঢুকে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডি করলো, বিয়ে করলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেলো, সন্তানের জন্ম দিলো। এ পর্যন্ত সবই ভালো। হঠাৎ করে কদিনের অসুখে মারা গেল ছেলেটি। আকাশ ভেঙে পড়ল তার মাথায়। সে যে কী অসহ্য কষ্ট, তা বলা যায় না। চাকরিতে ইস্তফা দিলো, কষ্ট ভুলতে মাদক ধরলো। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, পুরোপুরি মাদকাসক্ত বনে গেল। ধ্বংসের প্রান্তে এসে আবার তার বাঁচতে ইচ্ছে হলো। তখন শুরু হলো মাদক ছাড়ার যুদ্ধ। সেটাও অবর্ণনীয় কষ্টের ব্যাপার। তবে সে হাল ছাড়েনি, শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তার ইচ্ছাশক্তির। এত কিছুর পর বিদ্যায়তনিক জগতে ফিরে আসা সহজ ছিল না। সেখানেও তাকে যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে পরিণামে সফল হয়েছে সে।
‘আমাকে খুব খারাপ দেখছ, তাই না?’ গেইল আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।
আমি মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে কথাটা স্বীকার করি।
‘এখন অনেক ভালো আছি। সংকটের সময়ে যদি আমাকে দেখতে! হয়তো চিনতেই পারতে না।’ গেইল সামনের পাত্র তুলে অনেকটা চুমুক দেয়। পাত্র নামিয়ে বলে, এবার তোমার কথা বলো।
৪০.
শফিউল্লাহর সংসারে তিনিই কর্তা, তবে কাজেকর্মে তাকে এদেশ-সেদেশ যেতে হয়। তখন তো বটেই, এমনি সময়েও বাড়ির কাজের বেশিটা করতে হয় শেলীকে। শেলীর ইচ্ছে, দেশে ফিরে এসে সে চারুকলা ইনসটিটিউটে পড়বে। ছেলেরা দেশে আসতে আগ্রহী নয়, শফিরও এখন দেশে ফেরার পরিকল্পনা নেই। তবে একবার সবাইকে নিয়ে ঢাকায় বেড়িয়ে যাবে।
সেই বেড়িয়ে যাওয়ার সময় এসে গেল। শফির একটু দুশ্চিন্তা আমাকে নিয়ে। একা আমাকে রেখে আসবে–আমার না জানি কত অসুবিধে হবে। আমি খোঁচা দিই, বেশ তো ছিলাম মর্ডেনে। এখন বাড়ি ডেকে এনে সবাই চলে যাচ্ছেন। এ তো বাড়িতে অতিথি নিমন্ত্রণ করে গৃহকর্তার বাইরে বেরিয়ে পড়ার মতো।’ শফি নানারকমভাবে ব্যাখ্যা দিতে চান। আমি হাসি।
