ছেলের পিঠে আলতো করে হাত রাখেন ফারুক সাহেব। চমকে ওঠে আবির। পেছনে ফিরে দেখে তার বাবা দাঁড়িয়ে।
‘কী ভাবছিলে?’
‘কই, কিছু না তো।’
‘কিছু তো ভাবা হচ্ছেই। পতাকার কথা বুঝি?’
দ্বিতীয়বার চমকে যায় আবির। বাবা কি তাহলে কোনোকিছু আঁচ করে ফেলল? কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে সে। বলে,
‘মা বলেছে?’
‘তু-ম-ম। কোন পতাকাটা চাই তোমার?’
খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে আবিরের মন। এতো সহজে বাবা পতাকা কিনে দিতে রাজি হয়ে যাবে–তা তো স্বপ্নেই ভাবা যায় না। কী আবোল-তাবোল এতোক্ষণ ভাবছিল সে বাবাকে নিয়ে তা মনে পড়তে নিজেকে ধিক্কার দিতে মন চাইলো তার।
‘আমার আর্জেন্টিনার সবচাইতে বড় পতাকাটা চাই, বাবা।’
‘বেশ। কোথায় পাওয়া যাবে এটা?’
‘মকবুল কাকার দোকানে।’
‘মকবুলের দোকান? ওটা তো মুদি দোকান, ওই দোকানে পতাকা বিক্রি হয়?’
‘মকবুল কাকা এখন পতাকাও বেচে বাবা। ওই দেখো, রাজেশদের ছাদে কত্তো বড় একটা পতাকা উড়ছে, ওটা তো মকবুল কাকার দোকান থেকেই কেনা।’
ফারুক সাহেব জানালার বাইরে দৃষ্টি ফেলে রাজেশদের ছাদে উড়তে থাকা পতাকাটার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তাই তো দেখছি! কিন্তু ওখানে যে পতাকা পাওয়া যায়, আমি তো জানতাম না।’
পিতা আর পুত্র উভয়ের দৃষ্টি ওই বিশাল সাইজের জার্মান পতাকার দিকে। রং-বেরঙের ওই পতাকায় চোখ ফেলে আবির আঁকছে এমন একখানা পতাকা ওড়ানোর স্বপ্ন, আর ফারুক সাহেব কষছেন অনাগত মাসের খরচের খসড়া। তাকে পরের মাসেও নতুন করে ধার-দেনায় জড়াতে হবে। কার কাছে হাত পাতা যাবে সেই চিন্তায় তার মন এখন থেকেই বিপন্ন।
‘বাবা’, মৃদু স্বরে ডাক দেয় আবির।
‘বলো, বাবা।’
‘আমি কি পতাকা ওড়াবো না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই ওড়াবে।
‘তাই?’
‘হুম।’
‘থ্যাংকিউ, বাবা।’
[তিন]
গুনে গুনে দুই হাজার টাকা ফারুক সাহেব আবিরের হাতে দেয়। আবির খোঁজ নিয়ে এসেছে, মকবুল কাকার দোকানে যে বিশাল সাইজের আর্জেন্টিনার পতাকাটা আছে, ওটার দাম দুই হাজার। পতাকাটা এখনো পর্যন্ত কেউ কেনার সাহস করতে পারেনি। এই পতাকা আর্জেন্টিনার পতাকাগুলোর মধ্যেই যে সবচেয়ে বিশাল তা নয়, অন্য কোনো পতাকা এটার ধারে-কাছেও নেই। তার মানে–আবির যদি এই পতাকা কিনতে পারে, তাহলে সে তো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতাকাটা ওড়াবেই, সাথে অন্যসকল দলের মধ্যেও আবির হয়ে উঠবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এমন একটা অর্জন আবিরের হতে যাচ্ছে তা ভাবতেই আবিরের যেন চোখ দিয়ে পানি এসে যায়। কালকে ক্লাসে গিয়ে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে সে যখন তার পতাকার গল্প করবে, তখন সকলের চেহারার যা অবস্থা হবে তা ভেবে আবিরের এখনই হেসে কুটি কুটি হতে মন চাচ্ছে।
আবির মকবুল কাকার দোকানে এসে দাঁড়ালো। অনেকগুলো ছেলে-পিলে এখানে পতাকা কিনছে। এক-দেড়শো টাকা দামের পতাকা। সেগুলো আর কতোই বা বড় হবে, বড়োজোর দুই-তিন হাত। কিন্তু আবির যেটা কিনতে এসেছে সেটাই হলো দেখার মতো পতাকা! সাড়ে বিয়াল্লিশ হাত লম্বা এই পতাকা যখন বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ঘরে ফিরবে আবির, রাস্তার সবাই নিশ্চয় বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে।
আবির সন্তর্পণে আরও ঘনিষ্ঠ জায়গায় এসে দাঁড়ায়, যেখান থেকে মকবুল কাকার সাথে সরাসরি কথা বলা যাবে।
‘মকবুল কাকা!’
ব্যস্ত দোকানি তাকানোর ফুরসত পায় না। আবির আবার ডাক দেয়, ‘কাকা!’
মকবুল মিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আবিরের দিকে, ‘কী হইছে?’
‘আমার পতাকা লাগবে।’
‘কোন দেশ?’
‘আর্জেন্টিনা।’
‘দেও একশো ট্যাহা।
‘একশো টাকার পতাকা না তো। দুই হাজার টাকা যেটার দাম।’
এবার অবাক হয় মকবুল মিয়া। কপালের ভাঁজ আরও দীর্ঘ করে বলে, ‘দুই হাজার ট্যাহা আছে তোমার কাছে?’
‘হ্যাঁ, এই যে দেখো’, বলতে বলতে আবির পকেট থেকে চারটে চকচকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে দেখায়।
মকবুল মিয়া কোনোকিছু না বলে, একবার আবিরকে আগাগোড়া দেখে নেয় আগে। তারপর বলে, ‘তুমি ফারুকের পোলা না?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার বাপে কই?’
‘বাবা ঘরে।’
‘তোমার বাপে জানে তুমি দুই হাজার ট্যাহা দামের পতাকা কিনতে আইছো?’
‘বাবাই তো দিলো টাকা।’
‘বাপে দিছে? তোমার বাপে যে আমার দোকান থেইকা বাকিতে জিনিস-পাতি নিয়্যা যায়, সেই ট্যাহা দেওনের খবর নাই, পোলারে দুই হাজার ট্যাহা দিয়া পতাকা কিনতে পাঠায়!
কথাগুলো শুনে আবির মাথা নিচু করে ফেলে। ওর আশপাশের সবাই ওর দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, যা ওকে খুব আহত করছে। ওর কান্না করে দিতে ইচ্ছে করছে এখন। কিন্তু এতোগুলো মানুষের সামনে ও কীভাবে কান্না করবে? কোনোমতে চোখের জল আটকে রাখে আবির।
মকবুল মিয়া আরও বলে, গত মাসে হাতের ঘড়ি বন্ধক রাইখা গেছে আমার কাছে। ট্যাহা দেওনের কথা আছিলো, দিতে পারে নাই। ওই ঘড়ি দিয়া আমি কি পানি খামু? তোমার বাপেরে কইবা এসব ফুটানি বাদ দিয়া যেন আমার ট্যাহা দিয়া যায়।
‘কতো টাকা পাওনা আছে আমার বাবার কাছে?’, আবির কোনোমতে প্রশ্ন করে।
একটা পুরাতন খাতা খুলে মকবুল মিয়া তাতে চোখ বুলায়। কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে ওঠে, ‘গুইনা গুইনা আড়াই হাজার ট্যাহা পামু।’ একটা ড্রয়ার টান দিয়ে খুলে, তার ভেতর থেকে বের করে একটা ঘড়ি। এই ঘড়ি আবির চেনে। তার বাবার ঘড়ি এটা। বাবাকে সব সময় পরতে দেখে সে। কিন্তু এই ঘড়ি যে বাবা কখন এখানে বন্ধক রেখে গেছে তা আবির জানে না। বাবার হাতের দিকে কখনো সে ওভাবে নজর দেয়নি হয়তো, তাই বুঝতে পারেনি।
