শাওনের চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে থাকে। এই খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে মামুনের মতো করে হাউমাউ করে তার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। সে দু-হাতে মুখ চেপে ধরে গোঙাতে থাকে।
[চার]
ঠক… ঠক… ঠক…
বড্ড অসময়ে আজ রাহেলা বেগমের দরজায় কড়া নড়লো। দরজা খুলে সামনে শাওনকে দেখে তিনি বেশ ঘাবড়ে গেলেন। এই অসময়ে কোনোদিন তো ও বাড়ি ফেরে না। তবে আজ কেন? তবে কি ওর শরীর খারাপ করেছে? নাকি ক্যাম্পাসে কোনো ঝামেলা হয়েছে তাকে নিয়ে? রাহেলা বেগমের বুকের ভেতরটা ধড়ফড়াতে শুরু করেছে।
শাওন একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো মায়ের দিকে। পলকহীন সেই তাকানোতে তাচ্ছিল্য নেই, উদাসীনতা নেই, নেই অপমান-অপদস্থ করবার কোনো উপকরণ। রাহেলা বেগমের বুকের ধড়ফড়ানি বাড়তে থাকে। ছেলের সম্ভাব্য বিপদের ফিরিস্তি তার চোখের সামনে যেন নৃত্য শুরু করে দিয়েছে।
এবার যেন বজ্রাঘাত হলো এবং সেই আঘাতে ভেঙেচুরে গেলো এতোক্ষণের সমস্ত নাটকীয়তা। শাওন এবার সত্যিই হাউমাউ করে কেঁদে রাহেলা বেগমের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো। আকস্মিক এই নাটকীয় দৃশ্যের কোনোকিছু বুঝে উঠবার আগেই শাওন কান্না-বিজড়িত গলায় বলতে শুরু করে, ‘আমাকে মাফ করে দাও মা। তোমার সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি। আমি আর তোমার অবাধ্য হতে চাই না, আর তোমার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করতে চাই না নিজেকে। তুমি আমাকে আগের মতো বুকে টেনে নাও মা, প্লিজ।’
রাহেলা বেগমের বুকের ছটফটানি কমে আসে। গলা জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকা শাওনের গালে চুমু খান তিনি। শাওনের এই বোধোদয়ের জন্যই যে তার এতোদিনের অপেক্ষা! একপ্রকার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে পুনরায় ফিরে পেয়েছেন তিনি। রাহেলা বেগমের ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে জায়নামায বিছিয়ে দুআ করতে। এমন মুহূর্তকে সামনে নিয়ে হাজার বছর যে শান্তিতে বেঁচে থাকা যায়!
১১. বাবাদের গল্প
[এক]
ক্লাসে রীতিমতো একটা যুদ্ধ লেগে গেছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়গুলোতে বাংলার ক্লাসরুম, চায়ের দোকান, লাইব্রেরি থেকে শুরু করে পাড়ার ঘরে ঘরে একটা যুদ্ধের আবহ বিরাজ করে। সমর্থিত দল, তাদের খেলোয়াড় এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, বিগত বছরগুলোতে দলের অর্জন, ফুটবল ইতিহাসে দলগুলোর ঝুলিতে কী আছে আর কী নেই তার চুলচেরা হিসেব-নিকেশ করার কাজে বাঙালির চাইতে বেশি পারদর্শী জাতি এই মহাবিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই।
ক্লাশরুমের যুদ্ধটারও চিরচেনা বিষয়বস্তু—’ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা।’ তর্ক-বিতর্ক হলে তো তাও ঠিক ছিলো, এসব যুদ্ধ ঠাট্টা, মশকারি থেকে শুরু করে একেবারে হাতাহাতি, এমনকি ধস্তাধস্তি পর্যন্ত গড়ায়। ক্লাসে এই মুহূর্তে হচ্ছেও তা-ই। দু’পক্ষের সমর্থকদের একে-অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকারিতে পরিবেশটা খুবই বিদঘুঁটে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর্জেন্টিনা সমর্থকরা তাদের দু’বার বিশ্বকাপ জয় এবং নিকট অতীতে ফাইনালিস্ট হওয়ার গল্প ফাঁদতে ব্যস্ত। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকরা নিজেদের পাঁচবারের বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের গল্প বলে বিগত বছরগুলোর ব্যর্থতা লুকাতে মরিয়া। কিছু আছে জার্মানি সমর্থক। এরা আকারে ইঙ্গিতে আবার আর্জেন্টিনার দিকেও ঢলে পড়ে মাঝেমধ্যে। অন্যদিকে হাতেগোনা কিছু পর্তুগাল সমর্থকরা যেন চোখমুখ বন্ধ করে ব্রাজিলকেই তাদের ‘সেকেন্ড হোম’ মনে করে। এই বিতর্ক মাঠ, ক্লাস আর চায়ের আড্ডা ছাপিয়ে জন-জীবনে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যেই।
[দুই]
কড়া রোদের মধ্যে ফারুক সাহেব অফিস থেকে ফিরছেন। বাইরের তাতানো গরমে দরদর করে ঘামছেন তিনি। মধ্যবিত্ত সংসারের ঘানি টানতে হয়, মাঝেমধ্যে কিছু পথ রিকশায় চড়ে আসতে মন চাইলেও শরীর সায় দেয় না। এ যে মধ্যবিত্তের শরীর, মরুভূমির মধ্যখানে পানির পিপাসা পেলেও এদের দু’বার ভাবতে হয়, ‘ঝোলায় যে পানি মজুদ আছে, তা দিয়ে সামনের অবশিষ্ট দিনগুলো চলা যাবে তো?’ যদি মনে হয় চলা যাবে, তাহলে টুক করে এক চুমুক খেয়ে কোনোভাবে পিপাসা নিবারণ করে, যদিও তাতে মুখ ভিজলে গলা ভিজে না।
ঘরে পা দিতেই ফারুক সাহেবের স্ত্রী সাজিয়ে বসেছেন অভিযোগের পসরা। ছেলের নাকি শখ জেগেছে এই মহল্লার সবচাইতে বড় পতাকা ওড়ানোর। মধ্যবিত্ত বাবার উচ্চবিত্ত-মনা সন্তান। নিজেরা যতো কষ্টই করুন, ছেলেপেলের শখ-আহ্লাদ পূরণে ঘাটতি হলে কেমন যেন একটা অপরাধবোধে ভোগেন এই শ্রেণিটা। নিজের শার্টের কলারের সুতো উঠে গেলেও, সন্তানের শখ পূরণে তারা মোটেও অসচ্ছল নন। ঋণ করে হোক কিংবা শরীরের রক্ত বেচে–সন্তান যখন কোনোকিছু চেয়েছে, দিতে তো হবেই। এই দেওয়া-নেওয়ার মাঝখানে মধ্যস্থতা করে একটা দীর্ঘশ্বাস। ফারুক সাহেব সেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে গোসলে ঢুকে পড়লেন।
খাওয়া-দাওয়া সেরে ছেলের রুমে এসে ঢুকলেন তিনি। জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আবির, চোখ তার রাজেশদের বাড়ির ছাদে। রাজেশ জার্মানি সমর্থন করে। একটা বিশাল সাইজের জার্মানির পতাকা সারাদিন পতপত করে ওড়ে ওদের ছাদটায়। পতাকা নিয়ে রাজেশের সে কী বড়াই! ক্লাসে তর্ক-বিতর্কের মধ্যে একদিন মইনুদ্দিনের সাথে বাজি ধরে ফেলে সে। কে কার চাইতে বড় পতাকা ওড়াতে পারে। সেদিনই নাকি ওর বাবা ওকে মকবুল কাকার দোকান থেকে সবচাইতে বড় জার্মানির পতাকাটা কিনে এনে দেয়। আবির জানে, তার বাবা রাজেশের বাবার মতো নয়। ‘সে বললো আর কিনে দেবে’–এমনটা কখনো হবে না। কিন্তু কেন তার বাবা এ রকম? রাজেশের বাবা, মইনুদ্দিন, সাকিব আর রানাদের বাবা তো এ রকম নয়।
