এমনিতেই ফোনের রিংটোন বেজে ওঠায় মাঝ রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেছে শাওনের; তার ওপর মামুনের এ রকম ন্যাকা-কান্না শুনে তার সত্যি সত্যিই রাগ চড়ে গেলো। মাথাটাও ঘুরতে লাগলো ভনভন করে। ফোনের ওপাশে মামুনের নাক্যামো মার্কা কান্না যেন থামছেই না। একপর্যায়ে শাওন বিরক্ত হয়ে বললো, ‘থামবি তুই? বললাম না আগামীকাল ঠিক সময়েই হাসপাতালে থাকব? একটা কথা কি হাজারবার বলা লাগে?’
শাওনের একপ্রকার ধমক শুনে একটু থামল মামুন। বললো, ‘দোস্ত, রাগ করিস না। ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশানে পড়েই তোর কাছে ধরনা দিয়েছি। আমার হাতে যদি আরও কয়েকটি অপশান থাকত তাহলে তোকে এভাবে জ্বালাতন করতাম না। বিশ্বাস কর।’
শাওন রাগতস্বরে বললো, ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কিছু নেই। তোকে আমি বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলেছি যে, আগামীকাল ঠিক সময়ে আমি উপস্থিত হয়ে যাবো। কিন্তু তুই বেচারা তো আমার কোনো কথাই শুনছিস না। কানের ওপর ঘ্যানর ঘ্যানর করেই যাচ্ছিস। তার ওপর তোর নাকি-কান্না তো আছেই। বিরক্তি উঠে যায় না একটা মানুষের, বল?’’
শাওনের গোছালো শাসনে মামুন চুপ মেরে গেলো। কারও মুখেই কোনো কথা। নেই। দুই প্রান্তেই এক নিঃসীম নীরবতা। নীরবতা ভেঙে শাওন বললো, ‘চিন্তার কিছু নেই। আগামীকাল যত যা-ই হোক, তুই আমাকে ঠিক সময়ে হাসপাতালে দেখবি। এইটুকু ভরসা তুই আমার ওপরে রাখতে পারিস।’
মামুন খুব ধীর এবং শান্ত গলায় বললো, ‘ধন্যবাদ দোস্ত।’
মামুনের ধন্যবাদ শোনার জন্য ফোনের ও’প্রান্তে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবে–এতো ধৈর্য আর শাওনের কই? তার ধন্যবাদ বাতাসের তরঙ্গে ভেসে তার কান অবধি পৌঁছানোর আগেই সে ফোনের লাইন কেটে শুয়ে পড়েছে।
শাওনের অন্য শিডিউলটি ক্যাম্পাসের। তাদের আজ একটা ডিপার্টমেন্টাল প্রোগ্রাম আছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো প্রোগ্রামের সব দায়-দায়িত্ব চেপেছে শাওনের কাঁধেই। মোটামুটি রকমের একটা ঝামেলায় পড়ে গেলো সে। দুই জায়গায় যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে যথাসাধ্য কার্য সমাধা করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটা বাদ দিয়ে আরেকটা বেছে নেওয়ার মতো সুযোগ এখানে নেই।
সকালে বের হওয়ার পথে শাওনের মা ডাক দিয়ে বললো, ‘এতো তাড়াতাড়ি তো কখনোই যাস না। আজ যাচ্ছিস যে?’
শাওন ঘাড় বাঁকিয়ে উত্তর দিলো, ‘কখনোই যাই না বলে যে আজ যেতে পারবো না–এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি?’
ছেলের কথা শুনে শাওনের মা চুপ মেরে গেলেন একদম। তিনি খুব ভালো করেই জানেন তার ছেলে কোনোদিন সোজা কথার সোজা উত্তর দেয় না। তাকে যখন মাছের কাঁটা বেছে মাছ খেতে দেওয়া হতো সে প্লেট ঠেলে দিয়ে বলতো, ‘কাঁটার জন্য মাছ খাবো না–তা তো বলিনি। মাছ খাবো না বলেছি, কারণ–মাছ খেতে আমার ভালো লাগে না। শুধু শুধু বাড়তি আদিখ্যেতা দেখাতে এসো না প্লিজ। বিরক্তি লাগে।
ছেলের এমন অদ্ভুত আচরণে খুব আহত হন রাহেলা বেগম। বাপ-মরা একমাত্র ছেলে তার। কতো স্বপ্ন যে ছিলো তাকে ঘিরে! কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে ও এমন বেপরোয়া হয়ে উঠলো যে রাহেলা বেগম এখন নিজের ছেলেকেই মাঝেমধ্যে চিনতে পারেন না। এ যে তার পেটে ধরা সন্তান–সেটাও কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকে। স্বভাবে, আচরণে সে এখন চরম খিটখিটে। যে দু’চোখে রাহেলা বেগম ছেলেকে নিয়ে একরাশ স্বপ্ন বুনেছিলেন এতোদিন, তা আজ কান্নার অথৈ সাগরে পরিণত হয়েছে। স্বামী আযহার উদ্দিনের স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে আলেম বানাবেন। শাওনের যখন সাড়ে তিন বছর বয়স তখন থেকেই তাকে নিয়ে রোজ মসজিদে চলে যেতেন। আযহার উদ্দিন। ছেলেকে পাশে দাঁড় করিয়ে সালাত আদায় করতেন তিনি। এতো ছোট্ট বাচ্চাকে মসজিদে আনতেন বলে অন্য মুরব্বি-মুসল্লীরা প্রায়ই দু-চারটি কথা শোনাতেন আযহার সাহেবকে। কিন্তু এসবে একেবারেই পাত্তা দিতেন না তিনি। তার কথা একটাই–ছোটো বাচ্চারা ছোটোকালে যা শেখে সেটা তারা সব সময় মনে রাখতে পারে। মসজিদে আসা শিখলে বড় হয়েও মসজিদে আসবে।
আযহার উদ্দিনের এই চিন্তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাবার হাত ধরে খুব ছোটোবেলাতেই মসজিদে আসা-যাওয়া করা ছেলেটি বড়ো হয়ে মসজিদমুখী হয়নি। বললেই চলে। বাবার শেখানো সব বিদ্যে সে ভুলে বসে আছে। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে একেবারে বখে গেছে সে। অথবা হতে পারে অবাধ স্বাধীনতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাহেলা বেগম প্রায়ই বিড়বিড় করে বলেন, ‘অতিরিক্ত স্বাধীনতাও একরকম পরাধীনতা।’
পায়ে মোজা পরতে পরতে শাওন বললো, ‘দুপুরে খাবো না। ফোন কোরো না।’
রাহেলা বেগম জানতে চাইলেন, ‘খাবি না কেন? কোথায় খাবি তাহলে?’
মায়ের দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিলো সে। তার চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হচ্ছে। খুব কঠিন চেহারায় সে বললো, ‘জাহান্নামে খাবো, বুঝতে পেরেছো? কতবার বলেছি আমার ব্যাপারে বেশি নাক গলাতে আসবে না। যখন বলেছি খাবো না, তখন খাবো না, ব্যস। বারবার প্রশ্ন করে জানতে চাইবে না–কেন খাবো না, কোথায় খাবো যত্তসব!
রাহেলা বেগম দ্বিতীয়বারের মতো চুপ মেরে গেলেন। ছেলের এমন স্বভাবের সাথে তিনি আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এমন কদর্য ব্যবহারে আগে রাহেলা বেগমের চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরতো; এখন আর তেমনটা হয় না। এখন চোখ আর মন–দুটোই কেমন যেন শক্ত হয়ে যাচ্ছে। সময় যে মানুষকে কতভাবে ভাঙে-গড়ে–ভাবেন রাহেলা বেগম। আগে কষ্ট লাগত, বুক ফেটে চৌচির হতো ছেলের এহেন আচরণে। আজকাল এসব দেখে মনের ভেতরে আর হাহাকার হয় না। বুক ফেটে কান্না আসে না। মাঝে মাঝে রাহেলা বেগমের মরে যেতে ইচ্ছে করে। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চাইলেই তো আর পারা যায় না। হাদিসে নিজের মৃত্যু চাইতে নিষেধ করা হয়েছে বলে তিনি ধৈর্য ধরে আছেন।
