আমি কোনোকিছুই বললাম না তাকে। আজ তাকে আমার কিছু বলার নেই। স্বার্থপরতার যে রূপ আজ আমি তার মাঝে দেখলাম, সেই রূপের তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করে নিতে আমার যে বেশ অনেকখানি সময় লেগে যাবে তা আমি জানি। কিন্তু ফাতিমার এই রূপ দেখবার আগে আমার মৃত্যু হলেই ঢের ভালো ছিলো।
আমার কোনো জবাব না পেয়ে সে আবার বললো, আমার কথাটা একবার শুনুন, প্লিজ।
এবারও আমাকে পাথরের মতো নিশ্চল, নিশ্চল্প দেখতে পেয়ে ফাতিমা তার কথাগুলো বলতে শুরু করলো, আজকে না-হয় ভাবিদের আমরা টাকা দিয়ে সাহায্য করলাম, কিন্তু আগামীকাল? আগামী পরশু কী হবে তাদের? কার কাছে যাবে তারা? কোথায় গিয়ে হাত পাতবে?’
ফাতিমার কথাগুলো বুঝে উঠতে পারলাম না। কেবল নির্বাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার যেন আর কিছুই বলবার নেই। ফাতিমা তার বক্তব্য থামায়নি, ‘আজকে না-হয় তাদের আমরা দয়া করবো, কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের দরকার একটা আশ্রয়। মাথা গুঁজবার জন্য একটা আবাস। এই মুহূর্তে জাহিদ ভাইয়ের মেয়েটার একটা নির্ভরতার ছায়া দরকার। পরম যত্নে তার মাথায় বুলিয়ে দেবার মতন দুটো কোমল হাত দরকার। তার মাথার ওপর দরকার একটা বটবৃক্ষ।
প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে আমি তখন বিপন্নপ্রায়। ফাতিমার কথাগুলোর কোনো মর্মোদঘাটন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না কোনোভাবেই। কিন্তু সে কিছু একটা বলতে চায় যা আমার বোঝা দরকার বলে মনে হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি বললাম, আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলবে তুমি আসলে কী বলতে চাইছো?’
এবার ফাতিমা আমার হাত ধরে ফেলল। আমি খেয়াল করলাম তার চোখ দুটো রক্তজবা ফুলের মতন লাল হয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে। তার এই কান্নার কারণ আমি বুঝে উঠতে পারছি না। এই ফাতিমাকে যেন আমি চিনতেই পারছি না কোনোভাবে। সে কান্না থামিয়ে বললো, ‘আপনি ভাবিকে বিয়ে করুন।
আমি আবার নির্জীব হয়ে গেলাম। তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বাক্যটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি কি ঠিক শুনেছি? কী বললো ফাতিমা এটা? এটা সে ভাবলোই বা কীভাবে?
ফাতিমা মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। টপটপ করে তার চোখের জল নিচে গড়িয়ে পড়ছে। আমি তাকে স্পর্শ করলাম। দু-হাতে তার মুখ আলতো করে ধরে বললাম, ‘তুমি ঠিক আছে তো?’
আমার প্রশ্ন শুনে আবারও তার চোখ বেয়ে নেমে এলো অশুর ফোয়ারা। আমার দু-হাত ভরে উঠলো তার অশ্রুজলে। সে থরথর করে কাঁপছে। আমি শক্তভাবে ধরলাম তাকে। আমার বাম হাত দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললাম, ‘এটা হয় না ফাতিমা।
‘কেন হবে না? আল্লাহ না করুন, জাহিদ ভাইয়ের জায়গায় আপনি আর ভাবির জায়গায় যদি আমি হতাম? আমাকে উদ্ৰান্ত, অসহায় অবস্থায় ধুকে ধুকে জীবন কাটাতে আপনি দেখতে পারতেন?
আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম। ফাতিমার যুক্তির বিপরীতে ছোঁড়ার মতো যুক্তি আমার হাতে নেই। কিন্তু ও যে আবেগের আতিশয্যে একটা অসম্ভব দাবি উত্থাপন করেছে তা ওকে বোঝাতে হবে আমার। আমি বললাম, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা তাদের পাশে দাঁড়াবো ফাতিমা। কিন্তু তাই বলে…।
আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে ফাতিমা বললো, এটা তো দয়া করা হবে। আমি চাই না তারা দয়া নিয়ে বাঁচুক। আমি চাই তারা অধিকার নিয়ে বেঁচে থাক। একজন মহিলা তার স্বামীর অধিকার এবং একটি সন্তান তার বাবার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকাটাই আমার কাছে অধিক পছন্দের।
সেবার আমি আর কোনোভাবেই ফাতিমাকে বোঝাতে পারিনি। তার যুক্তির কাছে পেরে ওঠা আমার সাধ্যের বাইরে ছিলো। তারচেয়ে বড় ব্যাপার হলো–তার আত্মত্যাগের সামনে আমাকে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে। এমন পবিত্র ইচ্ছাকে। অসম্মান করার মতন দুঃসাহস আমার হয়নি।
সত্যি সত্যিই আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো। যেদিন আমার দ্বিতীয় বিয়ে হচ্ছে, সেদিন বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। আকাশে মুহূর্মুহূ মেঘের গর্জন। ভারী বর্ষণে প্রকৃতি তখন একেবারে দিশেহারা। এমন ঝড়ো হাওয়ার রাতে, এমন বিপন্ন-বিপর্যস্ত সময়ে আমার বুকের মধ্যেও একটা ঝড়ের তাণ্ডবলীলা চলছিল। সেই রাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করেছিলো ফাতিমা। বাইরের ভারী বৃষ্টির সবটুকু জল যেন ফাতিমার চোখে এসে ভর করেছে। জাগতিক নিয়মে পুরুষ মানুষরা নাকি কঠিন প্রকৃতির হয়। তারা নাকি খুব সহজে কাঁদতে পারে না। জগতের নিয়মকে ভুল। প্রমাণিত করে সেদিন ফাতিমাকে জড়িয়ে ধরে আমিও খুব কেঁদেছিলাম।
০৬. জীবনের রকমফের
[এক]
বাসের হেল্পার ভাড়া বললো পঁচিশ টাকা। প্রতিদিনের নির্ধারিত যা ভাড়া, তার চাইতে পাঁচ টাকা বেশি দাবি করায় রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসল। দেশটা কি তাহলে মগের মুল্লুকে পরিণত হলো? যার যা মন চাইবে আদায় করবে?
আমার মধ্যবিত্ত মনের ক্রোধ মনের ভেতরেই গোঙাতে লাগলো, বাইরে তা যে দ্বিগুণ প্রলয়ে আছড়ে পড়বে সেই সাহস আর শক্তি আমাদের কোথায়? তবুও, কিছু অন্তত বলতে হয়, তা না হলে মধ্যবিত্ত জীবনের মোলোকলাটাও আবার অপূর্ণ থেকে যায় অনেক সময়।
চেহারায় পরিমিত ক্ষোভ আর বিরক্তির রেশ টেনে এনে বললাম, ‘পঁচিশ টাকা মানে? বিশ টাকা দিয়ে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করি। পঁচিশ টাকা দেবো কেন?’
