আমি যে পৃথিবী নামক গ্রহেই বাস করি এবং দুনিয়ার সাথে আমারও যে রয়েছে ভালো যোগসাজশ, অন্তত তার স্বাক্ষর রাখতে হলেও আমাদের এখন ভার্চুয়ালমুখী হতে হয়।
ইতোমধ্যেই আব্দুল্লাহ আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। খেয়াল করলাম, রেবেকা খুব সযত্নে আব্দুল্লাহকে শুইয়ে দিয়ে গেলো আমার পাশে। তার ছোট্ট মশারিটাও টাঙিয়ে দেওয়া হলো। আব্দুল্লাহকে শুইয়ে দেওয়ার পর রেবেকা খুব নিচু স্বরে, পাছে আব্দুল্লাহ জেগে যায় এই ভয়ে, জিগ্যেশ করলো, ‘খাবার কি এখনই দেবো?’
একেবারে শুরুর ক্লান্তিটা যখন আর নেই, তখন কথা একটু বলাই যায়। রেবেকার প্রশ্নের জবাবে তাই বললাম, একটু পরেই দাও।
একটু পরে দেওয়ার কথা শুনে রেবেকা আবার রান্নাঘরে ছুটে গেলো। সেই কবেই সে রান্না চড়িয়েছিল কে জানে। ঠান্ডায় সবকিছু জমে বরফ হয়ে আছে নিশ্চয়। খাবারগুলো এবার গরম করবার পালা। সে খুব সযত্নে তার কাজে গেলো। তার কাজ, যা সে প্রত্যহ করে। রুটিন মেনে। যাতে কোনোদিন ব্যত্যয় ঘটে না।
একটু পরে সে আবার ছুটে এলো আমার কাছে। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বললো, ‘চিংড়ির ঝোল আর গরুর গোশত দুটোই করা আছে। দুটোই গরম করবো?’
আমি তন্ময় হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা চোখের সামনে এখন। আমার এক বন্ধু, যার সাথে ফেইসবুকেই আমার পরিচয়, তার লেখা। তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে আজ। ডিভোর্স-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সে খুব আবেগময় করে তুলে ধরেছে। প্রচণ্ড ভালোবাসতো একজন অন্যজনকে। এরপর, কী থেকে যে কী হলো–ডিভোর্স! খুব কষ্টই লাগলো। তাদের দুজনের জন্যই।
রেবেকা আবার বললো, ‘শুনছো? তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি।‘
আমি মাথা তুলে রেবেকার দিকে তাকালাম। বললাম, ‘কী?’
‘চিংড়ি আর গোশত দুটোই করা আছে। দুটোই গরম করবো কি না জানতে চেয়েছি। নাকি দুটোর যেকোনো একটা?’
বেশ রাগ উঠলো। এটা কোনো প্রশ্ন হলো করার মতো! গলা উঁচু করে, একটু জোর শব্দেই বললাম, যেকোনো একটা করলেই তো পারো। এটা জিগ্যেশ করার জন্য তো কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
রেবেকা চুপ করে থাকলে কিছুক্ষণ। এরই ফাঁকে আমি আগের সেই লেখায় পুনরায় মনোনিবেশ করেছি। সেই লেখায়, যেখানে আমার বন্ধু তুলে ধরেছে একটা সংসার ভাঙার কাহিনি। এতোদিনের গোছানো একটা সংসার কীভাবে ভেঙে গেলো সেই মর্মান্তিক দৃশ্যপট থেকে নিজের চোখদুটো সরানো দায় হয়ে পড়েছে। খানিক বাদে রেবেকা আবার বললো, ‘সেদিন তুমি চিংড়ির ঝোল খেতে চেয়েছিলে। আমার জ্বর থাকায় রান্না করা হয়নি। তাহলে চিংড়িটাই গরম করি?’
রেবেকার কথাগুলো আমার মনোযোগে বেশ বিঘ্ন ঘটালো। সারাদিন কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতে হয়। বাসায় ফিরে যে একটু আরাম-আয়েশ করবো, নিজের মতো করে খানিকটা সময় পার করবো তার জো নেই। জেরার পর জেরা চলতেই থাকে। আমিও তো মানুষ, কোনো যন্ত্র তো নই। মানুষ হিশেবে আমারও তো কিছু নিজস্ব সময় চাই। কিছু সময়, যা একান্তভাবেই কেবল আমার।
মুখে বিরক্তির সর্বশেষ রেখাঁটি ফুটিয়ে তুলে বললাম, ‘জানোই যখন আমি চিংড়ির ঝোল খেতে চেয়েছি, সেটা তাহলে বারে বারে জিগ্যেশ করছো কেন? চিংড়িটাই গরম করে নিলে পারো।
আমার বিরক্তিভরা উত্তরে রেবেকা এবার সত্যি সত্যিই দমে গেলো। ধীরপায়ে সে পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। দরজার যে জায়গায়টায় রেবেকা এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো, সেখানে এখন একটা পর্দা দুলছে। রেবেকার প্রস্থানে শূন্যে তৈরি হওয়া হাওয়ায়। আর আমি? আমি আবারও ডুব দিয়েছি নীল-শাদার সেই বায়বীয় জগতে।
খাওয়া-দাওয়া পর্বের একেবারে মাঝামাঝি পর্যায়, আবারও আব্দুল্লাহর সেই গগনবিদারী চিৎকার। সেই কান ফাটানো কান্নার আওয়াজ। আমার তাতে কোনো অসুবিধা হয় না অবশ্য। বেশ খেতে হয়েছে চিংড়ির ঝোলটা। আমি আরাম করে খাচ্ছি। আর রেবেকা? আব্দুল্লাহর কান্নার শব্দ শুনে সে কোন ফাঁকে যে হাওয়ায় উড়ে আব্দুল্লাহর কাছে চলে গেলো, আমি টেরই পেলাম না। আবারও সেই একই সুর। একই সংগীত। ও বাবা আমার! আমার সোনা আটা! আর কান্না করে না। এই দেখো, আম্মু তোমাকে কোলে নিয়েছি বাবাই। আর কান্না করে না আমার বাবুটা। ওলে ওলে বাবা আমার!
সকাল হয়। আমি অফিসের জন্য বের হই। আমার যা যা দরকার, সবকিছুই হাতের কাছে পাওয়া যায়। রেবেকাই এনে রাখে। প্রতিদিন। নিয়ম করে। আজও তার ব্যত্যয় হয়নি। সে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ততোক্ষণ, যতক্ষণ আমি তার দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য না হই। এটাই হলো রোজকার জীবন। আমার…আমাদের।
[দুই]।
আজ রেবেকা বাপের বাড়ি যাচ্ছে। আমার শ্বশুর এসেছেন তাকে নিয়ে যেতে। কাজের ভীষণ চাপ; রেবেকাকে রেখে আসার কোনো ফুরসত আমার হাতে নেই। কদাচিৎ থাকে, সব সময় নয়। ঠিক এগারোটা ত্রিশ মিনিটে তারা চলে গেলো। আমি অবশ্য এর আগেই অফিসে চলে এসেছি। সকালবেলা রেবেকা বলছিল, ‘কবে যাবে আমাদের ওখানে?’
আমি শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বললাম, ‘বলতে পারছি না। কাজের চাপ আছে।
আমার উদাসীন উত্তরে রেবেকার চেহারা গুমোট অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। বাড়তি কোনো প্রশ্ন করে নিজের খারাপ লাগাটাকে বাড়ানোর পথে না গিয়ে সে বললো, ‘ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া কোরো। বাইরের খাবার খেয়ো না যেন! ক্যান্টিনে খেতে পারো। অন্তত বাইরের চেয়ে ভালো।
