মাউন্টব্যাটেন সম্পর্কে আমার মনে ক্ষোভ ছিল। ভারতবর্ষে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যে ব্রিটিশ সরকার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালের জুন পর্যন্ত। মাউন্টব্যাটেন তাড়াহুড়ো করে ১৯৪৭ সালেই সে-কাজ সম্পন্ন করেন। ফলে দ্রুতগতিতে পাঞ্জাব ও বঙ্গ বিভাগ করতে গিয়ে মানুষের দুর্দশা কিছু বেড়েছিল। আরেকটু সময় নিয়ে ক্ষমতা-হস্তান্তর করলে হয়তো অত রক্তপাত হতো না। আর এ দ্রুত ব্যবস্থা তিনি নিয়েছিলেন ভারতবাসীর কথা ভেবে নয়, নিজের পরবর্তী দায়িত্বগ্রহণের সুবিধের কথা চিন্তা করে–এটাই আমার ধারণা।
বছর দুই আগে আমার বন্ধু লেওনার্ড গর্ডন মাউন্টব্যাটেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। মাউন্টব্যাটেন তখন যুক্তরাজ্যের বাইরে কোথাও যাচ্ছিলেন–লেনিকে বলেছিলেন, তার বাড়ি থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত গাড়িতে তার সঙ্গে সে কথা বলতে পারে। সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণ শুনে মনে হয়েছিল, ভারতে থাকাকালে কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে পূর্বধারণাজাত বিরাগ তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল। এতকিছু সত্ত্বেও মাউন্টব্যাটেন নিহত হওয়ায় বেদনা অনুভব করেছি।
বুলু এরপর মাসিমাকে নিয়ে বেড়াতে গেলো মার্কিন মুলুকে। ফ্ল্যাট বন্ধ করে মানসীর কাছে চাবির গোছা দিয়ে চলে গেলো। কী এক কারণে সেখান থেকে ফোন করে বললো, আমি যেন তার ফ্ল্যাটে কয়েকদিন গিয়ে থাকি। মানসীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে সেখানে সাত-আট দিন থাকলাম।
বুলুর কাছে হরদম ফোন আসে–অপরপ্রান্ত জানতে চায়, আমি কে। পরিচয় দিতে দিতে হয়রান হয়ে পড়ি। এক সকালে এমনি এক ফোন এসেছে। আমার পরিচয় পেয়ে ওপাশের নারীকণ্ঠ বললো, আনিস মামা, আমি মঞ্জু।’ ফাহমিদা মজিদ ওরফে ফাহমিদা হাফিজ ওরফে মঞ্জু। তার বাড়িতে কী একটা অনুষ্ঠানে বুলুকে নিমন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। বুলু নেই, কিন্তু আমাকে যেতে হবে। বিশেষ আপত্তি করিনি। ডা. সৈয়দ আনোয়ারুল হাফিজ আমার দীর্ঘকালের পরিচিত। আর মঞ্জু তো শিশুকাল থেকে আমার ভাগ্নি। গেলাম তাদের বাড়ি এবং আপ্যায়িত হয়ে ফিরলাম।
বুলু ফেরার আগে মানসী তার ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে রাখলো। আমরা তিনজনে মিলে তাঁদের দুজনকে আনতে গেলাম বিমানবন্দরে। দেখি, বিমর্ষ মুখে বের হচ্ছেন মা ও মেয়ে। কী ব্যাপার? লাগেজ আসেনি। পরে বহুকষ্টে তা উদ্ধার হয়েছিল অথবা সবটুকু উদ্ধার হয়নি।
মাঝখানে আমার শরীরটা খারাপ করেছিল। বুলু আমাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়োদৌড়ি শুরু করে দিলো। হাসপাতালে যখন বুলু আমার থেকে একটু দূরে, তখন কৌতূহলী নার্স আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ইজ শি ইওর ওয়াইফ? বললাম, ‘আই উইশ শি ওয়্যার, বাট শি হ্যাঁপেনস টু বি ওনলি মাই জিপি। মেয়েটি লজ্জা পেয়ে পালিয়ে গেলো। এ-কথায় পুরো সত্য বলা হয়নি, তবে প্রশ্নের উত্তর হিসেবে তা খারাপ হয়নি।
মানুষের জন্যে বুলুর দরদ ছিল অসাধারণ। ভারত থেকে একটি অবাঙালি ছেলে এসেছিল লন্ডনে চিকিৎসা করতে। সামান্য পরিচয়ের সূত্র ধরে সে। যোগাযোগ করেছিল বুলুর সঙ্গে। বুলু তার জন্যে অনেক করেছিল, এমনকী, যে হাসপাতালে সে ছিল, তার ডাক্তার-নার্সদের সঙ্গে তার ঝগড়া পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটি হাসপাতালেই মারা যায়–বুলু সে-মৃত্যু একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, হাসপাতালের বিরুদ্ধে সে মামলা করার কথাও ভেবেছিল–আমরা কয়েকজন মিলে তাকে নিরস্ত করি। আরেকবার কেরালা থেকে এক ডাক্তার এসেছিলেন কোনো এক সম্মেলনে। সম্মেলনের পরে বুলু তাঁকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিল, লন্ডন ঘুরিয়ে দেখেছিল, আমরা সকলে মিলে নাটক দেখতে এবং বাইরে খেতে গিয়েছিলাম। সেই রাতে তাদেরকে বিবিসি-র বাংলা বিভাগও দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।
৩৩.
বিবিসি-র বাংলা অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিই। আগে থেকে কর্মসূচি স্থির হয়ে থাকে। আবার, মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ডাকও পড়ে। একবার ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে বসে কাজ করছি–সিরাজুর রহমানের ফোন এলো, তখনই যেতে হবে। গিয়ে জানলাম, ভুট্টোর ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়ে গেছে, নির্ধারিত বিষয় কিছু বাদ দিয়ে এই প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা হবে। সেইসব বিষয়বস্তু অনুবাদ ও পাঠ করতে হবে।
সেদিন বিকেলে বিবিসি ক্লাবে ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে দেখি। তিনি বেশ উদবিগ্ন ছিলেন। সামরিক শাসকদের উন্মত্ত আচরণের মধ্যে দেশে ফিরে যাবেন কি না ভাবছিলেন। ঢাকার খবর জানতে চাইলেন আমার কাছে, তারপর নিজেই বললেন, কী আর জিজ্ঞেস করবো, আমি যাদের জানতাম, তাদের অনেকেই তো আর নেই।
ভুট্টোর প্রতি আমার বিরাগের সীমা ছিল না, কিন্তু সামরিক শাসকদের হাতে, এমন প্রহসনমূলক বিচারে, তাঁর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য ছিল না।
একদিন জন ক্ল্যাপহাম আমাকে ডেকে নিলেন তাঁর অফিসে। জানতে চাইলেন, আমি ওসি (অকেশনাল কনট্রিউবিটার) হতে রাজি কি না অর্থাৎ তাদের আরেকটু বেশি সময় দিতে পারব কি না। তাহলে আমাকে দরকারমতো সংবাদ অনুবাদ করে পাঠ করতে হবে এবং রাতের ট্রানসমিশনের–অর্থাৎ যে-অনুষ্ঠান আমাদের দেশে ভোরবেলায় শোনা যায়–তার দায়িত্ব নিতে হবে। একটু সময় চাইলাম, তারপর সম্মত হলাম। এতে কাজ একটু বাড়লো।
একদিন দুপুরে সংবাদের দায়িত্ব আমার ছিল–তা পালন করতে পারিনি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহম্মদ খলিলুর রহমানের পুত্র জিয়াউর রহমান লন্ডন হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিল। বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম তার জন্যে–কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কেউ কারো দেখা পাইনি। সে চলে যাবে পরদিনই। রাতে যখন সে ফোন করলো, তখন পরদিন তার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় স্থির করলাম। সে আসতে দেরি করলো–লন্ডনে প্রথম এসেছে, দেরির জন্যে দোষ দিতে পারি না। কিন্তু তাকে খাইয়ে বিদায় দিতে গিয়ে আমার আর সংবাদ অনুবাদ করার সময় রইলো না। অন্য কাউকে তা করতে পাঠানো হলো। পরে আমি গিয়ে সেই সংবাদপাঠকের মূল দায়িত্ব পালন করলাম।
