‘তা বটে।
‘বেশি রাত জেগে না। রাত জাগলে তোমার চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে।
‘হুম।
‘বাবা বলছেন মায়ের অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। বেশ অনেকদিন থাকা লাগতে পারে।
‘সমস্যা নেই।
‘তোমাকে আরেকটা ডিম অমলেট করে দিই?’
‘দরকার নেই।
ওপরের কথাগুলোই রেবেকার সাথে আমার আজকের শেষ সংলাপ। এরপর আমি অফিসের জন্য বেরোই। ঠিক এগারোটা ত্রিশ মিনিটে, রেবেকা মেসেজ করেছে। আমার ফোনে। লিখেছে, আমরা এইমাত্র বেরোলাম। তোমার অপেক্ষায় থাকব।
[তিন]
বাসায় ফিরেছি রোজকার মতো। কলিংবেল চেপে দাঁড়িয়ে আছি বাইরে। রেবেকার কোনো সাড়াশব্দ নেই। ও, মনে পড়েছে। ও তো আজ বাসায় নেই। আজিব! দরজার সাথে এতোবড়ো একটা তালা ঝুলছে সেটাও আমার চোখে পড়লো না! রেবেকার ওপর কী এক অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে গেলো আমার! ব্যাগ হাতড়িয়ে বাসার চাবি বের করলাম। দরজা খুলে ভেতরে আসতেই মনে হলো ঘরজুড়ে এক নিশ্চপ নীরবতা। সুনসান। বাতিগুলো জ্বালাতেই চোখ গিয়ে পড়লো রেবেকার পড়ার টেবিলে। একটা খাতা খোলা অবস্থায় পড়ে আছে সেখানে। কৌতূহল জাগার কথা নয়। এমন নিতান্ত সাধারণ বিষয়ে আমার কোনোদিন কোনো আগ্রহ জন্মেনি। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা সাধারণ হলেও আচমকা। খুবই গোছালো ধরনের মেয়ে রেবেকা। আনমনে এই খাতাটাকে এভাবে সে রেখে চলে যাবে তা অন্তত আমার মনে হয় না।
খাতাটা হাতে নিতেই আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন অসংখ্য শব্দমালা। রেবেকার হাতের লেখা; কিন্তু কী লেখা এতে?
‘আমি জানি জীবিকার তাগিদে তোমাকে ছুটতে হয়। ভীষণ ব্যস্ততায় পার হয় তোমার সারাটা দিনমান। একমাথা যন্ত্রণা নিয়ে তুমি বাসায় ফেরো রোজ। তোমার মুখাবয়ব দেখলেই আমি আঁচ করতে পারি তোমার কর্মময় জীবনের ক্লান্তি। তোমার ক্লান্তি আমাকে পীড়া দেয়; তোমার সামান্য অসুবিধেও আমাকে যন্ত্রণায় কাতর করে ফেলে। তুমি অফিস থেকে ফিরলেই আমি শশব্যস্ত হয়ে পড়ি তোমাকে সামলাতে। তুমি কি কফি খাবে না শরবত, সেই চিন্তায় আমি অস্থির হয়ে যাই। তোমার রাতের খাবার, শোবার বিছানা, সকালের নাস্তা, অফিসের পোশাক–সবকিছু ঘিরেই আমার পৃথিবী। আমি ব্যস্ত থাকতে চাই তোমাকে নিয়ে।
আচ্ছা, অফিস থেকে ফিরে কখনো কি তুমি জানতে চেয়েছো আমি দুপুরে খেয়েছি। কি না? তুমি জানো আমি সাজতে পছন্দ করি। ঠিক কতোদিন হয় সেজেগুজে তোমার সামনে দাঁড়াইনি, মনে করতে পারো? কখনো নিজ থেকে জানতে চেয়েছো। কেন আমি আগের মতো সাজার ফুরসত পাই না? অফিস থেকে যে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে তুমি আসো, সেই চেহারা আমাকে হতবিহ্বল করে দেয়। তোমার পরিশ্রান্ত অবয়বের অবসাদ আমি বুঝতে পারি। আচ্ছা, তুমি কি কখনো আমার বিধ্বস্ততা বোঝার চেষ্টা করেছিলে? অন্তত একবার? সংসারের ঘানি টেনে আমারও যে মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে, সেটা তুমি অনুভব করেছো কখনো?
সারাটা দিন একা একা থাকি। একটা অবুঝ বাচ্চাকে সামলাই। তার সাথে আর কতই বা কথা বলা যায়, বলো? মন চায় খুব করে কথা বলতে কিংবা খুব মন দিয়ে কথা শুনতে। অপেক্ষায় থাকি কখন তুমি ফিরবে আর আমি মেলে বসবো আমার গল্পের ডালপালা। তুমি তন্ময় হয়ে শুনবে আমার কথা। আর যখন তুমি বলা শুরু করবে, আমি কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনে যাবো। কিন্তু দেখো, তুমি ঠিকই তন্ময় হয়ে থাকো। কিন্তু তোমার সেই বিস্ময়, সেই আবেগ, সেই বিহ্বলতা জুড়ে কেবল আমিই নেই। আছে অন্য অনেকে। বাসায় এসে তুমি সেই ভার্চুয়ালে ডুব দাও, আমার কথা তোমার খেয়ালই থাকে না। তুমি যেখানে আমগ্ন ডুবে থাকো, সেখানে কেউ কি তোমার জন্য দরজা ধরে অপেক্ষা করে? তোমার পছন্দের খাবার প্রস্তুত করে। অধীর অপেক্ষার প্রহর গোনে তোমার জন্য? কিন্তু দেখো, যে মানুষটা তোমার পথ চেয়ে বসে থাকে সারাদিন, তার জন্য তোমার এতোটুকুও সময় হয় না।
তুমি সারাদিন ব্যস্ত থাকো, তাই তোমাকে অকারণ প্রশ্ন করলে রেগে ওঠো। কিন্তু, তোমার ছেলে, যাকে আমার অস্তিত্বে ধারণ করে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি, সে যে আমাকে প্রতিদিন কতো সহস্র হাজার প্রশ্ন করে তা তুমি ভাবতেও পারো না। কিন্তু তার প্রশ্নের প্রতি কোনোদিন সামান্য রাগ, সামান্য উদাসীনতা আমি দেখাইনি; বরং মুখে একরাশ হাসি আর ভালোবাসা মিশিয়ে তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিই। ভালোবাসার বাঁধনটা তো এমনই, বলো?
আব্দুল্লাহকে ঘিরে সারাদিন আমার যে ব্যস্ততা, সেই ব্যস্ততা কখনোই কি তোমার চোখে পড়ে? কখনো কি তুমি আমার সেই ব্যস্ততার মূল্যায়ন করেছিলে? তুমি কেবল দেখছো তোমার ছেলেটা দিন দিন বড় হয়ে উঠছে। এটা শিখছে, ওটা শিখছে। কিন্তু তার পেছনে আমার যে বিনিয়োগ, সেই বিনিয়োগ কখনোই কি তোমার চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে?
বিশ্বাস করো, আমারও একটা আলাদা পৃথিবী আছে। আমার সেই আলাদা পৃথিবীজুড়ে কেবল তুমি আর তুমি। তুমিই আমার সেই জীবনের রং। তোমার অবসরের সমস্তটা জুড়ে আমি থাকতে চাই। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে, তুমি এসে আমার সাথে খোশগল্পে মেতে উঠবে, এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমি রোজ ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু স্বপ্নটা আমার চোখের পাতায় রয়ে যায়। তুমি তোমার মতোই। তুমি আসো। ডুবে যাও একটা নীল-শাদার জগতে। খাও। এরপর ঘুম। আমার জন্য তোমার কি একটু সময় থাকতে নেই? অন্তত একটু ফুরসত?
