‘স্যারের মিসেস বোধহয় একসাথে তিনটে নেকলেস না হলে উপহার গ্রহণ করেন না, তাই।’
‘তা নয় স্যার। স্যারের মিসেস একটা নেকলেসই পায়। বাকি দুটোর একটা নেকলেস পায় স্যারের প্রেমিকা আফসানা ম্যাম।’
আমি বিস্মিত চেহারায় বললাম, ‘প্রেমিকা? তার মানে?’
‘প্রেমিকা মানে বান্ধবী, স্যার। স্যারের অন্তরঙ্গ বান্ধবী, কিন্তু বউ নয়। বড়োলোকদের এমন কতো বান্ধবীই থাকে। এগুলো বড়োলোক সমাজের কালচার। এসব না হলে সেই সমাজকে বড়োলোক সমাজ বলা যায় না।’
‘আর পরের নেকলেসটা?’
‘ওটা আজকে মধুমিতা হলে যে পতিতা মেয়েটার সাথে স্যারের ডেট হবে, ওর জন্য। বড়োলোক মানুষ, পতিতাকেও ডায়মন্ডের নেকলেস উপহার দিতে এদের গায়ে লাগে না।’
‘কিন্তু ওখানে তো বিদেশি বায়ারদের সাথে স্যারের মিটিং হওয়ার কথা। আপনি ডেটের কথা বলছেন কীভাবে?’
তৃতীয়বারের মতো হাসিতে ফেটে পড়লো শফিউল। একগাল হাসি মুখে ধরে রেখে সে বললো, ‘আমার চাকরি-জীবনের দশ বছর এখানে শেষ হতে চলল স্যার। এখানকার অলিগলি আমার চাইতে ভালো কি আপনি জানবেন? এ রকম বায়ারদের মিটিংগুলোতে একদল পতিতাকে হায়ার করা হয় বড়লোকদের সন্তুষ্টির জন্যে। মেয়ে আর মদ ছাড়া এদের আবার মিটিং হয় নাকি?’
আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। মস্তিষ্কের কোষগুলোতে যেন দারুণ এক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। খুব ভালো হতো যদি শফিউলের কাছ থেকে এই গল্পটা না শুনতে চাইতাম।
‘তার মানে, তার এমন জঘন্য একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য যে নেকলেস ব্যবহার করা হবে, তা আমাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে মধুমিতা হলে?’
‘জি স্যার, আজকে ওটাই আপনার দায়িত্ব।’
আমি চিৎকার করে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। আমার এমন চিৎকারে হতভম্ব হয়ে গেলো শফিউল। আমি কী করতে যাচ্ছি তা হয়তো সে বুঝে উঠতে পারছে না।
গাড়ি থেকে নেমে শফিউলকে বললাম, ‘এই জঘন্য গল্পটা না শুনলে যদিও মনটা শান্ত থাকত, তবুও সেটা আমাকে জানানোর জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বড় স্যারকে বলবেন, আমি সেচ্ছায় তার চাকরি থেকে ইস্তফা দিলাম। একজন চরিত্রহীন নিকৃষ্ট লোকের পিএস হয়ে থাকার চাইতে হাতিরঝিলে থালা হাতে নিয়ে ভিক্ষে করাটা আমার কাছে অধিক সম্মানের।’
গাড়ির দরজা লাগিয়ে দিয়ে আমি হাঁটা ধরলাম। পেছন থেকে শফিউলের বলা কথাগুলো আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, ‘বলেছিলাম স্যার, ভালো মানুষদের কপাল খারাপ থাকে, তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে কম।’
[তিন]
সারাদিন আর বাসায় ফিরলাম না। বুড়িগঙ্গার অদূরে বসে, ঢেউয়ের উত্থান-পতন দেখতে দেখতে কাটিয়ে দিলাম পুরোটা বিকেল। সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকুও যখন মিলিয়ে গেলো, তখন কেমন যেন শীত শীত অনুভব হলো। মুয়াজ্জিনের করুণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো বাতাসে। মাগরিবের ওয়াক্ত হলো। প্রকৃতিজুড়ে একটা স্নিগ্ধ আবেশ ঘরে ফিরবার প্রস্তুতিকে আরও ত্বরান্বিত করার আস্কারা দিয়ে গেলো। লালবাগ কেল্লার পাশ ঘেঁষে বাজারের ভেতরে যে পুরাতন মসজিদটি আছে, তার দিকে মুসল্লীদের একটা জনস্রোত এগিয়ে চলেছে ধীর পায়ে। মসজিদমুখী সেই মিছিলে আমিও নিজেকে বিলীন করে দিলাম।
সালাত শেষ করে জোর কদমে হেঁটে চলে এলাম জগন্নাথের মোড়। হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় জায়গাটা গমগম করছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম–ভিক্টোরিয়া পার্কের ওদিক থেকে, একটা ছোট্ট মেয়ে কিছু ফুলের মালা হাতে এগিয়ে আসছে। আমার কাছাকাছি এসেই সে বললো, ‘বাইয়া, শিউলি ফুলের মালা লইবেন?’
পকেটের আমার সকরুণ অবস্থা! ফুলের মালা নিলে গাড়ি ভাড়া দিতে পারব না, গাড়ি ভাড়ার কথা ভাবলে ফুল নেওয়া হবে না। চরম দোটানায় শেষ পর্যন্ত ফুলের মালারই জিত হলো। আজ না-হয় ল্যাম্পপোস্টের আলো ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাবো ঘরে। মেয়েটাকে বললাম, ‘কতো করে মালা?’
‘দশ ট্যাকা।’
‘কয়টা আছে তোমার কাছে?’
‘চাইট্টা।’
‘চারটাই দাও আমাকে। এই নাও চল্লিশ টাকা।’
ফুলের মালাগুলো আমার হাতে দিয়ে, টাকাগুলো হাতের মুঠোয় পুরে মেয়েটা দিলো এক ভোঁ-দৌড়। আজ এতো তাড়াতাড়ি তার ছুটি! সে সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারছে না। টাকাগুলো নেওয়ার সময় তার চোখ দুটো ঝলমল করছিল। মুখে সে কি তৃপ্তির হাসি! আচ্ছা, এটা কি সুখ নয়? এই যে অল্পের গল্প, এই গল্পে কি সুখ নেই?
আমি ল্যাম্পপোস্টের আলো ধরে ধরে হাঁটছি। আজ আমারও ছুটি। একটা দোযখের আস্তানা থেকে মুক্তি মিলেছে। আমার হাতে শিউলি ফুলের চারটে মালা। আমার স্ত্রী রেবেকার জন্য। রেবেকা যখন দুআর খুলে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়াবে, আলতো করে একটা মালা আমি তার খোঁপায় খুঁজে দেবো। আমি জানি সে খুব খুশি হবে। আনন্দ আর আহ্লাদে দৌড়ে সে আয়নার কাছে গিয়ে জানতে চাইবে, ‘আমাকে সুন্দর লাগছে না?’
আমি বলব, ‘একটা ফুলের গায়ে চড়েছে অন্য একটা ফুল। কোন ফুলটাকে যে বেশি সুন্দর লাগছে সেটা নির্ণয় করা কঠিন। বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি।’
আমার কথায় লজ্জা পেয়ে রেবেকা একেবারে কুঁকড়ে যাবে।
আমি তো ভীষণ সুখে আছি। একজীবনে সুখী হতে আর কী লাগে?
১০. বোধ
[এক]
আজ সকাল সকাল বের হতে হবে শাওনকে। দুই জায়গায় দুটি শিডিউল দেওয়া আছে তার। প্রথমেই যেতে হবে গৌরিপুর হাসপাতালে। সেখানে মামুনের স্ত্রীকে ভর্তি করানো হয়েছে। ডেলিভারি কেইস। গতকাল রাত দেড়টায় মামুন ফোন করে জানিয়েছে তার স্ত্রীর রক্ত লাগবে। একেবারে সকাল সকাল না পেলে অবস্থা বেগতিক আকার ধারণ করবে। ফোনে মামুন পারলে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়! অনুরোধের সুরে বারবার বলতে লাগলো, ‘দোস্ত, আসবি তো? বল না রে! সত্যি সত্যিই কি আগামীকাল আসবি হাসপাতালে? তোর ভাবির খুব ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশান যাচ্ছে। তুই ছাড়া এমন কেউ নাই যে আগামীকাল ভোরে এসে রক্ত দিতে পারবে। প্লিজ দোস্ত, কথা দে আসবি?’
