মামুনের কথায় ভাবনায় ছেদ পড়লো। সে বললো, ‘কী হয়েছে রে? বেশ চিন্তিত লাগছে তোকে।’
অস্ফুট হেসে মামুনের আশু দুর্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে শাওন বললো, ‘না, ও কিছু না। আচ্ছা, ভাবির কী অবস্থা বল তো? তোর মতোই কি অনাগত সন্তানের জন্য দিলপ্রাণ উজাড় করে দিয়ে অপেক্ষা করছেন?’
আবার হেসে উঠলো মামুন। এবারের হাসিতে দুর্ভাবনার কোনো চিহ্ন নেই; বরং তাতে সাহস আর শক্তির এক অদ্ভুত আভাস দেখতে পেলো শাওন।
মামুন বললো, ‘কী যে বলিস তুই! একজন মা তার সন্তানের জন্য যে ব্যাকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করে, একজন বাবার ব্যাকুলতা তার হাজার ভাগের এক ভাগও হবে না। অসহ্য সব যন্ত্রণা আর ভোগান্তি মুখ বুজে সহ্য করে দশটা মাস যে জঠরে বড় করে তোলে সন্তানকে, ভাবতে পারিস কতটা ত্যাগ তাতে জড়ানো থাকে? একবার কী হয়েছে জানিস? আমার স্ত্রী একদিন আমায় বললো, যদি সন্তান জন্মের সময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, হয় সন্তান বাঁচবে না-হয় মা; তখন কিন্তু তুমি আমার কথা মোটেই মাথায় আনবে না, বুঝলে? আমার সন্তানই যেন আমার ওপরে প্রাধান্য পায় তোমার কাছে। আমি না থাকলেও সে যেন বেঁচে থাকে এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে।’
সেদিন তার কথাগুলো শুনে আমার এতো খারাপ লেগেছিল, তাকে জড়িয়ে ধরে আমি হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম।
শাওনের কোনো ভাবান্তর নেই। মুখাবয়বের অবস্থা দেখে মনে হলো সে মামুনের কথাগুলো শুনতেই পায়নি। কিন্তু তা সত্য নয়। শাওনের মনের ভেতর যে অশান্ত ঝড় উঠেছে, বোধোদয়ের যে তীব্র জলোচ্ছ্বাস শাওনের বুকের ভেতর তাণ্ডব চালাতে শুরু করেছে-তা বহু কষ্টে সে লুকোনোর চেষ্টা করছে। একজন মা যে নিজের জীবন বিপন্ন করে দিয়ে হলেও অনাগত সন্তানের সুরক্ষার কথা ভাবতে পারে–শাওন তা কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবেনি। তিলে তিলে নিজের শরীরের ভেতরে যে আরেকটা শরীর একজন মা বড় করে তোলে, তার জন্যে কী অপরিসীম মায়া, কী অফুরান ভালোবাসা জমা করে রাখে বুকে–সেই চিন্তা করবার ফুরসতও। কোনোদিন মেলেনি শাওনের। কী বোকা, নির্বোধ, নির্লজ্জ আর অকৃতজ্ঞ শাওন!
এমন সময় শাওনের কল্পনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটা নারীমূর্তির ছায়া। সেই ছায়া আর কার হবে, রাহেলা বেগম ছাড়া? সেই মায়াজােনো দুটো হাত, সেই আদর-বিগলিত মধুমাখা ডাক, সেই ভালোবাসা-মিশ্রিত স্পর্শ–ছোটোবেলার স্মৃতির অন্ধকার কুঁড়ে আজ সদলবলে যেন শাওনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছে। শাওন আবার ভাবনার অতলে তলিয়ে যায়। সে দেখতে পায় তার বাবার হাত দুটো বেশ শক্তভাবে ধরে আছে তার মা রাহেলা বেগম। চোখের জলে তার বুক ভেসে যাচ্ছে। বাবাকে উদ্দেশ্য করে তার মা বলছে, ‘যদি সন্তান জন্মের সময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, হয় সন্তান বাঁচবে না-হয় মা; তখন কিন্তু তুমি আমার কথা মোটেই মাথায় আনবে না, বুঝলে? আমার সন্তানই যেন আমার ওপরে প্রাধান্য পায় তোমার কাছে। আমি না থাকলেও সে যেন বেঁচে থাকে এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে।
কল্পনায় ছেদ পড়লো শাওনের। পাশের অপারেশন থিয়েটার থেকে উঁচু স্বরে ভেসে আসছে এক নবজাতকের চিৎকার-কান্না। সেই কান্নায়, শাওন দেখতে পেলো– সবচেয়ে বেশি ধড়ফড়িয়ে উঠেছে মামুন। উন্মাদের মতো করে সে এক দৌড়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে চলে গেলো। এতোটা তাড়িত-স্বভাব মামুনের মাঝে কখনোই দেখা যায়নি আগে। তবে কি, সন্তানের সাথে সাথে বাবা-মায়েরও নতুন করে জন্ম হয়?
শাদা-পোশাক পরা একজন নার্স অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে এলেন। তার কোলে তোয়ালেতে মোড়ানো এক নবজাতক, যার কান্না হুড়মুড় করে বাড়িয়ে দিয়েছে হাসপাতাল করিডোরের ব্যস্ততা। নার্স হাসিমুখ করে বললেন, ‘এই যে মামুন সাহেব, আপনার মেয়ে হয়েছে।’
সন্তান লাভের সে অপার্থিব আনন্দে চোখমুখ ঝলমল করে উঠলো মামুনের। চোখে অশু তো আগে থেকেই আছে, এবার সে অশু পারলে নায়াগ্রার ঢল হয়ে নামতে শুরু করে! নার্সের কোল থেকে একপ্রকার ছোঁ মেরে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে মামুন সে কী কাণ্ডকারখানা সেদিন শুরু করেছিলো তা দেখে অ-মুখরা স্বভাবের শাওনও একবার হেসে ফেলল। সন্তান পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠা মামুনকে দেখে শাওনের ভেতরে এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি হয়। সেই অনুভূতি শাওনকে চমকিত করে। সে অনুভূতি শাওনকে এনে দাঁড় করায় ভাবনার এক নতুন দ্বারে।
[তিন]
বাইরে বেরিয়ে আসে শাওন। সকালের সোনা-রোদ এখনো মিলিয়ে যায়নি। মোবাইল বের করে একবার দেখে নেয় সে। অজিত, মিঠু, মনির আর সাব্বিরদের অসংখ্য মিসড-কলে ভর্তি মোবাইলের স্ক্রিন। ধ্রুব তো মেসেজে লিখেই বসল, ‘গাধা! সবকিছু পণ্ড করে দিবি নাকি তুই? এখনো আসছিস না যে? কারও কলও ধরছিস না।’
ঠিক, শাওন আজ সবকিছু পণ্ডই করে দেবে। এতোদিনকার চলে আসা সব রীতি আর নীতিতে আজ ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে শাওন। তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞের একটা জায়গায় সৃষ্টির প্রাণবন্ততা আছে, আছে প্রত্যাবর্তনের অপরিসীম আর অপার্থিব আনন্দ। শাওনের ভাবনাজুড়ে যে সুর বারে বারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যে শৈশব স্মৃতির পাতা থেকে আজ ভীষণভাবে উঠে আসতে চাইছে–শাওন আজ তাতে কোনো বাধা দেবে না।
খুব করে মায়ের কথা মনে পড়ছে শাওনের। এতোগুলো দিন কতভাবে যে তাকে কষ্ট দিয়ে এসেছে সে–তা ভাবতেই নিজেকে ভারি অপরাধী মনে হচ্ছে তার। আজ সকালেও তো কেমন নির্দয়ভাবে শাসালো মা’কে। কিন্তু কী অদ্ভুত, মা একবারের জন্যও কোনো প্রতিবাদ করলো না, একবার রেগে উঠলো না পর্যন্ত। তার বদলে প্রতিবারই কেবল মুখ গুঁজে কেঁদেছে, নয়তো উদাস নয়নে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে–ভাবে শাওন। আমাকে পেটে ধরে মা কি বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে? স্বামীকে হারিয়ে সন্তান বুকে আঁকড়ে ধরে জীবনটা কাটাতে চেয়েছিল মা–এই কি তার অমার্জনীয় অপরাধ?
