খেয়াল করলাম, আমার ক্ষোভ নিয়ে হেল্পারের মাঝে কোনো তাড়না নেই। আমাকে ফুঁসতে দেখে সে যে ভয়ে এতোটুকুন হয়ে যাবে, নিদেনপক্ষে ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে কাঁচুমাচু করে বিনীত গলায় তার যুক্তি পেশ করবে–এমন কোনো লক্ষণও তার মাঝে দেখা গেলো না। তার অপরিবর্তিত, কিন্তু বিরক্তি-মিশ্রিত চেহারা যেন আমাকেই শাসানোর প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। অবশ্য, তার কাছ থেকে এতোটুকুন আশা করাটাও নেহাত বোকামি বৈ কিছু নয়। দম্ভের দায়ভার মেটাতে আমি যদি তার গাড়ি থেকে নেমেও পড়ি, তাতে তার বিশেষ কোনো ক্ষতি নেই। আমার শূন্যতা পূরণের জন্যে বাইরে একঝাঁক উৎসুক যাত্রী অজগরের মতন হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। নেমে গেলেই মুহূর্তে পূরণ হয়ে যাবে আমার শূন্যস্থান। না গেলে বরং ক্ষতিটা আমারই। অতো দূরের পথ; কখন যে আবার নতুন বাস আসবে তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। সুতরাং, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসায় ফিরতে হলে বাড়তি টাকা না গুনে উপায় নেই কোনো।
হেল্পারের কর্কশ কিন্তু পরিচিত চিৎকারে সংবিৎ ফিরে পেলাম। আমার ভাবনার সুরে ছেদ ঘটিয়ে সে তার বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো, ‘পঁচিশ টাকাই ভাড়া। টাকা না থাকলে নাইমা যান। আপনারে কেউ ধইরা রাহে নাই।
হেল্পারের কথাই সত্য। কেউ আমাকে জোর করে তার গাড়িতে চাপিয়ে দেয়নি। ‘পাছে নেমে যাই ভেবে কোনো আহত নয়নও সবিশেষ তাড়না নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে নেই। এই যে বিশ টাকা থেকে লাফ দিয়ে পঁচিশ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে, আমি ব্যতীত তা নিয়ে আর কারও মাঝে কোনো হাপিত্যেশ, কোনো মাথাব্যথাই দেখা গেলো না। একটা মানুষ পর্যন্ত টু শব্দটাও করলো না। দুর্মূল্যের বাজারে অন্যায় আর অনিয়ম মানুষের গা সয়ে গেছে, না তাদের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। অগত্যা পঁচিশ টাকা ভাড়া গুনেই আমাকে ফিরতে হলো।
বাসায় ফিরেছি; রোজকার মতো–কাঁধে ব্যাগ, চোখে চশমা আর শরীরভরা একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। আমাকে দরজা খুলে দেয় আমার স্ত্রী, রেবেকা। দরজা খুলেই নিত্যদিনকার অভ্যাসমতো সালাম দিয়ে একপাশে আড়াল হয়ে দাঁড়ায় সে। আমি ক্লান্ত ভীষণ। হনহন করে হেঁটে চলে আসি নিজেদের রুমে। রেবেকা এসে আমার কাছে দাঁড়ায়। শশব্যস্ত হয়ে বলে, ‘তোমাকে লেবুর শরবত করে দিই?’
ক্লান্তিতে আমার গা নুইয়ে আসে। শরীরটা যেন বিছানা ছোঁয়ার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ঘরে এলে আমার বাকশক্তি লোপ পায়; দরকারি কথাটুকু বলতেও কেমন অনীহা আর অসহ্য লাগে। রেবেকা আবার প্রশ্ন করে, মাথাব্যথা করছে? রং চা করে দিই? লেবু আর আদা দিয়ে?
আমি রং চায়ের ব্যাপারেই সম্মতি জ্ঞাপন করি। আদিকার রাজারা যেভাবে হুকুম তলব করতো, ঠিক সেরকম–একটা অস্পষ্ট ইশারায়। রেবেকা ভোঁ-দৌড়ে রান্নাঘরে ছুটে যায়। তড়িঘড়ি করে চুলোয় বসিয়ে দেয় পানি। একফাঁকে কেটে নেয় এক ফালি লেবু আর খানিকটা আদা। মুহূর্তকাল পরেই সে ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। চায়ের কাপ যে-ই না মুখে নিতে যাবো, ওমনি বিকট শব্দে কেঁদে ওঠে আমার ছেলে, আব্দুল্লাহ। কান্নার সে কী আওয়াজ! কানের পর্দা যেন ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো।
আমার সামনে থেকে একেবারে হাওয়ার মতোই অদৃশ্য হয়ে গেলো রেবেকা। যে রুমে আব্দুল্লাহ শুয়ে আছে, সেখানে চোখের পলকে উপস্থিত হয়ে প্রয়োগ করতে লাগলো বাচ্চার কান্না থামানোর আদিম মেয়েলি কৌশল। মেয়েদের ঝুলিতে যে ক’প্রকারের সান্ত্বনা-বাক্য বাচ্চাদের জন্য মজুদ থাকে, তার সব ক’টাই রেবেকা একে একে আব্দুল্লাহর সামনে মেলে ধরতে লাগলো। কিন্তু আব্দুল্লাহও ছেড়ে কথা বলবার পাত্র নয়। এমন মন-ভোলানো মন্ত্রে সম্ভবত তার আর রুচি নেই। রেবেকার সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে আব্দুল্লাহও সমান উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে কান্না অব্যাহত রাখলো।
আব্দুল্লাহর কান্নার আওয়াজে আমার যে বেশ অসুবিধে হচ্ছে সেটা রেবেকা বোঝে। আর বোঝে বলেই সেও হতোদ্যম হয়ে যায়নি। রেবেকা একসুরে আব্দুল্লাহকে শান্ত করবার চেষ্টা চালিয়ে গেলো, ও বাবা আমার! আমার সোনা আব্বটা! আর কান্না করে না। এই দেখো, আম্মু তোমাকে কোলে নিয়েছি বাবাই। আর কান্না করে না আমার বাবুটা। ওলে ওলে বাবা আমার!
আব্দুল্লাহর কান্না আর রেবেকার কান্না থামানোর সংগীত–দুটোর যৌথ প্রযোজনা আমার মাথাব্যথাটা যেন আরও দ্বিগুণ বাড়িয়েই দিলো।
শরীর একটু হালকা লাগলে ফোন হাতে নিয়ে, দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে প্রবেশ করি নীল-শাদার ভার্চুয়াল জগতে। জগৎটা অদ্ভুত মায়াময়! উত্তর-আধুনিক সময়ে, আমাদের সকল সুখ-দুঃখের গল্প এই জগতের বাসিন্দারা কীভাবে যেন জানতে পেরে যায়। যান্ত্রিকতার মোহে কিংবা আধুনিকতার লোভে আমরা আমাদের সকল সম্পর্কের গল্প, সকল অর্জন আর ব্যর্থতার ফিরিস্তি এখানে না বলে শান্তি পাই না। একসময় আমরা ছিলাম সামাজিক জীব। কিন্তু সে যুগের অবসান ঘটেছে বেশ আগেই। আমরা প্রবেশ করেছি পৃথিবীর মেরুকরণের এমন এক মোহময় সময়ে, যেখানে আমরা হয়ে বসে আছি ভার্চুয়াল বাসিন্দা। আমাদের এখানেই ঘোর, এখানেই ভালো লাগা।
প্রতিদিন রাতের এই অংশটায় আমার কাজ খুবই সুনির্দিষ্ট–ফেইসবুক স্ক্রল করা। সারাদিনের জমানো সংবাদ, খেলাধুলার যাবতীয় আপডেট, বন্ধুদের হাসিখুশি মুখচ্ছবি দেখতে দেখতে কখন যে সময় বয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না। আজও তা-ই করছি। ফেইসবুকের গভীর থেকে গভীরে গিয়ে তুলে আনছি মিস হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলোকে, সময়ের সংগতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখছি দুর্দান্তভাবে; কে জানে, আগামীকাল অফিসে গিয়ে যদি দেখা যায় আজকের কোনো ঘটনা নিয়ে খুব শোরগোল পড়ে গেছে, কিন্তু তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই, তখন আমার নাকউঁচু কলিগেরা আমার দিকে কী অদ্ভুতভাবেই-না তাকাবে! সূর্যের নিকটতম গ্রহ বৃহস্পতিতে প্রাণের সন্ধান মিলবার সংবাদেও তারা এতোখানি চমকাবে না যতখানি চমকাবে আমাকে দেখে। বিস্ময় ধরে রাখতে না পেরে কেউ কেউ বলেও বসতে পারে, একটা ঘটনা ঘটার চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেলো, আর আপনি তার কিছুই জানেন না? কোন দুনিয়ায় বাস করেন আপনি?
