শাওন যখন বের হতে যাবে তখন তিনি আবার বললেন, ‘যদি একটু সময় দিতি তাহলে টিফিন ক্যারিয়ারে হালকা কিছু নাস্তা দিয়ে দিতাম। তোর জন্য ভোর থেকেই শীত-পিঠা বানাচ্ছিলাম।’
কিছুই বললো না শাওন। শুনতে পায়নি–এমন ভান করে বাসা থেকে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো। তার চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। রাহেলা বেগম। ছেলের চলে যাওয়ার দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে যায় অতীতের কথা। শাওন যখন তার বাবার সাথে মসজিদে যাওয়ার জন্য অথবা স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হতো, তখন সে বারবার পেছন ফিরে মায়ের দিকে তাকাতো। হাত নেড়ে মুচকি হেসে মাকে বিদায় জানাতো। দরজার আড়াল থেকে তিনিও হাত নেড়ে ছোট্ট সোনামণিটাকে বিদায় দিতেন। মা-ছেলের চোখে চোখে কথা হতো। সেই ছেলে আজ এতো অবাধ্য, এতো উদ্ধৃঙ্খল আর বেপরোয়া হয়ে পড়বে–তা। রাহেলা বেগম স্বপ্নেও ভাবেননি।
[দুই]।
শাওন কথা রেখেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সে গৌরিপুর হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে। রোগীদের আসা-যাওয়া এবং চিৎকার-চেঁচামেচিতে গমগম করছে পুরো হাসপাতাল এলাকা। শাওনকে দেখামাত্র একরকম দৌড়ে তার কাছে এলো মামুন; চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ। চিন্তা আর অস্থিরতায় শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে সে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে শাওনকে বললো, ‘থ্যাংক ইউ, দোস্ত। অনেক বড়ো উপকার করলি আজ। তুই না এলে…’–মামুন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার অব্যক্ত এবং অসমাপ্ত কথাগুলো শোনবার সময় কিংবা ইচ্ছে–কোনোটাই হয়তো নেই শাওনের। সে মামুনকে থামিয়ে দিয়ে জিগ্যেশ করলো, ‘ভাবির কী অবস্থা এখন?
‘অবস্থা তো খুবই ক্রিটিক্যাল। ব্যাপক ব্লিডিং হয়েছে। দ্রুত ব্লাড না দেওয়া গেলে…’
‘ব্লাড নেওয়া হবে কখন?’
‘এই তো, আর একটু পরেই।’
শাওন আর কোনো কথা বললো না। হাসপাতালের করিডোরে পেতে রাখা একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বাম পায়ের ওপর ডান পা রেখে সে চোখ দুটো বন্ধ করলো– অপেক্ষা কখন ডাক্তারের ডাক আসবে আর তাকে রক্ত দেওয়ার জন্যে যেতে বলবে। মামুনও বিশেষ কোনোকিছু বলতে গেলো না আর। তার রগচটা বন্ধু শাওনকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। পরোপকারী, কিন্তু ভীষণ আত্মাভিমানী। বেশ অহংকারীও–কিন্তু তা কেবল পরিস্ফুটিত হয় নিজের আত্মমর্যাদা এবং আত্ম-জগতের বেলাতেই।
শাওনের যে অন্য আরেকটা জায়গাতেও জরুরি তলব আছে–তা মামুনকে বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বলা গেলো না। তার বিপন্ন আর বিপর্যস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে মনে হলো–শাওনের অন্য কাজের গুরুত্ব বুঝবার মতন অবস্থা এখন মামুনের নেই। বিপদগ্রস্ত মানুষের কাছে নিজের বিপদ ব্যতীত বাকি দুনিয়াটাই গৌণ।
ব্লাড দেওয়া শেষে শাওন আবার হাসপাতালের করিডোরে ফেরত এলো। তাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল মামুন। শাওনের আজকের উপকারের কথা সে কোনোদিন ভুলবে না, বন্ধুর এই ঋণ কোনোভাবেই শোধ করতে পারবে না সে–এ জাতীয় কথা বলতে বলতে একেবারে শিশুদের মতন। কাঁদতে লাগলো। তার কান্না দেখে আশপাশের লোকজনও ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। ওদের দিকে। শাওন যে বিরক্ত হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে যে কড়া কোনো ধমক দিয়ে থামিয়ে দেবে–সেটা করা যাচ্ছে না। বেচারা পত্নী আর অনাগত সন্তানের জন্য চরম দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় কাতর। এহেন মুহূর্তে তাকে সান্ত্বনা না দিয়ে শাসন করতে গেলে সে ভেতর থেকেই ভেঙে পড়তে পারে।
শাওন বললো, ‘আমাকে বেরুতে হবে এবার। একটা জরুরি কাজ আছে হাতে।’
তার চলে যাওয়ার কথা শুনে মামুন শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে বললো, ‘চলে যাবি মানে? আমার সন্তানের মুখ দেখে যাবি না?’
শাওন খেয়াল করলো সন্তানের কথা বলতে গিয়ে বেশ অদ্ভুতরকমভাবে, ভোজবাজির মতন পাল্টে গেলো মামুনের চেহারা। বিষণ্ণতায় নুইয়ে পড়া মুখাবয়বে হঠাৎ যেন আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো। মামুনকে এ রকম উৎফুল্ল আর উৎসুক দেখে শাওন জানতে চাইল, ‘সন্তানের জন্য অধীর অপেক্ষায় আছিস মনে হচ্ছে!’
হেসে ফেলল মামুন। কান্নার আবহ-মিশ্রিত সে এক অদ্ভুত সুন্দর হাসি! তাকে দেখে কে বলবে যে–খানিক আগেও সে একেবারে বাচ্চা মানুষের মতন কেঁদেছিল? তার চেহারা এবং মনের এমন ত্বরিত পটপরিবর্তন দেখে শাওনও সামান্য বিভ্রান্ত হলো।
মামুন বললো, ‘সন্তান যে কী জিনিস তা বাবা হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনোদিন বুঝবি না।’
শাওন চুপ করে রইলো। মামুনের কথাটার ভারত্ব আর নিগূঢ় অর্থটা তাকে একটা সজোরে আঘাত দিয়ে গেলো যেন। কিন্তু সে আঘাত অপমানের নয়, অপরাধবোধের। সন্তানের বাবা না হওয়া পর্যন্ত এই আনন্দ, এই দুশ্চিন্তা, এই আবেগ আর অপেক্ষার মর্ম বোঝা কোনোদিন কি সম্ভব নয়? শাওনের মনে পড়ে গেলো তার বাবার কথা। যেদিন সে পৃথিবীতে আসে সেদিন তার বাবাও কি এমন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনেছিল তার জন্যে? এ রকম কোনো এক ভোরে, হাসপাতালের কোনো এক করিডোরে তার বাবাও কি ভয় এবং আশার সম্মিলিত আনন্দ আর দুর্ভাবনা নিয়ে পায়চারি করেছিলো একদিন? বাবার স্মৃতি আবছা আবছা মনে করতে পারে সে। সেই আবছা স্মৃতির সবটুকু বাবার আদর আর ভালোবাসায় মাখামাখি। বাবার কাঁধে উঠে বেড়ানো, বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়া, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, একসাথে আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায় ফেরা–স্মৃতির কুয়াশা ভেদ করে সমস্ত কিছু যেন আজ শাওনের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠতে চাইছে।
