[চার]
পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলাম। অবিশ্বাস্য! ডায়াল লিস্টের কোথাও রেবেকার নাম্বার নেই। এই এতোদিন পার হয়ে গেলো সে আমার ঘরে নেই, অথচ এতোদিনে একটাবার আমি তাকে ফোন দিইনি? কতোদিন হয় তার জন্য কিনে আনি না বেলি ফুলের মালা। সত্যিই তো, কতোদিন হয় তাকে আমি সাজতে দেখি না। আব্দুল্লাহর জন্মের পর তার শরীরটাও ভেঙে গেছে। ছেলেটাকে সামলাতে গিয়ে বেচারি নিজের যত্নের কথাটুকুও ভুলে বসে আছে। তবে সে ভোলে না আমাকে। আমাকে ঘিরেই তার অঢেল ব্যস্ততা। আর আমার ব্যস্ততা? অফিস…ফেইসবুক…অফিস…
[পাঁচ]
এপাশ-ওপাশ দুলুনি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে আমাদের ট্রেন। আমি ছুটে যাচ্ছি রেবেকার কাছে। আমার হাতে ফুলের তোড়া। বেলি আর কাঠগোলাপ ফুলের সমন্বয়ে বানানো। বেলি ফুল রেবেকার পছন্দ, আর কাঠগোলাপ আমার। তার মাঝখানে একটা চিরকুট। তাতে লেখা–I Love You’…
০৭. হিজল বনের গান
একটা জানলা। আকাশে একফালি চাঁদ। চাঁদের রুপোলি জোছনা জানলা গলে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। খানিকটা দূরেই একটা পুকুর। পুকুরের পাড়ে দুটো হিজল গাছ। হিজলের গায়ে কিছু গুল্ম, আর তার নিচে একটা কবর। আমার মায়ের।
জানলার ধারে দাঁড়িয়ে, অপলক দৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে আছি আমার মায়ের কবরটার দিকে। কবরের উঁচু ঢিপিটা যেন আমার বুকের ওপর বসে থাকা কোনো জগদ্দল পাথর। মনে হলো–হিজলের গাছ দুটোর মন খারাপ; আমার মতো। আমার বুকের ভেতর যে কালবোশেখি ঝড় বইছে, যে অমাবশ্যা আজ আমার হৃদয়াকাশে, তা হয়তো বা হিজলের গাছ দুটোর মনেও সমানতালে ঝড় তুলেছে। আমার মতোন, তাদেরও যে ভারি আদরে বড় করেছিলো আমার মা। মামাবাড়ি থেকে, আমাদের সেই বাড়ন্ত শৈশবের সময়ে মা দুটো হিজল চারা এনে লাগিয়েছিলেন এখানটায়। বাবা বলেছিলেন, এই গাছ কেউ শখ করে লাগায়?’ মা বললো, ‘কেউ লাগায় না বলেই তো আমি লাগালাম। বাবা চুপ হয়ে গেলেন। হিজল চারা নিয়ে আর কোনোদিন। মাকে কোনো প্রশ্ন করেননি। সেই হিজল চারার গাছ আজ শাখা-পল্লবে আকাশ। ছুঁয়েছে। কিন্তু মাটির চারাতে প্রথম যে স্বপ্ন বুনেছিল, সেই স্বপনচারিণী আজ অতীত।
আমার মনে পড়ে, পৌষের হাড়-কাঁপানো শীতে মা আমার পড়ার টেবিলের পাশে চুলো থেকে তুলে আনা কড়কড়ে কয়লা-আগুন নিয়ে বসে থাকত। ছেলের পরীক্ষা, রাত জেগে পড়তে হবে, শীত যদি ছেলেকে কাঁবু করে ফেলে অথবা ঠান্ডায় পড়াশোনা করতে গিয়ে ছেলে যদি নিউমোনিয়া বাধিয়ে বসে–এই ছিলো মায়ের ভয়। আমি পড়ি আর মা খানিক বাদে বাদে আগুন নেড়ে দেয়। একটা উষ্ণতা আমার গায়ে এসে ভর করে।
গ্রীষ্মে দিনের বেলা রোদের প্রখরতা, আর রাতজুড়ে তার হাপিত্যেশ। কিন্তু জননী আমার, ঠিক আগের মতোই, পুরোনো এক পাখা হাতে নিয়ে, আমার টেবিলের পাশে বসে অবিরাম অবিরত হাত চালাতো। যেন তার কোনো ক্লান্তি নেই।
একবার বৃষ্টিতে ভিজে ভীষণ অসুখ বাধিয়েছিলাম। দিন যায় রাত আসে, চোখ। মেলে আমি তাকাতে পারি না। শুনেছিলাম, মা সারাটা দিন আমার মাথার কাছে বসে থাকত। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। বাঁধভাঙা চোখের জল যেন নদী হতে চায়। পাশের বাড়ির মোতালেবের তালে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজেছি বলে জীবনে আর কোনোদিন ওপাড়ায় মা আমাকে পা ফেলতে দিলো না। আমাকে নিয়ে তার ছিলো সীমাহীন ভয়। বুকের মানিকের যদি কিছু হয়ে যায়?
রুপোর থালার মতো আকাশে ঝকঝকে চাঁদ। জোছনায় উঠোন মাখামাখি। অল্প এগুলেই একটা আদিম পুকুর। তার পাড়ে দুটো হিজলের গাছ; তাদের গা আঁকড়ে ধরে কিছু গুল্ম। ঠিক তার নিচেই একটা কবর যেখানে শুয়ে আছে আমার পরম মমতাময়ী মা।
চাঁদের আলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি, হিজলের গাছ দুটো দুলছে। বাতাসে কোথাও গুঞ্জন উঠেছে একটা সুরের। আমি শুনতে পাচ্ছি, আমার বুকের গহিন থেকে, আমার অন্তরাত্মা ভেদ করে একটা অপার্থিব সুর ভেসে আসছে। রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা-ইয়ানি সগীরা! একটা গান। হিজল বনের গান।
০৮. বিশ্বাস
[এক]
দূরের দিগন্তে, যেখানে একটু আগে সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকু মিলিয়ে গেছে, সেখানে এখন ভর করেছে অঘোর অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার কেটে কেটে, মাথায় পাটের বোঝা নিয়ে লোকালয়ে ফেরত আসছে দুটো ছায়ামূর্তি। নাজিমুদ্দিন এবং তার ছেলে মতি। বয়সের তুলনায় মতির শরীরের বাড়ন চোখে পড়ার মতো। চাষাভুষার ছেলে, প্রকৃতির নির্মল আলো-বাতাস খেয়েদেয়ে বড় হয়। মাটি আর জলের সংস্পর্শ পেয়ে এরা যেন পতিত জমির মাঝে আগাছার মতো তরতর করে বেড়ে ওঠে।
মতি নাজিমুদ্দিনের আগে আগে হাঁটছে। চারপাশের প্রকৃতির মতো তারাও চুপচাপ, শান্ত। একটু পরে কথা শুরু করে দেয় মতি। ‘জানো বাজান, আমাগো ইশকুলে নতুন যে হেডমাস্টার আইছেন, উনি কইছেন আমি নাকি বিরিত্তি পাইবার পারি।’
নাজিমুদ্দিন ক্লান্ত, কিন্তু কোমল গলায় জানতে চাইলো, এইটা আবার কী জিনিস, বাজান?’
‘একটা পরীক্ষা হয় বাজান। ইশকুলের যেই পোলা-মাইয়ারা পড়ালেহায় ভালো, তারা এই পরীক্ষা দেয়। তাগো মইধ্যে থেইকা যারা বেশি ভালো পরীক্ষা দিবার পারে, তাগোরে সরকার পুরস্কার দেয়। ম্যালা ট্যাহা দেয়।’
‘সইত্য?’, ক্লান্ত চোখে বিস্ময় জাগে নাজিমুদ্দিনের। তার ছেলে এই বয়সে টাকা পাবে, তাও আবার পড়ালেখা করে–তা যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে তার কাছে।
