রাতের ট্রানসমিশনের জন্যে বেশ আগে যেতে হতো বার্তা বিভাগে। সেখানে বসে অনুবাদ করতে হতো। তারপর বাংলা বিভাগে এসে বাকি অনুষ্ঠানের রেকর্ড নিয়ে যেতে হতো স্টুডিওতে। সংবাদপাঠের পর সেটা বাজানো হতো। অনুষ্ঠানশেষে বিবিসি-র ভাড়া করা ট্যাকসিতে ফিরতাম মধ্যরাতের অনেক পরে।
এক রাতে সংবাদ অনুবাদ করে স্টুডিওতে চলে গেছি। তার মধ্যে বার্তা সম্পাদক এলেন ইংরেজিতে লেখা এক টুকরো খবর নিয়ে। ওটা প্রচার করতে হবে। অনুবাদ করার সময় নেই। ইংরেজি কাগজটা সামনে রেখে মুখে মুখে অনুবাদ করে গেলাম। ভুল করিনি। তবে লিখিত অনুবাদে একবার ত্রুটি হয়েছিল আমার। কিং অফ জর্ডানকে জর্ডানের বাদশাহ না বলে রাজা বলেছিলাম। সিরাজুর রহমান এই ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন পরদিন।
আরেক সন্ধ্যায় বেশ একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমি স্টুডিওতে গেছি, স্টুডিও কমিশনার যে-তরুণী, সেও এসেছে। মাইক্রোফোনে কণ্ঠস্বর যাচাই করার জন্যে দু-চার কথা বলেছি, মেয়েটি কাঁচের ওপাশ থেকে বলে উঠলো, ‘হোয়াট এ লাভলি ভয়েস!’ আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, আমার কণ্ঠস্বর যদি ভালোও হয়ে থাকে, তার জন্যে নিজে কোনো কৃতিত্ব দাবি করতে পারি না।
অনুষ্ঠানের শেষে তার ঘরে প্রবেশ করলাম অনুষ্ঠানের বাকি অংশের ধারণকৃত রেকর্ড ফেরত নিতে। মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, অনুষ্ঠানশেষে আমি কোথায় যাবো? বললাম, বাড়ি। সে জানতে চাইলো, কোথায়। এলাকার নাম বললাম। তারপর আমি আর কিছু বললাম না বলে সে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
৩৪.
এবারে আমি যখন লন্ডনে এলাম, তখন সেখানে বাংলাদেশের হাই কমিশনার এ আর এস দোহা-মিনু দোহা নামে অধিকতর পরিচিত। তাঁকে অনেকেই পছন্দ করতেন না এবং তা হয়তো অকারণে নয়। তবে সেবারে হাই কমিশনে অনুষ্ঠেয় আমাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানটিতে দেশের প্রবাসী শিশুদের গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি একটি ভালো কাজ করেছিলেন। তারাই সারাদিন গানবাজনা-আবৃত্তি-খেলাধুলা করবে। সন্ধ্যায় সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানটি হবে বড়োদের জন্যে। একাধিক বয়োবর্গের শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশিম বিচারকমণ্ডলী গঠন করেছিলেন, এর তিন সদস্য শিল্পী। কামরুল হাসান, তিনি নিজে এবং আমি। কামরুল হাসান তখন লন্ডনে এসেছিলেন বেড়াতেওবায়েদ জায়গীরদারের বাড়িতে থেকে ছবি আঁকছিলেন প্রচুর, একটা চিত্রপ্রদর্শনীর চিন্তাও ছিল তাঁর মাথায়। যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে। জানতে পারলাম, প্রতিযোগিতার বিষয়ের মধ্যে আছে কবিতা-আবৃত্তি, সংগীত এবং তেলাওয়াত-ই-কুরআন। আমি প্রমাদ গনলাম। কুরআন-তেলাওয়াতের বিচারক হওয়ার অধিকার কামরুল হাসান ও নাজমুদ্দীন হাশিমের আছে, কিন্তু আমার! শেষ পর্যন্ত অবশ্য কাজটা এড়ানো গেল না–কেবল শ্রুতিমাধুর্যের ভিত্তিতে নম্বর দিলাম। কেউ যে বিচার কিংবা বিচারক সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেনি, তাই ভাগ্যি। বিচার যেমন হোক, বাচ্চাদের উৎসাহ দেখে খুব ভালো লেগেছিল। অনেকের জন্যেই বাংলা আর প্রথম ভাষা নেই, তবু যথাসাধ্য চেষ্টা করছে বাংলায় কবিতা পড়তে, গান গাইতে! দুপুরে খাওয়ার সময়ে ছোটোদেরকেই আগে খেতে দেওয়া হয়েছিল–খুব সুশৃঙ্খলভাবে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল তারা। অভিভাবকেরা ছিলেন পেছনে, তবে বাচ্চাদের মতো। সুশৃঙ্খল ছিলেন কি না সন্দেহ।
সন্ধ্যায় সংবর্ধনা। বহু অতিথি এসেছিলেন। ডেপুটি হাই কমিশনার মহসীন খুঁজে পেতে নিয়ে এসেছিলেন প্রফেসর জে এস টার্নারকে। তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব। থেকে অবসর নিয়েছিলেন প্রায় সিকি শতাব্দী আগে। তাঁকে বসানো হয়েছিল একটা চেয়ারে–কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিলেন, অবশ্য সবাই তাঁকে নিবৃত্ত করছিল। তাঁর কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। আমি তাঁর জেনারেল ইংলিশ ক্লাসের সাধারণ ছাত্র–আমাকে মনে রাখার কোনো হেতু নেই। তিনি অবশ্য চিনতে না পারার কারণ হিসেবে নিজের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কথা বললেন, আমি তার ছাত্র শুনেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। বললেন, কতকাল আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এসেছি, তোমরা এখনো আমাকে মনে রেখেছ, এত সম্মান জানাচ্ছ–এ আমার আশার অতীত। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতে থাকলেন।
পরে একদিন দুপুরবেলায় এক রেস্টুরেন্টে কামরুল হাসান ও আমাকে খাওয়ালেন নাজমুদ্দীন হাশিম। তাঁর অভিজ্ঞতা বিস্তর, কথা বলার ভঙ্গি আকর্ষণীয়। যে-বিষয়েই বলেন, শুনতে ভালো লাগে।
কামরুল হাসান শেষ পর্যন্ত চিত্রপ্রদর্শনী করতে পেরেছিলেন কমনওয়েলথ ইনসটিটিউটে। লোকসমাগম ভালো হয়েছিল, ছবির বিক্রিও মন্দ হয়নি। তিনি খুশি হয়েছিলেন। প্রদর্শনীর শেষে প্যারিস ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন।
সেবারকার নববর্ষ-উদযাপনের কথাও মনে পড়ে। ফিসবেরি পার্ক এলাকায় তার আয়োজন করেছিলেন জেবউননেসা বখশ। বয়সে আমার চেয়ে। বেশ খানিকটা বড়ো, কিন্তু এম এ ক্লাসে আমার ছাত্রী ছিলেন। তিনি তখন লন্ডনে এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন, সেখানকার স্কুলগুলিতে বাংলা শিক্ষাদানের ব্যাপক ব্যবস্থা যাতে হয় তার চেষ্টা করেন, আর লেখালিখি করেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কবিতা পড়তে অনুরোধ করায় আমি কিছুটা সংক্ষেপ করে রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষশেষ’ পড়েছিলাম। তার খানিক পরে স্থানীয় পার্লামেন্ট-সদস্য এলেন। জেবউননেসা বখশ পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে গেলে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি ঠিক শুনেছি তো-উনি বললেন, তুমি তার শিক্ষক! আমি বললাম, একেই বলে বরাত। তিনি বললেন, শুনলাম, তুমি এখানে কবিতার ব্যাখ্যা করেছ। বুঝলাম, তার কাছে কবিতার যথার্থ আবৃত্তি মানে তার এক ধরনের ব্যাখ্যা-ইনটারপ্রিটেশন। আমার কবিতাপাঠ আবৃত্তির পর্যায়েও পড়ে না, একথা তাঁকে বোঝাতে যাওয়া বৃথা। বললাম, একরকম।
