জামাল ও সুরাইয়া উভয়েই সদালাপী। সাহিত্যে ও সংগীতে জামালের আগ্রহ আছে। তার মা রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর অনুবাদ করেছিলেন উর্দুতে। আবু সয়ীদ আইয়ুব সম্পর্কে তার মামা। জামাল জানালেন, বাংলাভাষায় তাঁর। অধিকার সীমিত, তবে রবীন্দ্রসংগীত তিনি ভালোবাসেন। বুলুর সঙ্গে কথা বললেন পাশ্চাত্য সংগীত নিয়ে। সুরাইয়ার গবেষণার বিষয় উনিশ-বিশ শতকের। বাঙালি মুসলমান সমাজ। আমার লেখার সঙ্গে তার পরিচয় আছে, প্রমাণ হিসেবে আমার একটা আস্ত বই দাখিল করলেন। আলাপ দ্রুত জমে গেল। রন্ধননিপুণ সুরাইয়া অনেক কিছু রান্না করেছেন। সেসব খাওয়ার পরে সংগীতপর্ব। জামাল পিয়ানোতে বসলেন। সদফরা দু-বোন রোমান অক্ষরে লেখা দেখে রবীন্দ্রসংগীত গাইলো।
বিদেশে বড়ো হলে বাংলা উচ্চারণে একটু আড়ষ্টতা থাকে অনেকেরই। আন্তরিক উৎসাহ দিয়ে তারা সেটি পুষিয়ে দিলো। জামাল ভালো পিয়ানো বাজান। মেয়েদের গানের সঙ্গে তো বাজালেনই, একাও রবীন্দ্রসংগীতের সুর তুললেন।
কথায় কথায় ১৯৭১ সালের কথা উঠল। জামাল নজরুল ইসলাম তখন ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেসব চিঠি লিখেছিলেন, তার কিছু কিছু দেখালেন। বাংলাদেশে গণহত্যা ও নির্যাতনের করুণ চিত্র তিনি তাতে তুলে ধরেছিলেন। সেসব চিঠির উত্তর অনেকে যেভাবে দিয়েছিলেন, তাও মর্মস্পর্শী।
জামাল যখন বললেন যে, তিনি দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তখন আমি অবাক হলাম। কেমব্রিজে শিক্ষকতা করছেন, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। থেকে তার বই বেরিয়েছে। গবেষক হিসেবে তিনি নাম করেছেন, এখানে গবেষণার এত সুযোগ রয়েছে। এসব ছেড়ে দেশে ফিরে যাবেন–আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। অথচ তিনি যে কথার কথা বলছিলেন না, তাও স্পষ্ট। দেশে পড়াশোনার পরিবেশ সম্পর্কে তিনি খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
কেমব্রিজ ইউভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের দুটি কপি আমার হাতে দিলেন জামাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের জন্যে।
এই চমৎকার পরিবারের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দিন কাটিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।
ফেরার পথে বুলু জিজ্ঞেস করলো, গাড়িতে ১০০ মাইল স্পিডে গেছো কখনো?’
বললাম, যাইনি।’ তার মতলব বুঝে যোগ করলাম, যেতে চাইলে পুলিশের হাতে নির্ঘাত ধরা পড়বে।
‘দেখা যাক।’ বলে বুলু গতি বাড়ালো গাড়ির। হাইওয়েতে গতিবেগের সর্বোচ্চ সীমা আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি। ১০০ মাইল গতিতে উঠে বুলু নেমে এলো ৮০ মাইলে। খানিক পরে আরেকবার কাঁটা ১০০ মাইল স্পর্শ করলো। তারপর অবশ্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলাম আমরা।
বুলুকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘তোমার ভাগ্য ভালো। ধরা পড়োনি।’
বুলু হাসলো। ইংরেজিতে বললো, উপভোগ করতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়।
৩৯.
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি একটা মহামিলনক্ষেত্রও বটে। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের এবং নতুন বন্ধুলাভের অনুকূল স্থান। লন্ডনে যখন সপরিবারে ছিলাম, তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রন ইনডেনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সে বৃত্তান্ত সবিস্তারে বলেছি। পরে আবার দেখা হয় রনের সঙ্গে। আগেরবার যে বই নিয়ে সে কাজ করছিল, সেটি তখন বেরিয়ে গেছে। রন এবারে কাজ করছে। অন্য বিষয় নিয়ে।
তাকে একরাতে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম আমাদের দেশি খাওয়া খাওয়াতে। পরিবেশন করতে যে এলো, সে সালাম করে বললো, আমি আপনার ছাত্র। তাকে আমার মনে পড়েনি। তখন সে জানালো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল সে–বাংলার নয়, অন্য বিভাগে। আমাদের আলাপ শুনে রন মিটিমিটি হাসতে থাকলো।
খাওয়া-দাওয়ার শেষে বিল এনে ছেলেটি বললো, স্টাফ ডিসকাউন্ট দিয়েছি, সা। তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
রন বললো, ‘লন্ডনেও দেখছি তোমার অনেক প্রভাব।
বললাম, ‘শুনলেই তো, ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিল। শিক্ষকজ্ঞান করে। আমাকে খাতির করছে।’
রন বললো, ‘এটা শুধু তোমাদের কালচারেই সম্ভব। আমার সরাসরি কোনো ছাত্রও দেশে-বিদেশে এমন করতো না।’
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতেই বছর বারো বাদে দেখা হয়েছিল লেওনার্ড গর্ডনের সঙ্গে। আমি যখন শিকাগোয়, তখন সে পিএইচ ডি করছিল ইতিহাসে। প্রেমও করছিল। আমি চলে আসার পরে সে ডিগ্রি অর্জন করে, তার অভিসন্দর্ভ Bengal: The Nationalist Phase নামে প্রকাশিত হয়ে সমাদৃত হয়। লেনি অধ্যাপনা করে স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কে। এখন সে সুভাষ বসু ও শরৎ বসু সম্পর্কে গবেষণা করছে। এই ব্যাপারেই সে সাক্ষাৎকার নিয়েছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের। পরে তার এই গবেষণাকর্ম Brothers Against the Raj নামে খ্যাতিলাভ করেছিল।
আমি শিকাগো থেকে চলে আসার পরে লেনি বিয়ে করেছিল তার প্রেমিকাকে–সে-খবর দেশে বসে পেয়েছিলাম। তার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, বউ কেমন আছে?
লেনি বললো, ও, তুমি জানো না। আমাদের বিয়ে ভেঙে গেছে।
বললাম, দুঃখিত। আমি জানতাম না।
সে বললো, ঠিক আছে। তবে আমি একজনের সঙ্গে থাকছি। মেয়েটি সংস্কৃতবিদ। অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়।
দু বছরের মাথায় এবারে লেনির সঙ্গে আবার দেখা। আবার রেস্টুরেন্টে বসে কুশল বিনিময় করি। তুমি যে-মেয়েটির সঙ্গে থাকো, সে কেমন আছে, এমন প্রশ্ন করতে কুণ্ঠা লাগে। আমি সে-প্রসঙ্গে যাই না।
