ছায়া বিশ্বাস অতিশয় সদাশয় মানুষ। তার বাড়িতে যাওয়ার পরে সপ্তাহান্তে আমি একটা ব্যাগে ময়লা কাপড় নিয়ে লড্রেটে ধুতে যাচ্ছিলাম। তিনি বাধা দিলেন। বললেন, বাড়িতে তো ওয়াশিং মেশিন আছে–আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ আমার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে রেখে দিলেন। এরপর থেকে আমাকে আর নিজ হাতে কিছু করতে হতো না–শুধু ময়লা কাপড়ের ব্যাগ রেখে গেলেই হতো। তিনি ধুইয়ে, বাড়ির পেছনের জমিতে টাঙানো দড়িতে শুকিয়ে, ভাজ করে, আমার বিছানার ওপরে রেখে দিতেন।
একবার বুলুর বাড়িতে কয়েকদিন ছিলাম। ছায়া বিশ্বাস সে-কদিনের ভাড়া নিতে অস্বীকার করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, আমি না থাকলে কী হবে, তাঁর ঘর তো দখল করে রেখেছি। তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, তিনি পেশাদার বাড়িওয়ালি নন।
আমি চেষ্টা করতাম সকালে ওঁদের পরে বাথরুম ব্যবহার করতে–যাতে বাচ্চাদের স্কুলে যেতে কিংবা মহিলার অফিসে যেতে দেরি না হয়ে যায়। সকালে নাশতা খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম, রাতে খেয়েদেয়ে ফিরতাম। কোনো কোনো বেলা যে তাদের সঙ্গে খাইনি, তা নয়, তবে এটিই ছিল আমার সাধারণ নিয়ম। এঁরা জেগে থাকলে একসঙ্গে টেলিভিশন দেখতাম কিংবা আমি খাবার টেবিলে লিখতে বসে যেতাম, ওঁরা বা উনি টেলিভিশন দেখতেন কিংবা আমাকে কফি খাওয়াতেন। জলি খুব সরল ও লক্ষ্মী মেয়ে–নানাভাবে সাহায্য করতে চেষ্টা করতো। তার ভাইটিও মিশুক প্রকৃতির–তার দাবি ছিল আমার কলমের ওপরে। আমি লিখতে বসলেই সে জিজ্ঞেস করতো, ‘হোয়্যার ইজ মাই ব্লু পেন? কলমটা অবশ্য নীল ছিল না, নীল ছিল তার রিফিলের কালি।
রিফিলের প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ল। বুশ হাউজের নিচতলা থেকে কলমের রিফিল কিনেছিলাম কয়েকটা। ঘরে ফিরে টের পেলাম, সেল্সগার্ল ভুলে দুটো রিফিল বেশি দিয়েছে। পরদিন যখন তাকে সেগুলো ফেরত দিতে গেলাম, সে সবিস্ময়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ইউ আর ভেরি অনেস্ট!’ শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। মনে হয়েছিল, আমি কৃষ্ণাঙ্গ বলেই সে সততার কথাটি তুললো, শ্বেতাঙ্গ হলে হয়তো শুধু ধন্যবাদ দিতো বা নিজের অসতর্কতার জন্যে লজ্জা প্রকাশ করতো। আবার এমনো হতে পারে যে, সবটাই পরিবেশের কারণে আমার স্পর্শকাতরতার ফল।
৩২.
বুলুর মা উমা দেবা এসেছেন মেয়ের কাছে–পারলে এখানেই থেকে যাবেন। বুলুর কাছে যাঁরা আসেন, তাঁরা সবাই প্রায় তার আত্মীয় বা পরিচিত। আমার মতো দু-চারজন অচেনা যারা আসে, তাদেরকেও তিনি আপন করে নেন। সর্বসংস্কারমুক্ত মানুষ নিজের কথা কম বলেন, অকারণ কৌতূহল প্রকাশ করেন না। যত বলেন, তার চেয়ে শোনেন বেশি।
বুলুর সঙ্গে মেলামেশার সূত্রটা আবার কুড়িয়ে নেওয়া গেল। মাঝে মাঝে মাসিমা এবং মানসী ও সরোজ আমাদের অভিযানে যোগ দেন। একবার সবাই মিলে বাইরে খেতে যাব। মানসীরা এসে গেছে। বুলু কার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করছে–কথা আর ফুরোয় না। শেষ পর্যন্ত যখন সে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলো, আমি বললাম, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল না জন্মালে তোমার খুব অসুবিধে হতো। সবাই একচোট হেসে নিলো।
একসময়ে সমুদ্রতীরবর্তী বোর্নমাউথে বেড়াতে গেলাম। এক গাড়িতে মাসিমা, বুলু ও আমি। অন্য গাড়িতে সরোজ ও মানসী। একটা ব্রেড-অ্যান্ড ব্রেকফাস্টে জায়গা পাওয়া গেল। পুরুষেরা এক ঘরে, মেয়েরা আরেক ঘরে–কড়া বিভাজন। এক জায়গায় বুলু গাড়ি পার্ক করবে–পার্কিংয়ের জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ করে এক গাড়ি সজোরে এসে আমাকে চাপা দেয় আর কী! আমি পালালাম, পার্কিংটা ওই গাড়িওয়ালাদের দখলে চলে গেলো। বুলু প্রতিবাদ করলো এবং সেই গাড়ির চালক ও আরোহী দুই শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে তার রীতিমতো ঝগড়া লেগে গেলো। বুলুর সমর্থনে মানসীও কিছু বললো–কেবল সরোজ ও আমি দূরে দূরে রইলাম। কাজটা একদম পুরুষোচিত হলো না। এ-নিয়ে বুলুর তিরস্কার শুনতে হলো।
বোর্নমাউথ জায়গাটা খুব সুন্দর। সমুদ্রের ধারের মাটি এখানে নীলাভ। সেই মাটি দিয়ে বাসনপত্র থেকে শুরু করে ঘর সাজাবার জিনিস তৈরি হয়। তার কিছু নমুনাও সংগ্রহ করা গেল। রাতের বোর্নমাউথ আলোকমালাসজ্জিত–আরো আকর্ষণীয়। দিনে জায়গাটা লোকে লোকারণ্য। আমরা কেউই পানিতে নামছি না, সাঁতারের পোশাকপরা নরনারীর মাঝখানে আপাদমস্তক সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি-সেটা বেশ বেমানান। তবে এখানে কে কাকে লক্ষ করে! সবাই প্রকৃতির সৌন্দর্যভোগ করতে এবং আমোদফুর্তি করতে ব্যস্ত। দু রাত সেখানে। কাটিয়ে ফিরতি যাত্রা।
ফেরার পথে স্টোনহেনজ দেখলাম। পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে যা ছিল, তার ধ্বংসাবশেষ। এতকাল পরেও যা টিকে আছে তা দেখার এক আশ্চর্য অনুভূতি! মানুষের কী অপরূপ কল্পনা, কী অসাধ্য পরিশ্রম, কী অপরাজিত সংকল্প কাজ করেছে এর পেছনে। ওই বিশাল বিশাল পাথর কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে, কেমন করে টেনে এনেছে, কেমন করে সাজিয়েছে, কত সময়। লেগেছে–কে জানে!
লন্ডনে প্রবেশের পূর্বমুহূর্তে সান্ধ্য দৈনিকের খবরে দেখা গেল–আততায়ীর বোমার আঘাতে লর্ড মাউন্টব্যাটেন নিহত হয়েছেন। রিপাবলিকান আর্মির কাজ। বুলুর বাড়িতে ফিরে টেলিভিশন ঘিরে বসলাম। কত জানা-অজানা ইতিহাস তার পর্দায় উন্মোচিত হলো।
