শফির বাড়িতে তাঁর গাড়িতে এলাম। বুলু ও মাসিমাও সঙ্গে এলেন পৌঁছে দিতে। এখান থেকে গাড়িতে গেলে বুলুর বাড়ি কাছে, টিউবে গেলে অনেক ঘুরে যেতে হয়।
শেলী, মণি, মহী আমাকে স্বাগত জানালো। ওদের মধ্যে কেবল শেলীরই মনে আছে আমাকে।
পরদিন টেলিফোন-বই বের করে ফোন করছি শফির বাসা থেকে। মহী ধীর পায়ে এসে জানতে চাইলো, আর দিজ অল লন্ডন নাম্বারস্?’
বলি, হ্যাঁ।
সে আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ডু ইউ নো সো মেনি পিপল ইন লন্ডন?’
হ্যাঁ, ছায়া বিশ্বাসের ভাষায়, আমার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব নেই এখানে। সে আমার পরম সৌভাগ্য।
৩৭.
কামাল হোসেনকে নরওয়ের ক্রিশ্চেন মিকেলসন ইনসটিটিউট একটা দায়িত্ব দিয়েছিল–স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা লিখে ফেলতে। নিয়মরক্ষার জন্যে পাণ্ডুলিপি পড়ে একজনকে মতামত দিতে হবে। কামালের পরামর্শে ইনসটিটিউট সেই রিভিউর কাজটা দিলেন আমাকে। তাদের অতিথি হয়ে এক সপ্তাহ থাকার আমন্ত্রণ। কামালও তখন সেখানে থাকবেন।
চাইবামাত্র ভিসা পাওয়া গেল। সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে কামাল ও আমি এসএ এসের ফ্লাইটে বাৰ্গেনে গেলাম।
ইনসটিটিউটের একতলায় সামনের দিকে কয়েকটি সুসজ্জিত শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, বাথরুম। তার ওপর তলায় অফিস। চারতলা বাড়ির বাকি সবটা নিয়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। প্রত্যেক তলায় ইলেকট্রিক কেটল এবং চা-কফির সরঞ্জাম রাখা আছে। বই পড়তে পড়তে যখন-তখন নিজে বানিয়ে চা-কফি খাওয়া যায়। যারা ইনসটিটিউটে থাকছে, তারা দিনরাত্রির যে-কোনো সময়ে গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে পারে। এমন চমৎকার ব্যবস্থা আর আমি কোথাও দেখিনি।
আমরা বেশির ভাগ সময়ে ঘরেই খাই। রান্নাবান্নার দায়িত্ব কামালের। অবশ্য রান্নার কাজ সামান্যই। প্রায়-রান্না করা খাবার পাওয়া যায়, হরেকরকম রুটি ও পনির। ইচ্ছে করলে ভাত খাওয়া হয়। ঘরে খেতে না চাইলে খানিক হেঁটে রেস্টুরেন্টে যাওয়া চলে।
আমরা থাকতে থাকতেই রেহমান সোবহান এসে যোগ দিলো। অন্য কোনো কাজে এসেছে। বাইরে খাওয়াই তার পছন্দ। সেইসঙ্গে সিনেমা দেখাও। এসব ক্ষেত্রে আমরা তার অনিবার্য সঙ্গী।
ইনসটিটিউটের প্রধান ইউস্ট ফালান্ডের সঙ্গে ঢাকায় একবার আমার দেখা। হয়েছিল। পাকিস্তান আমলেই তিনি অর্থনীতি বিষয়ে সরকারকে মাঝে মাঝে উপদেশ দিতেন। পাকিস্তান সম্পর্কে বইও লিখেছেন। পূর্বাঞ্চলের প্রতি তাঁর সহানুভূতি গড়ে উঠেছিল তখনই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছিলেন আন্তরিকভাবে।
ইউস্ট তাঁর গাড়িতে করে মনোরম বার্গেন শহর দেখালেন। নিজের বাড়িতে নিয়ে খাওয়ালেন। তারপর বললেন, আমার বাংলাদেশি পৌত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। স্বাধীনতার পরে এদেশের একটি শিশুকে তিনি পোষ্য নিয়েছিলেন। যাকে বলে যুদ্ধ-শিশু, সে তাই। মেয়েটির বাংলা শেখার অবকাশ হয়নি। ইউস্ট তার দোভাষী হয়ে গেলেন।
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান থেকে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত সময়ের স্মৃতিকথা আছে কামালের। সেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ/ দলিলপত্র বইয়ের সাক্ষাৎকার খণ্ডে স্থান পেয়েছে। আমি তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলাম, ১৯৭১-এ বন্দিজীবনের কাহিনি লিখে ফেলতে। তিনি সময় করতে পারেননি। ইউস্ট ফান্ডের আগ্রহে এখন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত কালপর্বের স্মৃতিকথা লিখলেন। যে-সাতদিন আমরা একসঙ্গে থাকলাম, তখনো পাণ্ডুলিপিতে সংযোজন-বিয়োজন-পরিমার্জন চলছিল। ঘটনাপ্রবাহ যেমন দেখেছিলেন, তেমন লিপিবদ্ধ করেছিলেন কামাল। পরবর্তীকালের জ্ঞাত তথ্যের আলোকে আগের বিষয় বিচার করেননি। সবকিছুই বলেছেন। খুব মৃদুতার সঙ্গে।
পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে আমার সপ্রশংস মন্তব্য লিখে ফেলতে বেশি সময় লাগেনি। এক-আধটা পরামর্শও বোধহয় দিয়েছিলাম। তা মূলত নিয়মরক্ষার খাতিরে।
১১ তারিখে আমরা লন্ডনে ফিরে এলাম। হিথরো বিমানবন্দরে শুল্ক-কর্তৃপক্ষ কামালের ব্যাগ আর আমার সুটকেস বেশ ভালো করে পরীক্ষা করলেন। সাধারণত এমন হয় না। কামালকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের কি একজোড়া চোরাচালানি মনে হচ্ছে?
৩৮.
চমন আফরোজ কামাল লন্ডনে এসেছেন চিকিৎসা করতে। তাঁকে দেখতে গেলাম। তখন শামসুল কামাল বললেন তাঁর আত্মীয় জামাল নজরুল ইসলামের কথা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিতের শিক্ষক। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই শুনে শামসুল কামাল টেলিফোন নম্বর দিয়ে বললেন, আমি যেন অবশ্যই ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ করি–করলে আমার ভালো লাগবে।
ফোনে জামাল নজরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করলাম। সত্যি ভালো লাগলো। তিনি আমন্ত্রণ জানালেন কেমব্রিজে। ঠিক হলো, পরের রোববার তার সঙ্গে দেখা করতে যাবো।
বুলুকে কেমব্রিজ যাওয়ার খবর দিতে সে বললো, ওই রোববারে তার অবসর আছে। আমি চাইলে সে আমাকে গাড়ি করে নিয়ে যেতে পারবে। ঈঙ্গিত জায়গায় আমাকে নামিয়ে দিয়ে সে বইয়ের দোকান হেফার্সে থাকতে পারে, ফেরার সময় হলে আমাকে তুলে নিতে পারে।
জামাল নজরুল ইসলামকে যখন জানালাম যে, আমি একজন ডাক্তার-বন্ধুর সওয়ার হয়ে কেমব্রিজে আসতে চাই, তিনি তাকেও সাদর আমন্ত্রণ জানালেন।
গৃহকত্রী সুরাইয়া ইসলাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে গবেষণা শুরু করেছেন সবে। তাদের কন্যাদুটি হাই স্কুলে পড়ে। আমরা পৌঁছোতে সকলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন।
