সেবারে এবং তার পরেও জেবউননেসা বখশের বাড়িতে আপ্যায়িত হয়েছি। বখশ সাহেব অতি ভদ্র, দয়ালু ও বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ। সব বিষয়ে স্ত্রীকে সাহায্য করেন। তিনিও আমাকে সার’ বলে সম্বোধন করছিলেন–বাধা দিয়ে লাভ হয়নি।
৩৫.
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির পূর্বতন ডাইরেক্টর জোন ল্যানকাস্টার লোকমুখে জেনেছেন, আমি আবার লন্ডনে এসেছি লাইব্রেরির কাজে। তিনি নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন আমাকে। সেইসঙ্গে লাইব্রেরির বর্তমান ডাইরেক্টর ব্লুমফিল্ড, দুই ডেপুটি ডাইরেক্টর ডেসমন্ড ও মার্টিন এবং মাইকেল ও’কিফকেও নিমন্ত্রণ করেছেন। ডেপুটি ডাইরেক্টরদের একজন আমাকে বললেন, তিনি যেতে উৎসাহবোধ করছেন না, কেননা জোনের সাহচর্য সন্ধ্যা কাটানোর সেরা উপায় নয়। আমি শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। ভদ্রমহিলাকে আমার খুবই চমৎকার মনে হতো, অথচ তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের একজনের কাছে তাঁর আচরণ ও কথাবার্তা এমন দুঃসহ মনে হয়! মানুষ যে কত দুয়ে, এ থেকে তা বোঝা যায়।
নিমন্ত্রণরক্ষা করতে অবশ্য সবাই গেলেন। একদিন লাইব্রেরিতে কিছু বেশি। সময় কাটিয়ে দুই গাড়ি করে আমরা পাঁচজন একসঙ্গে গেলাম। জোন ল্যানকাস্টার লন্ডনের এক প্রান্তে একা থাকেন। সুন্দর, গোছালো বাড়ি। তিনি নিজে রান্না করেছেন। অতিথিদের যত্নের ত্রুটি করলেন না। আমি খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ করতে থাকলাম, তার কোনো আচরণ পীড়াদায়ক হতে পারে কি না। সেইসঙ্গে যিনি কেবল ভদ্রতার খাতিরে গেছেন, তাঁকেও পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম। হয়তো জোন একটু বেশি কথা বলেন, এর অতিরিক্ত আর কিছু আমি খুঁজে পেলাম না। অপরপক্ষে আমন্ত্রিত কেউ যে অস্বস্তি বোধ করছেন, সেটাও বোঝার উপায় ছিল না। জোন আমন্ত্রণও করেছেন হিসেব করে–পাঁচজন অতিথি এবং গৃহকত্রী মিলে খাবার টেবিলের চারপাশে সুন্দর বসে গেলেন।
আমি নিজে খুবই অভিভূত। জোন ল্যানকাস্টারের সঙ্গে আমার পরিচয় কাজের সূত্রে। ব্যক্তিগত কোনো সংযোগ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। কর্মক্ষেত্র থেকে তিনি অবসর নিয়েছেন, আমিও এসে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। এমন অবস্থায় আমাকে নিমন্ত্রণ করার বাধ্যবাধকতা তাঁর ছিল না। তবু যে তিনি এত কষ্ট স্বীকার করলেন, তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা বোধ করলাম।
আবার এটা ভেবেও বিস্মিত হলাম যে, যিনি জোনকে অপছন্দ করেন, তিনি অকপটে কথাটা আমাকে বলে দিলেন। না বললে আমি ঘুণাক্ষরেও ব্যাপারটা টের পেতাম না, জানতেই পারতাম না যে, সৌজন্যের আবরণে কেউ ভিতরের অস্বস্তি ঢেকে রেখেছেন।
না জানলেই ভালো হতো। সন্ধ্যাটা তাহলে আমার জন্য নিরঙ্কুশ ভালো লাগার হয়ে থাকতো।
৩৬.
বন্ধু এ বি এম শফিউল্লাহর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল।
পরিকল্পনা কমিশনের চাকরি ছেড়ে শফিউল্লাহ্ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন পিএইচ ডি করতে। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তিন ছেলেমেয়ে এবং নববিবাহিত বধূকে। বিদেশ থেকে চিঠি লিখে তাঁর পুনর্বিবাহের কথা জানিয়েছিলেন আমাকে। মেয়েটি অল্পবয়সী। চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রী ছিল–কোনো না কোনো সূত্রে তখন তাকে জানতাম। পরে অস্পষ্টভাবে শুনেছিলাম, বিয়েটা ভেঙে গেছে, তবে শফি ডিগ্রি অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রেই রয়ে গেছেন।
এবার আকস্মিক দেখা হওয়ায় জানলাম, ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান্ড পেরেন্টহুড ফেডারেশনের চাকরি নিয়ে শফি লন্ডনে আছেন। ইলফোর্ডে নিজের বাড়িতে থাকেন। ছেলেমেয়েরা সবাই এখানে স্কুলে যায়। মনে হলো, তিনি ভালো আছেন।
আমার সব খোঁজখবর নেওয়ার পরে শফি বললেন, আমাকে তাঁর বাড়িতে থাকতে হবে। ছাড়াছাড়ি নেই। আমি মৃদু আপত্তি করলাম, তিনি একটু দূরে থাকেন, এই অজুহাতে। শফির হিসেবে কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়ায় এখনকার চেয়ে আমার বেশি সময় লাগবে না। ওয়াটারলু স্টেশন পর্যন্ত ব্রিটিশ রেলেই আসতে পারবো।
অগত্যা ছায়া বিশ্বাসকে কুণ্ঠিত হয়ে বললাম, তার আশ্রয় ছেড়ে যাবো। তিনি হেসে বললেন, যেদিন বিমানবন্দর থেকে ফোন করে তাঁর বাড়িতে উঠেছিলাম, তিনি সেদিন ভেবেছিলেন, লন্ডনে আমার কেউ নেই। পরে তো দেখলেন, আমার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব নেই। তাদের কেউ যদি টানে আমাকে–তিনি বাধা দেবেন কেমন করে!
বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কথাটা একটু অন্যভাবে আমাকে একদিন বলেছিল ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ডেকে কর্মরত একটি মেয়ে। আমার কাছে বাইরে থেকে ফোন এলে ডেকে কর্তব্যরতরা ডেকে দিতো আমাকে। মেয়েটি একদিন হাসতে হাসতে বললো, মনে হয়, লন্ডনে তোমার অনেক পড়ুয়া আছে–সবাই মেয়ে।
আমি হেসে বললাম, দেখো, আমার ছাত্রেরা সব দেশে আছে, বেশির ভাগ মফস্বল শহরে অধ্যাপনা এবং কঠোর জীবনসংগ্রাম করছে। ছাত্রীরা অধিকাংশ ভালো বিয়ে করে প্রবাসী হয়েছে। শিক্ষককে খাতির করার দেশীয় রেওয়াজ তারা পালন করে যাচ্ছে। তাই তোমাদের বিরক্ত করে।
সে বলেছিল, বিরক্তিবোধ করি না, পর্যবেক্ষণ করে মজা পাই।
তাকে এবং ডেসকে কাজ-করা আরেকটি মেয়েকে একদিন লাইব্রেরির কাজের শেষে পাবে নিয়ে গিয়েছিলাম।
ছায়া বিশ্বাস আমাকে বিদায়ী ভোজ খাওয়ালেন। বুলু ও মাসিমাকে এবং শফিকে নিমন্ত্রণ করলেন। তাঁর বাড়ি ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হলো।
