‘নেকলেস কিনতে।’
‘ও দায়িত্ব আমার নয়।’
‘তা জানি। নেকলেস আমিই কিনবো। আপনি কেবল আমার সাথে যাবেন। গাড়ি থেকে আপনাকে নামতেও হবে না। আমি নেকলেস কিনে আপনার হাতে তুলে দেবো, আপনি সেগুলো স্যারের হাতে হ্যান্ড-ওভার করে দিয়ে আসবেন মধুমিতা হলে, ব্যস।’
রোগা এবং ম্যাড়মেড়ে চেহারা হলে কী হবে, কথা বলাতে এই লোক যে দারুণ পটু তা নিঃসন্দেহ। তবে, দীপ্ত চৌধুরি কবে শফিউলের কাছে গেলেন, কবে তাকে সব বুঝিয়ে দিলেন, আর কীভাবে অতো অল্প সময়ের ব্যবধানে তা নিতান্ত বাধ্য ছাত্রের মতো গিলে নিয়ে শফিউল আমার সামনে এসে দাঁড়ি-কম-সহ সেগুলো উগরে দিলো–তা এক বিরাট আশ্চর্য! মনে হলো সেকেন্ডের ব্যবধানে সব ঘটে চলেছে। অথবা হতে পারে–ভাবনার বেড়াজালে আমিই হয়তো সময়ের ব্যাপারে বেখেয়াল হয়ে পড়েছি।
[দুই]
গাড়িতে আমার পাশে শফিউল বসা। লোকটার মুখ থেকে জর্দার বিকট গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। আমার যে তাতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে তা বুঝতে পেরেও লোকটা কথা বলার সময় একেবারে আমার মুখের ওপরে এসে পড়ছে। কী বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! সহ্যের সীমা পার হয়ে গেলে আমি মুখ ফুটে বললাম, ‘আপনি কি দয়া করে পান চিবানোটা বন্ধ করে দুটো কুলি করে আসবেন?’
হে হে করে হেসে ফেলে লোকটা বললো, ‘আগে বলবেন না স্যার! তবে এই জিনিস কিন্তু ব্যাপক মজার! আমার ধারণা, যারা জর্দা দিয়ে পান খায় না, তারা দুনিয়ার এক বিরাট অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। জীবনে একবার হলেও ট্রাই করবেন স্যার।’
আমি কথাগুলো না শোনার ভান করে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। গাড়ি থামিয়ে শফিউল মুখ থেকে পানের চিবানো অংশটা ফেলে, বোতল থেকে চুকচুক করে পানি মুখে নিয়ে তা ফুস করে ছেড়ে দিলো কয়েকবার। তার কুলি-পর্ব শেষ হলে গাড়ি আবার চলতে আরম্ভ করলো।
‘স্যার, আপনি কিন্তু বেশ ভালো মানুষ। তবে, ভালো মানুষদের কপাল খারাপ থাকে। তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে কম। তাদের ঠকানো সহজ, কষ্ট দেওয়া সহজ, আরও সহজ…’
তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আপনার কেন মনে হলো যে আমি ভালো মানুষ?
‘ভালো মানুষ না হলে কি আর নিজের হাতে ডায়মন্ডের নেকলেস কেনার সুযোগ ছাড়ে কেউ? এখানে যে বিরাট ধান্ধ করার জায়গা আছে, স্যার।’
‘স্যরি, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।’
‘খুব সহজ। আপনার আগে যারা এই পোস্টে ছিলো, তারা এমন সুযোগগুলো একেবারে লুফে নিয়ে নিতো। দেখা যেতো, তাদের তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেস কিনতে দিলে, সেখান থেকে এক লাখ টাকা তাদের পকেটে চালান হয়ে গেছে। দোকানদারকে হালকা কিছু দিয়ে ওই হিসাবের একটা মেমোও তারা জোগাড় করে রাখত। আপনার ঠিক আগেরজন তো এভাবেই চাকরি খোয়ালো। হয়েছে কী, তাকে তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেস কিনতে পাঠালেন বড় স্যার। লোকটা তিনটে ডায়মন্ড থেকে দেড় লাখ টাকা পকেটে পুরে নিলেন আরামসে। কিন্তু তাতে খায়েশ মিটল না। আরও পাবার নেশায় নতুন এক চাল চাললেন। স্যারকে এসে বললেন, নেকলেসগুলো এতো খাঁটি আর দামি–স্যারের দেওয়া টাকাতে কিছুতেই সব কেনা গেলো না। তাই, কী আর করা, নিজের পকেট থেকে বাকি টাকা পরিশোধ করে তাকে নেকলেসগুলোর দাম পরিশোধ করতে হলো। কিন্তু কপালে বিপদ থাকলে যা হয়! সেদিন স্যারের মন-মেজাজ এতো বেশি খারাপ ছিলো যে, বেশি দাম দিয়ে কিনবার কথা শুনে স্যার তো রেগেমেগে আগুন! বললেন, দাও, আমাকে এখনই জুয়েলার্সের ঠিকানা দাও। আমি নিজে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবো সেগুলো। কে বলেছে তোমাকে বাড়তি টাকা ঢালতে এগুলোর পেছনে?’
শফিউলের পান খাওয়ার মতো বদভ্যাস থাকলেও লোকটা গল্প-কথক হিশেবে দুর্দান্ত! তার কাহিনি বর্ণনার ধারা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আমি মুগ্ধ শ্রোতার মতো করে বললাম, ‘তারপর?’
‘তারপর আর কী! বড় স্যার ঠিকানা চাইলে না দিয়ে কি পারা যায়? ঠিকানা নিয়ে বড় স্যার সোজা চলে গেলেন ওই নেকলেসের দোকানে। গিয়ে ডায়মন্ডের নেকলেস তিনটে ফিরিয়ে দিয়ে টাকা ফেরত চাইলেন। কিন্তু বেচারারা তো হতভম্ব! যতো টাকা দিয়ে বেচে নাই, তার বেশি ফেরত কীভাবে দেবে? মাঝখান থেকে ধরা পড়ে গেলেন স্যারের পিএস। অতি লোভে গাজন নষ্ট।’
‘তারপর কী হলো?’
‘অনেক ঝামেলা। লোকটাকে মামলা দিলেন বড় স্যার। কী জানি, এখনো হয়তো জেলের ঘানি টানছেন বসে বসে।’
আমি অস্ফুটে বললাম, ‘আচ্ছা, এজন্যেই চৌধুরি সাহেব আমাকে নেকলেস কেনার ব্যাপারে ভয় দেখাচ্ছিলেন।’
‘কিছু বললেন স্যার?’
‘না, কিছু না। তবে একটা ব্যাপার মনে হলো। বড় স্যার কি সব সময় একসাথে তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেসই কেনেন নাকি?’
আমার এই কথা শুনে শফিউল আরেকবার হে হে করে হেসে উঠলো। হাসি থামিয়ে বললো, ‘সে আরেক কাহিনি স্যার। বড়লোকদের কাজ-কারবার তো, তাই একটু অন্যরকম।’
গল্প-কথক হিশেবে শফিউল ইতোমধ্যেই আমার মনে জায়গা দখল করে নিয়েছে। তার মুখ থেকে এই তিনটে নেকলেসের রহস্য-গল্পটাও শোনার লোভ তাই সামলানো গেলো না।
‘অন্যরকম বলতে?’
শফিউল আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সে বড় আজগুবি গল্প স্যার। বড় স্যারের সব সময় তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেসই লাগে। আমার চাকরি-জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম হতে দেখিনি কখনো।’
