আমি খুবই বিস্মিত হলাম। রশিদের মতো সংসারী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। স্ত্রী অ্যানি ও দুই কন্যা রীতা-রোজার প্রতি তার ভালোবাসার অবধি ছিল না। ঘরের কাজে তিনি ছিলেন নিরলস, গাড়ির পরিচর্যায় ক্লান্তিহীন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিদেশি নাগরিকদের যখন বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আন এবং তার দুই মেয়ে-রোজা ও রীতাও–ফ্রান্সে চলে গিয়েছিলেন। পরে হাবিবুল্লাহ খানের সাহায্যে রশিদ করাচি বিমানবন্দর হয়ে প্যারিসে চলে গিয়েছিলেন। প্যারিসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারকর্মে রশিদ নিজে তো বটেই, আনও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, এ কথা তিনি বলতেন। এখন কী এমন ঘটলো যে, তাদের দুজনের মধ্যে আবির্ভাব হলো তৃতীয় ব্যক্তির?
ওবায়েদের কথার পিঠে কী বলব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। শেষে জানতে চাইলাম, তোমারও এই মতলব নাকি?’
ওবায়েদেরও ফরাসি স্ত্রী। একবার ওদের কেন্টের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, অঁরিয়েতের এক পা পুরো প্লাস্টার করা। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ওবায়েদ কি তোমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল?
সে হাসলো। বললো, তুমি একথা বলছো? আমার এক বান্ধবী আমাকে কী জিজ্ঞাসা করেছিল, জানো? সে বলে, তুমি কি ওকে লাথিটা খুব কষে মেরেছিলে?
ওবায়েদ সেদিন আমার প্রশ্নের জবাব দেয়নি, খুব একচোট হেসেছিল শুধু। তবে পরে ওদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়, যদিও ওবায়েদের সঙ্গে রশিদের বিষয়ে যখন কথা বলছিলাম, তখন তেমন পরিস্থিতির উদয় হয়নি।
ওবায়েদ সে-মুহূর্তে রশিদের পক্ষ নিয়ে দু-একটি কথা বললো। বাঙালি মেয়েটি যে কে, তা অবশ্য সে খুলে বলেনি, আমিও জানতে চাইনি। ওবায়েদ শুধু বলেছিল, ‘তোমাদেরই ছাত্রী।’
দেশে ফিরে আসার পরে জানতে পাই, সে আমারই প্রিয় ছাত্রী জান্নাত সুলতানা। বাংলায় অনার্স নিয়ে সে যখন ভর্তি হয়, সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে চারুকলা নিতে চাইলে তাকে আমি উৎসাহিত করেছিলাম। সেই সুবাদেই রশিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ।
ততদিনে পরিস্থিতি যতটাসম্ভব জটিল হয়েছে। সম্ভবত জান্নাত রশিদকে বিয়ে করেছে, আন মেয়েদের নিয়ে প্যারিসে চলে গেছেন, তারপর রশিদ কন্যাদের সঙ্গে ও তাদের মায়ের সঙ্গেও পুনর্মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। চট্টগ্রাম থেকেই জান্নাত একটা চিঠি পাঠিয়েছিল আমাকে–সুন্দর চিঠি। কুণ্ঠিত হয়েই সে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তার পিত্রালয়ে–আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি যাইনি–যদিও তার সঙ্গে কথা বলার স্পৃহা আমার কম ছিল। না। কিন্তু তার বাড়ি গিয়ে কী বলব আমি? এসব ক্ষেত্রে অন্যের পক্ষে কিছু পরামর্শ দেওয়াও কঠিন।
পরে মনে হয়েছে, জান্নাত যদি আসততা আমার কাছে, তাহলে কি আমি সাগ্রহে তার কথা শুনতাম না? কিছু না কিছু কি বলতাম না? ওই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার আসা ছিল অসম্ভব। তাই আসতে পারেনি। তাই ডেকে পাঠিয়েছিল আমাকে হিতৈষী ভেবে। গেলাম না কেন?
আবার একথাও মনে হয়েছে, ওই মুহূর্তে আন যদি কথা বলতে চাইতেন আমার সঙ্গে, নিশ্চয় আমি যেতাম, কিন্তু তাকেই বা কী বলতাম!
৪২.
আট মাস পরে দেশে ফিরলাম ১৯৭৯ সালের ১২ নভেম্বরে।
আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পরে শিক্ষকদের অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। প্রথমে মোহাম্মদ আবু জাফর যোগ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর মোহাম্মদ আবদুল কাইউম লন্ডন থেকে পিএইচডি করে ফিরে এসে সৈয়দ আলী আহসানের টানে চলে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। হায়াৎ মামুদ ১৯৭৩ সালে মস্কো চলে যান–ফিরে এসে জাহাঙ্গীরনগরে যোগ দেন। রাজিয়া সুলতানার পক্ষেও সেখানে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ায় তিনি সেখানেই গেলেন। আবুল কালাম মনজুর মোরশেদও গেলেন সেখানে। এরপর রাজশাহী। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল ও মাহমুদ শাহ কোরেশী। অধ্যাপক হচ্ছেন না কেন, সেই ক্ষোভে চট্টগ্রাম ছাড়তে চেয়েছিলেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল। এখন অধ্যাপক হওয়ার পরও চট্টগ্রাম ছাড়তে চাইলেন তিনি। ১৯৭৮ সালের শেষে চলে গেলেন ঢাকায়। আমি তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে এসেছিলাম–এমন দাবি করা বোধহয় অসংগত হবে না। তার বিদায় সভায় তাই বলেছিলাম, ‘একদিন এই বিভাগের মনে হয়েছিল, তাঁকে এখানে। প্রয়োজন। তাই তাকে সাদরে বরণ করা হয়েছিল এখানে। আজ তিনি মনে করছেন, এই বিভাগকে তার আর প্রয়োজন নেই। তাই আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন। জাহাঙ্গীর তারেককেও আমি নিয়ে এসেছিলাম সহযোগী অধ্যাপকরূপে, অ্যাড হক ভিত্তিতে। আবু হেনার পরে সে-ই হয় বিভাগের সভাপতি। আর মাসকয়েক পরে সেও চলে যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনসটিটিউটে, ফরাসি ভাষার সহযোগী অধ্যাপক হয়ে। আমার সময়ে আর যারা যোগ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে রাজীব হুমায়ূনও অচিরে চলে যাবে।
নতুন যোগদানকারীদের মধ্যে আর ছিল রশীদ আল ফারুকী, শিপ্রা দস্তিদার, ভূঁইয়া ইকবাল, ফজিলতুননেসা। আমার কার্যকালে, তবে আমার অনুপস্থিতিতে, যোগ দিয়েছিল মুহম্মদ শামসুল আলম, শাহজাহান মনির ও চৌধুরী জহুরুল হক। আমার সহকর্মীদের কার্যকালে, আমি চট্টগ্রামে থাকতে, আরো যোগ দিয়েছিল ময়ূখ চৌধুরী, সৌরেন বিশ্বাস, গোলাম মুস্তাফা, লায়লা জামান, আহমদ নূরুল ইসলাম। এবার ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে আমি যখন ফিরলাম, তখন মনিরুজ্জামান মহীশূর এবং রশীদ আল ফারুকী, দিলওয়ার হোসেন, ভূঁইয়া ইকবাল কলকাতায়, পিএইচডি করতে গেছে আগে-পরে।
