ঘড়িটা হাতে নিয়ে মকবুল বলে, ‘এই দেখো, এই ঘড়ি রাইখা গেছে তোমার বাপে। কও তো, এই ঘড়ি বেচলে কি আড়াই হাজার ট্যাহা পাওয়া যাইব?’
আবির কিছু বলে না। উপস্থিত পাড়ার অন্য ছেলেদের সামনে অপমানিত হয়ে সে যেন একখানা পাথরে পরিণত হয়েছে। যদি একদৌড়ে এখান থেকে পালানো যেতো, যদি আর কোনোদিন, কোনোদিন এই তল্লাটের, এই মকবুল কাকার দোকানের আশপাশে তার না আসতে হতো, যদি সে নিজেকে লুকোতে পারতো উপস্থিত এই ছেলেদের শ্লেষ-ভরা দৃষ্টি থেকে, তাহলে কতোই না সুন্দর হতে পারতো পৃথিবীটা!
হাতে থাকা টাকাগুলো আবির মকবুল কাকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘কাকা, আমার পতাকা চাই না। বাবা তোমার কাছে দেনায় আটকা আছে, এই টাকা দেনা-পরিশোধ হিশেবে রেখে দাও।’
[চার]
ফারুক সাহেব ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি অদূর পানে। দূরে কতোগুলো পাখি উড়ে যাচ্ছে। শরতের আকাশে ছুটোছুটি করছে কয়েক টুকরো মেঘ। বাড়িগুলোর ছাদে ছাদে উড়ছে রং-বেরঙের বাহারি পতাকা। এখন পতাকার মৌসুম।
ফারুক সাহেবের কাঁধে একটি কোমল হাতের, পরিচিত স্পর্শ। তিনি ঘুরে দাঁড়ান। হাতে সুতো আর পাশে দাঁড় করানো বাঁশের একটা লম্বা কঞি। ছেলে পতাকা আনলে বাপ-বেটা মিলে তা ওতে বেঁধে আকাশে ওড়ানোর যাবতীয় প্রস্তুতি। কিন্তু আবিরের হাতে পতাকা নেই।
‘পতাকা আনলে না?’, প্রশ্ন করে ফারুক সাহেব।
আবির আর বাঁধ মানাতে পারলো না চোখের জলকে। বাবার বুকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। ফারুক সাহেবের চোখও থেমে নেই। নোনা জলের একটা স্রোত, চোখ বেয়ে নেমে ভিজিয়ে দিচ্ছে আবিরের শাদা শার্ট। বাবা-ছেলের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ। বোধোদয়ের এমন সুন্দর মুহূর্তে পরিবেশ কিছুটা ভারী থাকলে মন্দ কী?
১২. টু-লেট
[এক]
বিধ্বস্ত শরীরখানা নিয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে শফিক ভাবছে, যদি আজকের রাতটা না কাটতো। যদি শেষ না হতো এই নিগুঢ় অন্ধকার, কতোই না ভালো। লাগত তার। এমন নয় যে সে অন্ধকার পছন্দ করে। খুব ছোটোবেলা থেকেই তার অন্ধকার-ভীতি প্রকট। কিন্তু আজকের অন্ধকারটা ভয়ের নয়, যেন শান্তির। যেন এই অন্ধকার রাত দীর্ঘ হলেই শফিক সুখী হয়।
শফিকের দীর্ঘ বেকার-জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে কাল। পানি-কলের চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার পর অনেক লম্বা একটা সময় তার কপালে আর কোনো চাকরি জোটেনি। এই অনেকদিন পর, অনেকদিন বললে তো কমই বলা হয়, বলা উচিত অনেক বছর পরে সে নতুন একটা চাকরি পেলো বলে। এতোগুলো বছর পরে নতুন চাকরি হাতে পেয়ে শফিকের উৎফুল্ল হওয়াই উচিত ছিলো; কিন্তু সে। জানে–রাত পেরুলেই তাকে পরিবার-পরিজন ছেড়ে পাড়ি জমাতে হবে সেই সুদুর ঢাকায়। স্ত্রী রেহানা, একটামাত্র মেয়ে আফরোজা আর বৃদ্ধ মা-বাবাকে ছেড়ে কীভাবে যে দিনগুলো কাটবে–সেই চিন্তায় সারাটা রাত ঘুমোতে পারেনি সে। নতুন চাকরি, তাও আবার ঢাকার বুকে, যেখানে একটা পদের জন্য হা করে থাকে হাজারটা মুখ, সতৃয় দৃষ্টি রেখে অপেক্ষায় থাকে হাজারখানেক চোখ। চাকরির জন্য চাতক পাখির মতন উদগ্রীব হয়ে থাকা এমন মানুষদের ভিড়ে, কখন শফিক নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, আর কখন পরিবার নিয়ে থিতু হতে পারবে শহরের বুকে তা সে জানে না। মফস্বল থেকে উঠে আসা এক নিতান্ত সরল যুবকের জন্য যেখানে টিকে থাকাটাই দুষ্কর, সেখানে ঘর-বাঁধার স্বপ্ন দেখাটা খানিকটা বিলাসিতাই বটে।
শফিকের ঘুম আসছে না কোনোভাবেই। মেয়েটার দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। সে। সৌম্য-শান্ত আর পবিত্র চেহারার মেয়েটা কী এক নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন! শফিক আলতোভাবে আফরোজার গায়ে হাত বুলায়, নিবিষ্টভাবে বুজে থাকা চোখের পাতা দু-খানায় চুমু খায় বারবার। আফরোজাকে ছাড়া কতোগুলো দিন তাকে থাকতে হবে তা ভাবতেই ধড়াস ধড়াস করে ওঠে তার হৃৎপিণ্ড। এই বিচ্ছেদ-ব্যথা সইবার জন্যে এখনই শফিক প্রস্তুত নয়।
বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মায়ের চেহারাটা। রুণ শরীর নিয়ে প্রতিদিন দরজার কাছে শফিকের আগমনের পথ চেয়ে বসে থাকতো যে মহিলা, কাল হতে তার ছুটি। ছুটি বাবারও। ছেলের ফিরতে দেরি হলে, ভগ্ন শরীর সমেত মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অলিখিত যে দায়িত্ব তিনি বহুবছর ধরে পালন করে চলেছেন–কাল তার আশু-সমাপ্তি।
আর, স্ত্রী রেহানা, যাকে হৃদয়-উজাড় করে ভালোবাসে শফিক, যার সাথে কেটে গেছে তার অযুত-রাত্রি নিযুত-প্রহর, তাকে ছাড়া শফিক বাঁচতে পারবে? ভালোবাসা, রাগ আর অভিমানের এই সংসারে রেহানার সাথেই তো তার নিত্য বোঝাপড়া, তাকে রেখে একটা আলাদা জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার কথা ভাবতে গেলেই তার বুক ফেটে কান্না আসে। কাঁদে সে ঠিকই, বিরহের দহনে বুকের ভেতরটা লন্ডভন্ড প্রায়, কিন্তু বাইরে তার প্রদর্শনী চলে না। পুরুষ মানুষ, শক্ত মনের হবে–জগতের নিয়ম কিনা!
[দুই]
‘আপনার নাম শফিক?’, সামনে উপবিষ্ট ভদ্রলোকের প্রথম প্রশ্ন।
‘জি’, ঘাড় কাত করে উত্তর দিলো শফিক।
‘চেয়ারে বসুন। আপনার ব্যাপারে ম্যানেজার সাহেব আমাকে বিস্তারিত বলেছেন।’
নীল শার্ট পরা লোকটা কথাগুলো বলতে বলতে ডেকের ওপর থাকা কাগজের স্তূপ থেকে একটা কাগজ টেনে নিয়ে মুখের সামনে ধরলেন। শফিকের বুঝতে বাকি নেই যে, এটা ওরই সিভি। কিছুক্ষণ চুপচাপ কাগজখানার ওপর সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে লোকটা বললেন, আপনার সিভি দেখে এর আগে আপনি সাপ্লাই চেইনের কোনো কাজ করেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।
