কিন্তু, পীর সাহেবের খানকার কাছে এসে সবাই পাথর-মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। থেমে গেলো এতোক্ষণের সমস্ত হৈ-হুঁল্লোড়। এই দৃশ্য দেখার জন্যে সোনারচরবাসী কখনোই প্রস্তুত ছিলো না, প্রস্তুত ছিলো না রাসুর মাও। সবাই দেখছে–পীর সাহেবের খানকা শরিফের দুয়ারের একটা অংশ ভোলা। ভেতরে পীর সাহেব নেই। উনি ছুটেছেন অন্য কোথাও, অন্য কোনো সোনারচর এবং অন্য আরেক রাসুর মায়ের খোঁজে। নাজিমুদ্দিনের ছেলে মতির ঈমান কতোটুকু গেছে জানা যায়নি, তবে রাসুর মা জীবনের শেষ সম্বলটুকু যে খুইয়েছে, তা নিশ্চিত।
০৯. সুখ
[এক]।
‘বুঝলে ইয়াং ম্যান’–নিজের চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন দীপ্ত চৌধুরি, ‘সুখের প্রতিশব্দ হচ্ছে টাকা। টাকা থাকলেই জীবনে তুমি সুখী মানুষ। টাকা না থাকলে অসুখী। ভীষণ অসুখী। দুনিয়ায় কিছু ফালতু দার্শনিক আছে, ইউ নো? আমি তাদের বলি গবেট ফিলোসফার! এরা কী বলে জানো? এরা বলে, মানি ক্যান্ট বাই হ্যাপিনেস! হোয়াট দ্য হেল! টাকা দিয়ে নাকি সুখ কেনা যায় না! টাকায় কেনা যায় না এমন জিনিস দুনিয়ায় আছে নাকি আবার? হা হা হা।’
দীপ্ত চৌধুরির সামনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি আমি। আজ অফিসে আমার সপ্তম দিন। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি আরেকবার খলখলিয়ে হেসে উঠলেন। খুবই বিদঘুঁটে ধরনের হাসি। হাসি থামিয়ে বললেন, এই যেমন ধরো তোমার কথা। তুমি একজন ইয়াং, এনারজেটিক এবং খুবই স্মার্ট পারসন। কিন্তু তোমার মতো একজন লোক, যার কিনা যোগ্যতার কোনো কমতি নেই–তোমাকে কাজ করতে হচ্ছে নিতান্তই আমার পিএস হিশেবে। আমার সব কথা শোনা এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই তোমার একমাত্র কাজ। এখন যদি বলি বাইরে গিয়ে গড়াগড়ি দাও, তাও তুমি দিতে বাধ্য। হা হা হা।
আমি চুপ করে বসে আছি। চুপ করে বসে থাকা ছাড়া এখানে আমার আর তেমন কোনো কাজ নেই। আমার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো চুপচাপ এই লোকটার কথা শুনে যাওয়া। বিরক্তি ধরে গেলেও, চেহারায় সদাহাস্য ভাব জিইয়ে রেখে আমি লোকটার কথা শুনে যাচ্ছি। তিনি বলে যাচ্ছেন–এর কারণ কী জানো? এর কারণ হলো তোমার টাকা নেই। টাকার জন্য আমার যাবতীয় কথা শোনা এবং তা পালনের ব্যাপারে তুমি চুক্তিবদ্ধ। টাকা নেই বলে তোমার সুখও নেই। সুখ কিনতে তোমার টাকা চাই। টাকার জন্যেই আজ তুমি এখানে। একেবারে সহজ সমীকরণ, তাই না ইয়াং ম্যান?’
আমি বললাম, ‘স্যার, বেলা এগারোটায় মধুমিতা হলে আপনার উপস্থিত থাকার কথা। কোরিয়া থেকে যেসব বায়াররা আসবে, তাদের সাথে আপনার জরুরি মিটিং সারতে হবে। আপনি সম্ভবত ভুলে গেছেন।
‘নো নো ম্যান! আমি ভুলে যাইনি। এখন কটা বাজে দেখো তো?’
‘স্যার, দশটা পাঁচ বাজে।’
‘মোর দ্যান ফিফটি মিনিটস। এনাফ টাইম টু গো দেয়ার। তোমাকে যা বলছিলাম। কী যেন আলাপ করছিলাম তোমার সাথে? এই যাহ! ভুলে গেলাম আবার! আচ্ছা বাদ দাও। কাজের কথায় আসা যাক। তোমাকে আজকে খুব ইম্পরট্যান্ট একটা কাজ করতে হবে।’
‘জি বলুন স্যার।’
‘তোমাকে জুয়েলারি মার্কেটে যেতে হবে। চমৎকার দেখে তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেস কিনবে। মনে রেখো, বাজার কিন্তু দুই নাম্বার ডায়মন্ডে সয়লাব। দেখে-শুনে কিনতে হবে। যাকে বলে চোখ-কান খোলা রাখা। যদি নকল ডায়মন্ড কিনে আনো, ইউ নো, হোয়াট আই উইল ডু উইদ ইউ।’
আমি এবারও চুপ করে আছি। তিনি বলতে লাগলেন, ‘বাকি জীবন হয়তো তোমাকে জেলে পচে মরতে হবে। হা হা হা।’
আমাকে চাপা একটা ভয় দেখিয়ে দীপ্ত চৌধুরি ঘাবড়ে দিতে চাইলেন। আমি ঘাবড়াইনি দেখে তিনি বললেন, ‘তোমার সাহস আছে বেশ। আই এপ্রিশিয়েইট ইট! বাই দ্য ওয়ে, তিনটে ডায়মন্ডের নেকলেস দিয়ে আমি কী করবো জানতে চাইলে না যে!’
‘স্যার, এটা জিগ্যেশ করা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।’
আমার উত্তরে এবার উনি দমে গেলেন খানিকটা বেশ জমিয়ে কোনো গল্প শুরু করতে গিয়ে আগ্রহী শ্রোতা না পেলে গল্প-কথক যেভাবে নিদারুণ পর্যুদস্ত হয়, ঠিক সেরকম অবস্থা তার। কিন্তু দুরন্ত চালাক বলে তার এই অপ্রসন্নতা আমাকে তিনি বুঝতে দিলেন না। তার মোলায়েম কিন্তু হেঁয়ালি গলায় বললেন, ‘গুড ডেলিভারি। তোমার পোস্টে আগে যারা ছিলো সবার কিন্তু এসব ব্যাপারে দুর্নিবার আগ্রহ থাকত। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে চাইতো আমার কাছে। তুমি তাদের মতন নও জেনে ভালো লাগলো। অ্যানিওয়েজ, নেকলেস তোমাকে কিনতে হবে না। আমি শফিউলকে সাথে দিচ্ছি, সে নেকলেস কিনে তোমাকে দিলে তুমি সেগুলো নিয়ে মধুমিতা হলে চলে যেয়ো।’
কথাগুলো শেষ হলে দীপ্ত চৌধুরি হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তার প্রস্থানের সাথে সাথে শফিউল নামের একজন এসে বললো, ‘স্যার চলুন।’
দীপ্ত চৌধুরির পিএস হিশেবে এখানে আমি নতুন জয়েন করেছি। চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতাও এ আমার প্রথম। এখানেও যে কেউ আমাকে স্যার সম্বোধন করতে পারে তা আমার ভাবনাতে ছিলো না। ব্যাপারটা আমাকে তেমন আনন্দ না দিলেও খানিকটা সম্মান দিয়েছে।
শফিউল নামের লোকটার চেহারা ম্যাড়মেড়ে, কিন্তু তাতে চালাকির ষোলোআনা উপস্থিতি বিদ্যমান। আমার দিকে নিক্ষেপ করা তার চতুর দৃপাত সে বিষয়ের সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে। ভদ্রতার খাতিরেই আমি মুচকি হেসে জানতে চাইলাম, ‘কোথায় যাবো?’
